বজ্রপাত, বৃক্ষনিধন ও ক্ষয়ক্ষতি প্রসঙ্গ

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

বজ্রপাত, বৃক্ষনিধন ও ক্ষয়ক্ষতি প্রসঙ্গ

  • আবদুল হাই রঞ্জু
  • প্রকাশিত ২ জুন, ২০২১

বজ্রপাত আবহাওয়ার একটি সাধারণ ঘটনা হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিশ্বময় তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে সারাদেশে মারা গেছে ১৬৭ জন। মূলত খোলা মাঠে, খাল-বিল-নদীতে মাছ ধরায় ব্যস্ত থাকা কৃষক ও জেলেরাই বেশি মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশে বজ্রপাত নিয়ে গবেষণা করছেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএ ফারুক; তার মতে, মূলত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি বেশি ঘটছে। বাংলাদেশের একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসগর। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল ও বরফে ঢাকা হিমালয় পর্বত। অর্থাৎ সাগরের গরম হাওয়া ও উত্তরের শীতল হাওয়ার কারণেই যে মিশ্রন ঘটে, সেখান থেকেই বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা উষ্ণ হয়ে উঠছে। আবার গরম ও ঠান্ডা বাতাসের কারণে তৈরি হচ্ছে বজ্রমেঘের। ফলে মেঘে মেঘে ঘর্ষণে অতি ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ যখন মাটিতে নেমে আসে, তখন নিচে কাছে যা পায় তাতেই আঘাত হানে। বিশেষ করে খোলা জায়গায় যেখানে বড় কিম্বা উঁচু কোন গাছ নেই, সেখানে সরাসরি ক্ষেতে কর্মরত কৃষক ও জেলেরাই বেশি আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০১১ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৭ বছরে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মারা গেছে এক হাজার ৪০০ শত মানুষ। এছাড়া বিপুল পরিমাণ গবাদি পশুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও গবেষক ড. এমএ ফারুখের মতে গত ৬ বছরের তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বাস্তবে দুই হাজারেও বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলংকা, ভারতের কয়েকটি অংশ ও নেপালেও বজ্রপাত হয়। তবে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে প্রবণতা অনেক বেশি। বিশেষ করে তাপমাত্রা ও বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া, জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহার বৃদ্ধি, প্রচুর পরিমাণ মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে রেডিয়েশন, গোটা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সংখ্যা বৃদ্ধি, পক্ষান্তরে বনভূমি ও গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে যেমন বজ্রপাত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি উঁচু গাছ না থাকায় প্রতিরোধও হচ্ছে না। এমনকি বিশ্বময় উষ্ণ তাপমাত্রার কারণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস, আইলা, আম্ফান, সিডরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো লেগেই আছে। আর এপ্রিল ও মে মাস আসলেই কালবৈশাখীর সময় বজ্রপাতে কম-বেশি প্রতিদিনই মানুষ ও গবাদিপশু মারা যায়। বজ্রপাতের চমকানি দেখে দেখে তো বড় হয়েছি। কিন্তু বজ্রপাতে মানুষের হতাহতের পরিমাণ এখন যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, অতিতে কিন্তু তা কখনো দেখিনি। বেসরকারি সংখ্যা ডিজাস্টার ফোরামের মতে, গত কয়েক বছরে বজ্রপাতের ঘটনা ১৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। দেশে গত এক দশকে অন্য যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। ফলে সরকার গত ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকারের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, বিশ্বে বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম ও লাইটিং এরেস্টর বা বজ্রপাত নিরোধক স্থাপনের মাধ্যমে মানুষকে রক্ষায় পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। যদিও সরকার বাস্তব এ অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে বজ্রপাতের আগাম সতর্ক বার্তা দিতে ইতোমধ্যেই ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৮টি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর বসিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা দিয়ে এখনো মিলছে না কোন সতর্কবার্তা। তবে আমরা মনে করি, গোটা দেশে মাত্র ৮টি স্থানে লাইটনিং ডিডেকটিভ সেন্সর বসিয়ে কোন সুফল মিলবে না। এ জন্য সরকারকে বজ্রপাত সতর্কিকরণ প্রকল্প গ্রহণ করে গোটা দেশে বেশি বেশি করে স্থাপন করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এমনকি উঁচু গাছ ব্যাপকভাবে লাগাতে হবে। যদিও সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ৬১ জেলায় ৫৪ লাখ ১১৯টি তালগাছ লাগিয়েছে। যদিও এসব গাছ উঁচু হতে সময় লাগবে। অর্থাৎ এ সবের সুফল এখন পাওয়া না গেলেও ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে। যে কারণে গোটা দেশে ব্যাপকভাবে তালগাছ, নারিকেল গাছ আরো লাগাতে হবে। এমনকি বড় বড় গাছ কাটা বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের কারণে সরকার পুরনো বড় বড় গাছ কেটে সাবাড় করছে। যদিও তার পরিবর্তে গাছ লাগানোও হচ্ছে। কিন্তু সে গাছতো আর লাগা মাত্রই বড় হবে না। সংঘত কারণে পুরনো উঁচু গাছ কাটা বন্ধ রাখতে হবে। এমনকি সরকারিভাবে গোটা দেশেই বাসাবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে এবং মোবাইল টাওয়ারের আশেপাশে উন্নতমানের আর্থিং ব্যবস্থাকে জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে দেশের যেসব মোবাইল কোম্পানি চুটিয়ে ব্যবসা করছে। তাদেরকে আইনের আওতায় এনে প্রতিটি টাওয়ার এলাকায় নির্দিষ্ট সংখ্যক আর্থিং করাতে বাধ্য করতে হবে। কারণ তারা মোবাইল টাওয়ার দিয়ে ব্যবসা করবে আর মানুষের নিরাপত্তায় অর্থ ব্যয় করবে না, তাতো হতে পারে না। এজন্য হাইকোর্টে জনস্বার্থে কাউকে না কাউকে রীট করে বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকাতে মোবাইল কোম্পানিগুলোকে ও সরকারকে বজ্রপাত প্রতিরোধে আর্থিং ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধিকে আইনি কাঠামোয় আনতে হবে।

উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২৫ মিলিয়ন বজ্রপাত হলেও মানুষ মারা যায় ৪০ থেকে ৫০ জন। ভারতীয় আবহাওয়া অফিসের রাডার থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২ হাজার ৪০০ এর মতো বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে বছরে কি পরিমাণ বজ্রপাত হয়, সেটি রেকর্ড করার প্রযুক্তি আমাদের দেশে নেই। তবে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড করা আছে। ফাউন্ডেশন ফর ডিজিস্টার ফোরামের রেকর্ড মতে গত ২০১০ সাল থেকে ২০২১ সালের ১ মে পর্যন্ত বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা এখানে তুলে ধরা হলো। ২০১০ সালে বজ্রপাতে ১২৩ জন, ২০১১ সালে ১৭৯ জন, ২০১২ সালে ৩০১ জন, ২০১৩ সালের ২৮৫ জন, ২০১৪ সালে ২১০ জন, ২০১৫ সালে ২৭৪ জন, ২০১৬ সালে ৩৫০ জন, ২০১৭ সালে ৩০২ জন, ২০১৮ সালে ২৭৭ জন, ২০১৯ সালে ২৩০ জন, ২০২০ সালে ৩৮০ জন এবং ২০২১ সালে ১ মে পর্যন্ত ৮৮ জন সহ মোট ১৯৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মূলত মাত্রাতিরিক্ত প্রযুক্তি ও যান্ত্রিক উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় মাঠে, নদীতে, খোলা জায়গায় সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে মৃত্যুসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিষয়ে সচেতনতা ও প্রতিকারে ব্যবস্থা না নিলে বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা অদূর ভবিষ্যতে আরো বেড়ে যাবে। বিশেষ করে পুরনো বড় গাছ যেগুলো নিজের বুক আগলে বজ্রপাতের মৃত্যু থেকে মানুষকে বাঁচায়, সেসব গাছ কিম্বা বনভূমি উজাড় করে দেয়া হচ্ছে। এমনকি খোদ রাজধানীতে প্রশাসনের নাকের ডগায় কয়েক বছর ধরে অনেক পার্কে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে শত শত গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। গাছ কেটে তৈরি করা হচ্ছে খাবারের দোকান, পানির পাম্প, মিউজিয়াম, কার পার্কিং জোন, পাবলিক টয়লেট, মিনি ওয়েস্ট ট্রান্সফার স্টেশন এমনকি এটিএম বুথ পর্যন্ত। অতি সম্প্রতি ওসমানী উদ্যান ও ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পরিচিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বেশ কিছু গাছ কাটা হয়েছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। অথচ রাজধানীর ‘ফুসফুস’ খ্যাত রমনা পার্ক, ওসমানী উদ্যান, গুলশান শুটিং ক্লাব, পান্থকুঞ্জ পার্ক, বাহাদুর শাহ পার্ক সমূহে গাছ কাটিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে কংক্রিটের জঞ্জাল! এমনিতেই ঢাকা শহরের জনবসতির আধিক্য, সারিসারি দালান কোঠার কারণে সবুজের সমারোহ একেবারেই কম, সেখানে যদি সরকার অপরিকল্পিত ভাবে পার্কের গাছ কেটে উজাড় করে, তাহলে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা হবে কীভাবে? ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছ কাটার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার নড়ে চড়ে বসে ঘোষণা দেয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজের সমারোহ বৃদ্ধি করতে আরো ১৩শ নতুন গাছ লাগানো হবে। ভালো কথা লাগানো হবে গাছের চারা, গাছ তো নয়! যা বড় হতে অনেক সময়ই লাগবে। ততদিনে বজ্রপাত, ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হওয়া কি বন্ধ থাকবে? বাস্তবে আমাদের দেশে পরিবেশবাদীদের পরামর্শ ছাড়াই যত্রতত্র গাছ নিধন করায় পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রমই জোরদার হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের আইনে গাছ কাটা একটি বড় ধরণের অপরাধ। কিন্তু আইন থাকলেও আইন প্রয়োগকারীদের হাতেই বারবার আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে। অথচ জাপানসহ উন্নত অনেক দেশে বড় বড় গাছ কাটার প্রয়োজন হলে শিকড় না কেটে বিশেষ পদ্ধতিতে সেসব গাছকে অন্যত্র নিয়ে লাগানো হয়। এতে উন্নয়ন কাজও হয়, আবার গাছও কাটা হয় না। অথচ আমাদের দেশে বিশেষ কোন কারণে মরা গাছ কাটার অনুমোদন দিলে ওর সঙ্গে আরো জীবিত গাছ কাটা হয়। আর এসব কাজ চলে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে প্রশাসনের নীরবতার আড়ালে। ফলে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের মৃত্যুহার ক্রমান্বয়েই বাড়ে। অতিসম্প্রতি ঝড়ের সময় আত্রাই উপজেলার কালিশপুর ইউনিয়নের শলিয়া গ্রামে নারিকেল গাছে বজ্রপাত পড়লে নারিকেল গাছটি দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। হয়ত এখানে এই নারিকেল গাছটি না থাকলে বজ্রপাতের কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটে যেতো। বাস্তবে উঁচু গাছ কিভাবে বজ্রপাত প্রতিরোধ করে, যা এবার গাছে আগুন ধরায় ফেসবুকের বদৌলতে দেশের মানুষ তা প্রত্যক্ষ করেছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, বজ্রপাতের হাত থেকে বাঁচতে হলে প্রতিরোধে যেমন উঁচু গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে, তেমনি আকাশ খারাপ করে ঝড়ের সম্ভাবনা দেখা দিলে খোলা মাঠ থেকে চাষীদের ও নদী থেকে জেলেদের দ্রুত সরে এসে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে। একমাত্র সচেতনতা সৃষ্টি করে বজ্রপাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে হবে। এটা যেমন সরকারকে বিশেষভাবে প্রচার প্রচারণা করতে হবে। তেমনি সাধারণ মানুষকেও সচেতন ভাবে বজ্রপাতের হাত থেকে নিজেদের রক্ষায় নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। তা না-হলে বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমানো অনেকাংশেই কঠিন হবে।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সমাজ বিশ্লেষক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads