বদরগঞ্জের গ্লোরী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা

নাম-পরিচয়হীন দুস্থ্য নারীদের সেবা প্রদান করছেন মারুফ কেইন ও মরিয়ম বেগম

ছবি : বাংলাদেশের খবর

ফিচার

তারুণ্যের উদ্যোগ

বদরগঞ্জের গ্লোরী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা

  • প্রকাশিত ২৯ অক্টোবর, ২০১৮

আশরাফুজ্জামান বাবু, বদরগঞ্জ (রংপুর)

মানুষ সৃষ্টিকর্তার প্রিয় শ্রেষ্ঠ জীব। জগতে বেঁচে থাকাকালীন এই মানুষকেই সম্পদ, জ্ঞান, শক্তি ও শিক্ষার ভিত্তিতে সুস্থ অবস্থায় পৃথিবীর আবর্জনার স্তূপ থেকে মঙ্গল গ্রহ পর্যন্ত বিচরণ করতে দেখা যায়। আবার এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সহায়-সম্পদহীন হয়ে নানা ধরনের রোগ-শোকে জর্জরিত। তাদের মধ্য থেকে পথে-প্রান্তরে আহত, অচল, নবজাতক থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের একটি অংশকে অযত্নে অবহেলায় আবর্জনার স্তূপে নির্বাক মলিন বদনে অসুস্থ অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনতেও দেখা যায়। সভা-সেমিনার কিংবা বক্তব্যে অসহায় মানুষদের নিয়ে কথা বলতে পারদর্শী মানুষ পাওয়া যত সহজ, ঠিক ততটাই কঠিন অসহায়দের নিয়ে সত্যিকারার্থে কাজ করার মতো মানুষ। আমাদের সমাজে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো লোক খুঁজে পাওয়া বড় কষ্টের বিষয়। সমাজ চলছে, দেশ চলছে, সবই চলছে তার নিজস্ব গতিতে কিন্তু সমাজের অসহায় মানুষদের দিন চলছে অনাহারে, অর্ধাহারে, না খেয়ে, রাস্তায় ময়লার স্তূপে।

এদের কেউ অসুস্থ হয়ে, কেউবা দরিদ্রতার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। এরপর রাস্তা কিংবা স্টেশন হয় তাদের ঠিকানা। ফুটপাতের গলিতেই পড়ে থাকেন কেউ। অপরদিকে তাদের আশ্রয় না দিয়ে সমাজের ভালো মানুষগুলোর কেউ কেউ পাগল বলে তাড়িয়ে দেন তাদের। খাদ্য, বস্ত্র ও ঠিকানাহীন এসব মানুষ দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন। তাদের কেউ দেয় না খাবার, রাখে না খোঁজ। স্বজনরাও একদিন খুঁজতে খুঁজতে হয়তো ক্লান্ত হয়ে নিখোঁজ ওই স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেন। এভাবেই তাদের ওই নিখোঁজ স্বজনের শেষ পরিণতি হয় বেওয়ারিশ লাশ, যার জন্য একফোঁটা অশ্রু ফেলার কেউ নেই।

রংপুরের বদরগঞ্জের এম এ মারুফ কেইন ওইসব নিরন্ন, গৃহহীন, অসহায় মানুষের সেবায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন পরম মমতায়। তিনি অসীম সাহসের সঙ্গে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ওইসব নিরন্ন, গৃহহীন, অপ্রকৃতিস্থ মানবতার গহিনে প্রবেশ করে তাদের ভেতরে আশার আলো জ্বালাতে বদ্ধপরিকর।

উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের হাসিনা নগরে এই দৃঢ়প্রত্যয়ী মারুফ গড়ে তুলেছেন ‘গ্লোরী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ নামে মানবসেবার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। নাম ঠিকানা পরিচয়হীন নিরন্ন গৃহহীন অসুস্থ মানুষদের স্বেচ্ছায় সেবা দিয়ে যাচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানটি। গোড়ার দিকে মানবসেবায় নিবেদিত মারুফ কেইন ব্যক্তি উদ্যোগে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন।

জাতি ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে মানবসেবার লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয় এটি। চারটি খড়ের আঁটি, দুটি চটের বস্তা আর একটি কম্বল দিয়ে একটি ভাড়া করা টিনশেড ঘরে শুরু হয়েছিল এর কার্যক্রম। পরে অনেকেই এগিয়ে দেন সাহায্যের হাত। এক মুষ্ঠি থেকে এক কেজি চাল, একটি গ্লাস, একটি প্লেট, একটি মশারি, কিছু পুরনো কাপড়- এভাবেই একেকজনের ছোট ছোট সাহায্য অসহায় মানুষের সেবায় যোগ হতে থাকে প্রতিদিন। একসময় নিজের অর্থে কেনা জমিটুকুও মারুফ দান করেন তার হাতে গড়া এই সংস্থার নামে। সেখানেই এখন গড়ে উঠেছে সংস্থার নিজস্ব অবকাঠামো। বর্তমানে ১৫ জন অসহায় অজ্ঞাতনামা মানুষ থাকতে পারবেন এখানে। এখন আছেনও ১৫ জন।

মারুফ কেইন একটি বেসরকারি সংস্থার চাকরিও ছেড়ে দিয়েছেন এ কাজের জন্য। এ পর্যন্ত তিনি ৩৮ জন অসহায় নারী-পুরুষকে এ সংস্থা থেকে সেবা দিয়েছেন।

এক ছুটির দিন সকালে ওই সেবাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, স্ত্রী মরিয়ম বেগমের সহযোগিতা নিয়ে পরম মমতায় সেবা দিচ্ছেন মারুফ কেইন। আর সঙ্গে রয়েছে প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত সেবিকা শান্তি রানি সরকার। এলাকার মানুষের সহযোগিতায় তৈরি করেছেন চারটি পাকা কক্ষ।

গ্লোরী সমাজ উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মারুফ কেইন বলেন, ‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো কিছু অসহায় মানুষ ফুটপাতে পড়ে থেকে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। তাই আমি সবার সাহায্য নিয়ে তাদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সুস্থ হওয়ার পর যারা নাম-ঠিকানা বলতে পারছেন, তাদের অভিভাবকদের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আর যারা নাম-ঠিকানা বলতে পারেন না, তাদের এখানেই রাখার ব্যবস্থা করছি।’

তিনি বলেন, ‘আমি মাদার তেরেসার জীবনী থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের সেবায় নেমেছি। ভবিষ্যতে মানুষের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এটি বাংলাদেশের মধ্যে মানবসেবায় অনন্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রাশেদুল হক বলেন, ‘আমি সেখানে গিয়ে অসহায় মানুষদের খোঁজ-খবর নিয়েছি। তাদের পাশে থেকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য আহসানুল হক চৌধুরী ডিউক বলেন, ‘ওই সংস্থার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে নিয়মিত প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনেও এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads