রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১১ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল যেভাবে আশ্বাস দিয়েছিল তা বাস্তবায়ন নিয়ে খানিকটা হতাশ বাংলাদেশ। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রধান ভূমিকায় থাকা জাতিসংঘের অবস্থান ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে অসন্তোষ সামনে চলে আসছে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম এমন বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা থাকলেও তাদের ভূমিকা নিয়েও অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে জাতিসংঘের ওপর ভরসা ছিল বাংলাদেশের। ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গারা নির্যাতনে টিকতে না পেরে মিয়ানমার থেকে নতুন করে দলে দলে যখন বাংলাদেশ ঢুকছিল তখন জাতিসংঘের অবস্থান ছিল অনেক শক্ত। এখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সেই জোরালো অবস্থানে নেই জাতিসংঘ। এখন প্রত্যাবাসনের চেয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রেখে কীভাবে আরো ভালোভাবে দেখভাল করা যায় সেদিকে জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার দিকে যতটা নজর দিচ্ছে, প্রত্যাবাসনে সেভাবে ভূমিকা রাখছে না।
কিছুদিন আগে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল ও সামরিক বিরোধী বিক্ষোভে হতাহতের ঘটনায় নজর বেড়েছে পশ্চিমা বিশ্বের। জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলো রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও বিতাড়িত করার জন্য নয়, সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল ও কিছু বেসামরিক জনতা নিহত হওয়ার কারনে কয়েকজন জেনারেলের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু এসব দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসায়িক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেনি।
কূটনৈতিক সূত্র আরো জানায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে প্রতিবেশী ও ক্ষমতাধর বন্ধু রাষ্ট্র ভারত ও চীনের ভূমিকাও রহস্যজনক। মিয়ানমারের সঙ্গে এই দুটি দেশের রয়েছে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক। সীমান্তসহ রাজনৈতিক বোঝাপড়াও অত্যন্ত ভালো। কিন্তু রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করা দরকার এ বিষয়ে একমত প্রকাশ করলেও কার্যকর ভূমিকা নিতে চায় না ভারত ও চীন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুটি উঠলেও চীন সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকে, যদিও ভারত এক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করে। একই অবস্থান বন্ধু রাষ্ট্র জাপানের ক্ষেত্রেও। কারণ মিয়ানমারে জাপানেরও অনেক বিনিয়োগ রয়েছে।
এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহল ও কিছু বন্ধু রাষ্ট্রের ভূমিকায় অসন্তোষ জানিয়েছেন স্বয়ং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা অনেক বন্ধু রাষ্ট্রের সহযোগিতা পেয়েছি এবং তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু বন্ধু রাষ্ট্রের বূমিকা ও অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আবার অনেকেরই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ভূমিকা না রেখে এখানে কীভাবে রেখে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টায় রয়েছে। এটা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘসহ অন্য রাষ্ট্রের যতটুকু করার আছে তারা সেটি এখনো করেনি। তবে তাদের বিষয়ে উপসংহারে আসার মতো এখনো অবস্থা আসেনি।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারত বড় প্লেয়ার হলেও তাদের সীমান্ত, বাণিজ্য, ভূ-রাজনৈতিক ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের ব্যবসা একশ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বিনিয়োগও সর্বোচ্চ। দেশটির সঙ্গে ভারতের ব্যবসা ও বিনিয়োগও বাড়ছে। মিয়ানমারের সঙ্গে চীন ও ভারতের সীমান্ত থাকায় উভয় দেশই মিয়ানমারের সঙ্গে নানাবিধ সম্পর্ক জোরদার রেখেছে। এ কারণে এই দুটি দেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে মিয়ানমারকে চাপ দিতে চায় না। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীনের এগিয়ে আসা উচিত বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ।
তিনি আরো বলেন, চীন ও ভারতের ন্যায় মিয়ানমারের সঙ্গে জাপানেরও বড় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ স্বার্থ রয়েছে। কাজেই জাপানও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জোরালো ভূমিকা নিচ্ছে না। তবে মিয়ানমারে কোনো সুশীলসমাজ গড়ে না ওঠায় দেশটির ভেতর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো চাপ তৈরি হচ্ছে না। তাই প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে থেকে সুুশীলসমাজকে এ ব্যাপারে সক্রিয় করা যেতে পারে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সিভিল সোসাইটিকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার জন্যই ভারতের সিভিল সোসাইটি আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সিভিল সোসাইটি সরব হলে ভারত সরকার ভূমিকা নিতে বাধ্য হবে। একইভাবে জাপানের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। তিনি বলেন, অনেক দেশ রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার করে না। তারা বলে স্থানচ্যুত। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে ভূমিকা নিতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবীর বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সমস্যার সমাধান না হলে এই অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট দেখা দেবে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে জনগনের সংঘাতের কারণে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও চীনে মিয়ানমার থেকে শরণার্থী বাড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বড় সমস্যা তৈরি হবে শরণার্থী নিয়ে।





