পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে অপরিকল্পিতভাবে বিধিনিষেধ আরোপে দুর্ভোগে পড়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। হঠাৎ করে গণপরিবহন বন্ধ করায় অনেকের ঘরেই মজুত ছিল না খাদ্য-পথ্যসামগ্রী। সময়মতো অফিস পৌঁছতে পারেননি কর্মজীবীরা। ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিপণিবিতান, শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় মহা বিপদে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। পণ্য সরবরাহে সংকটের নামে প্রতিদিন বাড়ছে দৈনন্দিন খাদ্যসামগ্রীর দাম। করোনা আক্রান্তের ভয়ে আতঙ্কিত মানুষ পরীক্ষা বা চিকিৎসার জন্য ছুটছেন বিভিন্ন হাসপাতালে। আর হাসপাতালে সিরিয়াল বা সিট না পেয়ে দিগ্বিদিক ছুটছেন তারা।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে অনেক সময় হাতে পেলেও সরকারের উদাসীনতায় এবারও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এদিকে বর্তমান অবস্থাকে লকডাউন বলতে রাজি নন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ তার নিজের ইচ্ছামতো লকডাউনের একটি সংজ্ঞা তৈরি করেছে। এর সাথে সায়েন্টিফিক লকডাউনের কোনো মিল নেই। এর ফলে করোনা আরো ছড়ানোর আশঙ্কা করছেন তারা। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জননিরাপত্তার কথা ভেবেই লকডাউন দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, লকডাউনের নামে সরকারের অপরিকল্পিত বিধিনিষেধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে নতুন অত্যাচার হিসেবে দেখা দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে বিধিনিষেধের ঘোষণা ও নির্দেশনায় ক্ষমতাবানদের জন্য এক নীতি, আর স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আরেক। শ্রমজীবী-মেহনতিসহ স্বল্প আয়ের মানুষের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত না করে হঠাৎ করে লকডাউন দেওয়ায় দৈনন্দিন খেটে খাওয়া মানুষের হয়েছে নানা দুর্ভোগ। ৫ ও ৬ এপ্রিল অফিস-আদালত খোলা রেখে গণপরিবহন বন্ধ রাখা শুধু জনদুর্ভোগকেই বাড়িয়ে দিয়েছিল। গার্মেন্টসহ বড় বড় কলকারখানা খোলা রেখে, মেলা আর খেলা চালু রেখে, দোকানপাটসহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবাধর্মী কার্যক্রম বন্ধ রাখা সরকারের স্ববিরোধী পদক্ষেপের নমুনামাত্র। এসব কারণে লকডাউন শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের ওপর অত্যাচার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তা ছাড়া গার্মেন্টসহ কলকারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকিমুক্ত নয়। অন্যদিকে বিধিনিষেধের অজুহাতে অসৎ ব্যবসায়ীরা খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে চলেছে। বিধিনিষেধকে মুনাফাখোররা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করছে। টিসিবির পণ্যের দাম বাড়িয়ে মানুষকে আরো কষ্টের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। করোনার মারাত্মক ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লকডাউন কার্যকর করতে হলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ শ্রমজীবীদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করার দাবি করেন তিনি। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, গত বছরের লকডাউনে ব্যবসায়ীরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এখনো তারা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারেনি। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন পার করছেন। এদিকে আগামী পহেলা বৈশাখ, রমজান ও ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা স্বল্প সময়ের ঋণে লাখ লাখ টাকার মালামাল তুলেছেন। অনেকের দৈনিক ব্যবসা করেই কিস্তির টাকা দিতে হয়। তা ছাড়া সারা বছরের ব্যবসা হয় ঈদের আগের দুই মাসে। এ অবস্থায় সরকার লকডাউন দিয়েছে। এবারও যদি এই সময় মার্কেট বন্ধ থাকে, তাহলে তো আমাদের পথে বসে যেতে হবে। আমাদের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না। তাই যে লকডাউনে মানুষের দুর্ভোগে পড়তে হয় তা আমরা চাই না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু রাখতে চাই।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় গত বছরের মতোই সরকারের পদক্ষেপ সমন্বয়হীন ও অপরিকল্পিত। সরকারি অব্যবস্থাপনায় লকডাউন বা নিষেধাজ্ঞা কোনোটাই মাঠপর্যায়ে কার্যকর হচ্ছে না। বরং দুর্ভোগে পড়েছে জনগণ। লকডাউন বা নিষেধাজ্ঞা কোনোটাই যে কার্যকর হচ্ছে না। শহরের বিভিন্ন স্থানে পরিবহনের জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন, দীর্ঘ অপেক্ষা। খেটে খাওয়া মানুষের ঘরে মজুত নেই খাদ্যসামগ্রী। হঠাৎ করে লকডাউনের ফলে বিপাকে পড়তে হয়েছে জনগণকে। অন্যদিকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষকে পড়তে হচ্ছে নানা দুর্ভোগে। হাসপাতালগুলোতে কোনো সিট খালি নেই। নেই পর্যাপ্ত আইসিইউ, ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেন। রোগীরা চিকিৎসার জন্য এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে ছুটতে পথের মধ্যেই অনেকে মারা যান। গত এক বছর সরকার যথেষ্ঠ সময় পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে স্বাস্থ্য খাতের এমন দুর্বল অবস্থায় দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষদের। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, সরকারের অপরিকল্পিত লকডাউনে মানুষ আরো করোনা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। কারণ, কাঁচাবাজার খোলা থাকলে মানুষ বাজার করতে যাবে। হোটেল খোলা থাকলে মানুষ খাবার কিনতে যাবে। পোশাক কারখানা যেহেতু খোলা থাকবে, হাজারো শ্রমিক বাইরে কাজে যাবেন। দেশের বাইরে থেকেও লোক আসবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহর থেকে মানুষ বিভিন্নভাবে এখন গ্রামে যাচ্ছেন এবং কয়েক দিন পর তারা ফিরে আসবেন। এর মানে হলো কয়েক লাখ মানুষ এই এক সপ্তাহে আসা-যাওয়া করবেন। ফলে লকডাউনের যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে ঘরে আটকে রাখা, বিচ্ছিন্ন রাখা তা সফল হচ্ছে না। বরং মানুষের চলাচল আরো বেড়ে যাচ্ছে গ্রামে যাওয়ার কারণে।
তিনি আরো বলেন, এই লকডাউন করোনা সংক্রমণ না কমিয়ে বরং করোনা সহায়ক হবে। কারণ জনসমাগম এবং মানুষের চলাচল বা সংস্পর্শে আমার যথেষ্ট সুযোগ থাকছে। আর বড় বড় শহর থেকে এখন করোনাভাইরাস নিয়ে মানুষ গ্রামে যাচ্ছেন। ফলে যে ২৪টি জেলায় করোনা সংক্রমণ কম আছে সেই জেলাগুলোতে আরো বেড়ে যাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ রিসার্চ সেন্টারের প্রধান মো. রিদওয়ানুর রহমান বলেন, এটা অবৈজ্ঞানিক লকডাউন। নিয়মনীতি মেনে এটা না করায় তালগোল পাকিয়ে ফেলা হয়েছে। গত বছর সাধারণ ছুটির নামে যে লকডাউন করা হয়েছিল তা-ও ছিল অপরিকল্পিত। এবারও তাই। আর এই লকডাউন করা হচ্ছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে। লকডাউনের আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্যমন্ত্রী এটা নিয়ে কোনো ব্রিফিংও করেননি। শুধু একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আর হঠাৎ করে এ লকডাউনের খারাপ প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। তিনি মনে করেন, কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া এমন লাকডাউনে কোনো সুফল মিলবে না। বরং সংক্রমণ আরো ছড়াবে। যার প্রভাব পড়বে সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের অর্থনীতিতে।





