জাল টাকার কারবারিদের ধরতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সদা তৎপর। প্রায়ই দেখা যায় পুলিশ জাল টাকার কারবারিদের ধরছে, তাদের সাজাও হচ্ছে। কিন্তু তারপরও এটা থামানো যাচ্ছে না। জাল টাকা বানানো এবং তা বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ অব্যাহত রয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, জাল নোট প্রতিরোধে দেশে আলাদা কোনো আইন নেই। দণ্ডবিধি-১৮৬০-এর ৪৮৯(ক)-(ঘ) ধারা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪-এর ২৫(ক) ধারা অনুযায়ী এ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার হয়। একই অপরাধ বার বার করা হলেও তাতে শাস্তি বাড়ানোর ধারা নেই। কেউ কেউ আট-দশবারও আটক হয়েছেন, জেলও খেটেছেন। জেল থেকে বের হয়ে তারা ফের নির্ভয়ে জাল টাকার কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন। পুলিশ সদর দপ্তর ও মহানগর ডিবি পুলিশের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন থানায় জাল নোটসংক্রান্ত মামলা রয়েছে প্রায় সাত হাজার। ২০১০ থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত শুধু ঢাকা মহানগরেই জাল টাকার মামলা হয়েছে ৫৯২টি। যার প্রত্যেকটি মামলা বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ এর ২৫(ক) ধারা অনুযায়ী হয়েছে। গত বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালে এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৫০টি। যে পরিমাণ নতুন মামলা হয়েছে নিষ্পত্তি হয়েছে তার অনেক কম। অন্যদিকে আইনি দুর্বলতার কারণে অনেক সময় সন্দেহভাজন অপরাধী জাল নোটসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তারের পরও দিনে দিনে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যমান আইনে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর বিষয়টি থাকায় জাল নোট কারবারিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দ্রুত ছাড়া পায়। হয়রানির ভয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা সাক্ষী হতে চান না। অনেক সময় কোনো সাক্ষী একবার সাক্ষী দিলেও পরের হাজিরার দিনে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। নিজ খরচে বার বার আদালতে আসতেও অনীহা অনেকের। যদিও এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসককে তার যাতায়াত খরচ বাবদ টাকা দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ আছে, ওই টাকা সরকারি প্রক্রিয়ায় তোলার হয়রানিতে যেতে চান না সাক্ষী।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান বলেন, বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪-এর ২৫(ক) ধারা অনুযায়ী এ সংক্রান্ত অপরাধের মামলা হয়। আইনে কিছু ফাঁকফোকর থাকার কারণে হুমায়ুন কবিরে মতো জাল নোটের কারবারিরা দশমবার গ্রেপ্তার হয়েও বের হয়ে আসে। আমরা পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকেই প্রথম এ আইন নিয়ে কথা বলি। আইনটি এখন খসড়া অবস্থায় আছে। আশা করি নতুন আইনে মামলা শুরুর পর এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, প্রায়ই দেখা যায় একই ব্যক্তি একই অপরাধে এর আগেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বিদ্যমান আইন তাদের আটকে রাখতে পারে না। দ্রুত বেরিয়ে ফের তারা পুরনো কারবারে জড়িয়ে পড়েন।
জাল টাকা কারবারিদের শাস্তি হিসেবে সর্বনিম্ন দুই বছর ও সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক লাখ থেকে এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রেখে জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমবার কেউ জাল নোটের কারবারে জড়ালে সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হবে না। দ্বিতীয়বারও নয়। টানা তিনবার ৫০০ পিসের বেশি জাল নোট নিয়ে ধরা পড়লে তাকে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
খসড়া আইনে বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি প্রথমবার যে কোনো মানের ১০০ পিসের কম জাল মুদ্রা নিয়ে ধরা পড়ে, তবে তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। ১০০ পিসের বেশি তবে ৫০০ পিসের কম হলে শাস্তি হবে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। আর ৫০০ পিসের বেশি হলে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। তবে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করলে কারাদণ্ড পাঁচ, সাত ও ১২ বছর এবং জরিমানা পাঁচ, ১০ ও ২০ লাখ টাকা করা হবে। আর তৃতীয় বা তার বেশিবার কেউ এ অপরাধ করলে ন্যূনতম ১০ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা এবং সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানা হবে।
খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, কারো কাছে জাল মুদ্রা থাকলেই তার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। ওই জাল মুদ্রার বাহক আত্মপক্ষ সমর্থন বা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাবেন। বাহক যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি সরল বিশ্বাসে ওই মুদ্রা বহন এবং বৈধ লেনদেনের অংশ হিসেবে ধারণ করেছেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে না।
জাল নোট প্রচলন প্রতিরোধ সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সিআইডি, এনএসআই ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধির সমন্বয়ে ছয় সদস্যের একটি উপ-কমিটি করা হয় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। ওই কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ আইন বাস্তবায়ন হলে এ ধরনের অপরাধ কিছুটা কমে আসবে।
তেজগাঁও গোয়েন্দা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, গত ২৩ অক্টোবর রাজধানীর কোতোয়ালি ও আদাবর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫৮ লাখ জাল টাকা ও ১১৩টি জাল ডলারসহ একটি চক্রকে আটক করেছি। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪-এর ২৫(ক) ধারা আনুযায়ী মামলা দিয়েছি। এর আগেও তারা গ্রেপ্তার হয়েছিল। নতুন আইন চূড়ান্ত হলে এরা বার বার জাল টাকার কারবারো জড়ানোর সুযোগ পাবে না।





