জাতীয়

বিশ্বের ৭ম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার গাজীপুরে

বছরে আয় ৩৫০ কোটি টাকা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১১ নভেম্বর, ২০২১

বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টার গড়ে উঠেছে গাজীপুরে। কালিয়াকৈরে ৩৫৫ একর জায়গার ওপর বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি ভেতরে অন্যান্য স্থাপনার একটি ভবনে এই ডাটা সেন্টারের অবস্থান। প্রায় ২ লাখ স্কয়ার ফিটের দ্বিতল ভবনটিকে ঘিরে রয়েছে পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বলয়। ভবনের পাশে রয়েছে দুটি ইউটিলিটি ভবন রয়েছে।

৭ একর জমির ওপর এই ডাটা সেন্টার তৈরিতে আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতা করেছে চীন। ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টারটি সার্টিফাই করেছে ক্লাউড কম্পিউটিং ও জি-ক্লাউড প্রযুক্তির আপটাইম ইনস্টিটিউট। আর এটি বিশ্বের ৭ম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার ‘রূপকল্প-২০২১ : ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের কার্যক্রম’ ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের তথ্য উপাত্ত নিরাপদে সংরক্ষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন গুণগত মানসম্পন্ন ই-সেবা দেওয়া নিশ্চিতের লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর ডাটা সেন্টারটি চালু হয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় দেশে একটি ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টার নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এ ডাটা সেন্টারের কাজ। আপটাইম ইনিস্টিটিউড কর্তৃক সার্টিফাইড ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টারের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০১৯ সালের জুন মাসে।

বিশ্বের ৭ম বৃহত্তম ডাটা সেন্টারটির ডাউন টাইম শূন্যের কোটায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান আপটাইম ইন্সটিটিউট বিশ্বব্যাপী ডাটা সেন্টার স্থাপন ও পরিচালনা পদ্ধতি পরীক্ষার মাধ্যমে এর সনদ দেয়। তারা এই ডাটা সেন্টারটির ধারণ ক্ষমতা, ডিজাইন, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও অন্যান্য গুণগত মান পরীক্ষা করে টায়ার ফোর সার্টিফিকেট অফ ডিজাইন ডকুমেন্ট এবং টায়ার ফর সার্টিফিকেট অফ কনস্ট্রাকশন ফ্যাসেলিটি সনদও দিয়েছে।

বর্তমানে টায়ার সার্টিফিকেট অফ অপারেশানাল সাসটেনেবলেটি অর্জনের মাধ্যমে টায়ার ফোর গোল্ড ফন্ট টলারেন্ট ডাটা সেন্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কার্যক্রম চলছে। আপটাইম ইনস্টিটিউট কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের একমাত্র ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টারটি ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডাটা সেন্টার ডায়নামিক্স সংস্থা কর্তৃক ‘ডাটা সেন্টার কনস্ট্রাকশন টিম অফ দ্যা ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে এশিয়া প্যাসিফিক ডিসিডি-এপিএসি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে।

আন্তর্জাতিক মানের সর্বাধুনিক এই ডাটা সেন্টারে নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন ও মেইন্টেন্যান্স নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগসহ সব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে রিডান্ডেন্সি। এছাড়া এখানে ক্লাউড কম্পিউটিং, ক্লাউড ডেক্সটপ, ক্লাউড স্টোরেজ, ডাটা স্টোরেজ ও ব্যাকআপ, ডাটা সিকিউরিটি ও কো-লোকেশন সার্ভিস রয়েছে। ৯৯.৯৯৫ শতাংশ আপটাইম বিশিষ্ট এই ডাটা সেন্টার থেকে ২৪ ঘণ্টা আর সপ্তাহে ৭ দিনই সেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল দ্বারা ডাটা সেন্টার পরিচালনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সর্বাধুনিক এ ডাটা সেন্টারটি গত ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন।

জানা গেছে, ডাটা সেন্টারের ক্লাউড সার্ভিস হতে গ্রাহককে ভার্চুয়াল মেশিন তৈরি করে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হয়। যার মাধ্যমে গ্রাহক যে কোনো স্থান থেকে লগ-ইন করে সুরক্ষিত উপায়ে সেবা গ্রহণ করতে পারে। এক্ষেত্রে গ্রাহকের কোনো হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার ক্রম বা রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয় না। শুধু ইন্টারনেট ব্যবহার করে গ্রাহক নিশ্চিন্তে ই-সেবা গ্রহণ করতে পারে। অপরদিকে কো-লোকেশন সেবায় গ্রাহককে ৪ কেডাব্লিও/১০ কেডাব্লিও বিদ্যুৎ সংযোগসহ শীতাতপ ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সঙ্গে বিশ্বমানের অগ্নি-নির্বাপণ, নিরাপত্তা, ইন্টারনেট ইত্যাদি ব্যবস্থা সম্বলিত স্পেস দেওয়া হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে গ্রাহক পছন্দমতো আইটি যন্ত্রপাতি স্থাপন করে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিতে পারে। এক্ষেত্রে গ্রাহক কর্তৃক স্থাপিত আইটি যন্ত্রপাতিগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা গ্রাহককে করতে হয়। বর্তমানে ডাটা সেন্টারে ওরাকল প্রযুক্তি ব্যবহার করে জি-ক্লাউড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জি-ক্লাউড স্থাপিত হলে সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের বিভাগ ও সংস্থার তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করা যাবে।

ডাটা সেন্টারটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য গত ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড’ শীর্ষক কোম্পানি গঠনের প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদিত হয়। গত ২০২০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ‘বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড’ নামে কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। বর্তমানে কোম্পানির নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ‘নিরাপদ তথ্য সেবা’ এর প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ৯ মাসের মধ্যে এটুআই এর ই-নথি ও উন্নয়নকৃত অন্যান্য সকল সেবাসহ সরকারের ১০টি প্রতিষ্ঠান এর সাথে সার্ভিস সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরো ১২টি প্রতিষ্ঠান চুক্তি স্বাক্ষরের পর্যায়ে আছে। বর্তমানে কোম্পানির মাসিক আয় তিন কোটি আটানব্বই লাখ টাকা এবং মাসিক ব্যয় এক কোটি সাতানব্বই লাখ টাকা।

ফোর টায়ার জাতীয় ডাটা সেন্টারের সেক্রেটারি লতিফুর কবির বলেন, বিশ্বমানের এ ডাটা সেন্টার স্থাপনের ফলে বিদেশি ডাটা সেন্টারের নির্ভরতা ও অর্থ ব্যয় পরিহার সম্ভব হচ্ছে। এ সঙ্গে ডাটা লোকালিজিশন নিশ্চিত করা যাচ্ছে। ডাটা সেন্টারে ওরাকল প্রযুক্তির জি-ক্লাউড স্থাপন করা সম্পন্ন হলে ইনফারাস্ট্রাকচারাল অ্যাজ এ সার্ভিস, প্ল্যাটফরম অ্যাজ এ সার্ভিস এবং সফটওয়ার অ্যাজ এ সার্ভিস এই তিনটি সেবাই দেওয়া সম্ভব হবে।

জানা গেছে, এ তিন সেবা দেওয়া সম্ভব হলে বাংলাদেশে ওরাকলের লাইসেন্স কেনা ও রিনিউ বাবদ বাৎসরিক ব্যয় ৪৫ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। সেই সঙ্গে কোম্পানির আয়ও বৃদ্ধি পাবে। ওরাকল ক্লাউড এ ডাটা লোকালাইজড এবং স্ট্যান্ড অ্যালোন ব্যাকআপ থাকবে।

তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানা গেছে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের ঘোষণা ছিল। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ঘোষিত সে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ক্ষমতায় এসে সরকার দেশের বিভিন্ন হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, আইটি সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এসবের অনেক উদ্যোগগুলো ইতিমধ্যে দৃশ্যমান, বাকিগুলোর কাজ এগিয়ে চলেছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads