প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সুস্থধারার সংস্কৃতিচর্চা জরুরি

প্রতীকী ছবি

মুক্তমত

প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সুস্থধারার সংস্কৃতিচর্চা জরুরি

  • এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার পিপিএম
  • প্রকাশিত ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

আবহমানকাল ধরে আমাদের গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতি বিশ্বের কাছে এক অনন্য পরিচয় বহন করে এসেছে। একান্ত নিজস্ব স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল হিসেবে আমাদের দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোনো ভূখণ্ডে নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, সাংস্কৃতিক চর্চায় আমাদের বর্তমান সমাজ ধীরে ধীরে অকার্যকর অসাড়ে পরিণত হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি ছিল প্রশংসা করার মতো। গ্রামেগঞ্জে কিংবা শহরে একসময় জারি, সারি, বাউল, ভাটিয়ালি, কবিগান, যাত্রাপালা নানারকমের সাংস্কৃতিক চর্চায় ভরপুর ছিল। গুনটানা মাঝিমাল্লা, এমনকি সাধারণ মানুষ শারীরিক পরিশ্রমকে কোনোভাবেই মনে দাগ কাটতে দিত না। কখনো গলা ছেড়ে, কখনো গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে তারা পরিশ্রমসাধ্য সময়টুকু পার করে ফেলত খুব সহজে। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি কৃষককে দমাতে পারত না, তারাও জারি-সারি বিভিন্ন রকম গান করে সময়টা কাটাত। এমনকি সন্ধ্যার পর অনেকেই গল্প করে, গান গেয়ে, পুথি পাঠ করে মজা করেই জীবনকে উপভোগ করত। প্রশাসন নয় বরং প্রতিটি সমাজ তার নিজস্ব ভলেন্টিয়ার্স দিয়ে এই কর্মযজ্ঞ খুব নিরাপদে করে আসছিল পরম্পরায়। বড় পরিমাপের কোনো আসরের জন্য প্রশাসনকে অবহিত করার প্রয়োজন হতো। মাসব্যাপী যাত্রা, সার্কাস কিংবা মেলা পরিচালিত হতো স্বাভাবিকভাবেই। এক্ষেত্রে গ্রামীণ আনসার সদস্যদের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে দেখা যেত। কিন্তু আজকের দিনে এসে পারিবারিক বলয়ে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতেও দেখা যায় প্রশাসনের অনুমতির প্রয়োজন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। ভাবতে গেলে সত্যি বিস্মিত হতে হয়, দেশের জন্মলগ্নে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফরম এতটাই কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে, যেমন মুক্তিকামী মানুষকে প্রেষণা দিতে, তাদের মনোবল চাঙা করতে এবং শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণপণে লড়াই করে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক ধারার গুরুত্বপূর্ণ অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে আমরা কমবেশি সকলেই জানি। সেইসাথে বাউল আব্দুল করিমদের মতো অনেকেই একতারা দোতারা হাতে নিজস্ব এলাকায় গান করে মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অনুপ্রাণিত করেছেন। পূজা-পার্বণ থেকে শুরু করে যে-কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কীর্তন, শ্যামাসংগীত এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের আয়োজন চলত নির্বিঘ্নে। দেশের সমস্ত কর্নার থেকে শুরু করে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেও কিছু কিছু দল আসত, এসব আসরে গান করতে। আব্দুল করিম, হাছন রাজা, লালন সাঁইজির অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি মানুষের আগমন ঘটত। এসব আসর নিয়মিত প্রতি বছরই করা হতো। প্রশাসনের কিছু নজরদারিতা পরিলক্ষিত হলেও বস্তুত অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিজস্ব ভলেন্টিয়ার্সরাই নিরাপত্তার কাজটিও করত। সেসময় খুব বেশি বিশৃঙ্খলার উল্লেখযোগ্য কোনো নজির ইতিহাসে নেই। গ্রামের সুন্নতে খাতনা কিংবা বিয়ে বাড়ির অনুষ্ঠানে গান-বাজনা হতো। স্কুল-কলেজগুলোর নবীনবরণ ছাড়াও নানা জাতীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রাধান্য ছিল লক্ষ করার মতো। যে-কোনো দলের রাজনৈতিক অনুষ্ঠানগুলোর উদ্বোধনী কিংবা সমাপনীতে গান-বাজনার আয়োজন করা হতো। স্কুল কলেজগুলোতে ছাত্র-শিক্ষক সমবেত হয়ে গল্প বলা, নাটক মঞ্চস্থ করা, গানের অনুষ্ঠান করা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা করা ইত্যাদি সহশিক্ষা হিসেবে খুবই কার্যকর ছিল। বোধ করি, বিশ পঁচিশ বছর আগেও সাংস্কৃতিক চর্চার পরিধি সন্তোষজনক পর্যায়ে ছিল। ছাত্রছাত্রীদের কাছে সিলেবাসভুক্ত শিক্ষার পাশাপাশি সহ-শিক্ষা হিসেবে খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল খুবই জনপ্রিয়। মানুষের মধ্যে দেশাত্মবোধ তথা দেশপ্রেম অনেক বেশি কার্যকরী থাকায় সে সময়গুলোতে এসব অনুষ্ঠান করার প্রয়োজনে খুব বেশি প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়নি। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছোটখাটো যে-কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে প্রশাসনের পূর্ববর্তী অনুমতি নেওয়া একটি বাধ্যতামূলক চর্চায় পরিণত হয়েছে। অন্তর্নিহিত কারণ যা-ই থাকুক না কেন, সম্ভবত  নিরাপত্তাজনিত ভীতি একটি বড় কারণ বলে এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনুমতির  প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সামাজিক শক্তি, সাম্প্রদায়িক শক্তির ভয়ে ভীত হয়ে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার সবকিছুতেই ধীরে ধীরে প্রশাসনিক শক্তির ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যে-কোরো ধরনের বিশৃঙ্খলা কিংবা অনিয়মের দায় নিরূপণে প্রায় সব ক্ষেত্রেই সামাজিক অভিব্যাক্তিতেও প্রশাসনকেই দায়ী করার প্রবণতা বেড়ে গেছে। সে কারণেই হয়তো নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে, অল্পসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা কর্মী নিয়ে গঠিত ইউনিটগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই অতিরিক্ত চাপকে নিজের কাঁধে নিতে উৎসাহিত বোধ করেন না। পক্ষান্তরে সমাজও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে সাম্প্রদায়িক ভীতির খপ্পরে পড়ে। ফলে এক ধরনের ভয় কিংবা আশঙ্কার কারণে আগের মতো অহরহ যেখানে-সেখানে, যেমন-তেমন করেও মনের আনন্দে বিনোদন উৎসব করা সম্ভব হয় না। এমনকি জাতীয় পর্যায়ের অনেক উৎসবকে সান্ধ্যকালে সম্পন্ন করার তাগিদ আমরা দেখতে পাই।

কেন এবং কখন থেকে এমন ভীতিকর অবস্থা আমাদের পেয়ে বসেছে, প্রসঙ্গক্রমে সে আলোচনা করা যেতেই পারে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির অনুসারী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির যখন থেকে পরিকল্পনা শুরু করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের আধিপত্য বাড়াতে হবে, অন্যথায় রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া কিংবা টিকে থাকা সম্ভব নয়, তখন থেকেই এই অবনমন শুরু হয়। অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে তাদের এজেন্ট প্রবেশ করানো এবং সোর্স তৈরির কাজটিতে তারা গুরুত্ব দেওয়া শুরু করে। সেই প্রক্রিয়ার কর্মকৌশল ও পলিসি বিন্যাস ছিল সাংগঠনিকভাবে খুবই শক্তিশালী একটি পরিকল্পিত কর্মকাঠামো। রাজনৈতিকভাবে তাদের সমর্থক, কর্মীরা তাদের সাথি ও সদস্যদের সমস্ত নির্দেশনা অনুসরণ করত স্ট্রেট লাইন অর্গানাইজেশনের মতো। সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে এই সমর্থক বা কর্মীদের কোনো অংশগ্রহণ থাকত না। কারণ সংগঠনে তাদের বয়স ও আনুগত্যের মাত্রা অনুযায়ী এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে তাদের অংশগ্রহণ থাকলে তথ্যসমূহের গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব ছিল না। আর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃতি ও ভবিষ্যৎ দখলীকরণ কাজে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের টার্গেট করে আশ্রয় এবং অ্যাটাক উভয় কাজে লাগানোর প্রয়োজন অনুভব করে। এসব পরিবারে তাদের অনুসারী তৈরি ও সাংগঠনিক কর্ম প্রসারিত করার ক্ষেত্রে ধর্মাশ্রয়ী কৌশল তাদের জন্য অনেক ফলপ্রসূ হয়েছে। তা ছাড়া এরা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আশপাশে পরিকল্পিতভাবে প্রাইভেট পড়ানো, ধর্মশিক্ষা প্রদান ও বিয়েশাদি করে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলেছে সংগঠনের প্রয়োজনে। কোচিং বাণিজ্য করে পরিকল্পতিভাবে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের দলভুক্ত করে, পরীক্ষায় সফলতা আনয়নের লক্ষ্যে বৈধ-অবৈধ নানাপথ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তাদের অনুসারী বিপুলসংখ্যক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিলসহ গুরুত্বপূর্ণ পেশা এবং সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোতে তাদের জন্য নিবেদিত প্রাণ তৈরি করে চলেছে, দীর্ঘ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে। শোনা যায়, চাকরি জীবনের অর্জিত টাকা থেকে ঐসব নিবেদিত প্রাণ পেশাজীবী মানুষগুলো সংগঠনকে এখনো অর্থ প্রদান করেন।

এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজের সর্বব্যাপী বিস্তার লাভ করে তারা সমাজের সর্বস্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তাদের সমর্থিত জোটবদ্ধ সরকারের সময়ে তাদের ব্যাপ্তি ও ভিত্তি পাকাপোক্তভাবে নিশ্চিত করেছে। অতঃপর, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রচলিত কিছু সাংস্কৃতিক প্রথা রেগ-ডে, পহেলা বৈশাখ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা তৈরি করে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে, এমনকি সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বেশ কিছু অনুষ্ঠানে টানাহ্যাঁচড়ার মতো ঘটনার অন্য কারণ যা-ই থাকুক, এ জাতীয় সংস্কৃতিকে বিজাতীয় সংস্কৃতি প্রমাণ করতে তারা মরিয়া। যার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য হলো, যদি অভিভাবকগণ নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে, তাহলে ভবিষ্যৎ অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাবে। রমনার বটমূলে বোমা হামলা, কিংবা সিনেমা হলে বোমা হামলার ঘটনায় বাংলা সংস্কৃতির বিরুদ্ধচারীরা এই ভয়াল প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। ফলে একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, যে-কোনো ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে গান-বাজনা করার বিরোধিতা করে অহরহ কিছু মানুষ কথা বলছে, যা আসলেই কোনো শুভবার্তা নয়।

সুস্থ, স্বাভাবিক, সুন্দর সামাজিক জীবনযাপনের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক বিনোদনের কোনো বিকল্প নেই। সমাজে সুস্থধারার সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে সুনাগরিক তৈরি করা যেমন সম্ভব, তেমনি কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িক অন্ধকার দূর করাও সম্ভব। মনে রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যখন রাজনৈতিক চর্চা বন্ধ রাখা হয় কোনো কারণে, তখন শুধু প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারার রাজনীতির চর্চাই বন্ধ থাকে মাত্র। বিপরীতে সাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতি যেহেতু ধর্মাশ্রয়ী চরিত্র নিয়ে মানুষের সামনে উপস্থাপিত হয়, কাজেই এসব ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চর্চা দুর্বার গতিতে বিনা বাধায় বিস্তার লাভ করে থাকে। তেমনি করে সুস্থধারার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চর্চা সমাজে যত কমতে থাকে প্রগতিশীল মানুষের জীবনযাত্রা তত বেশি বাধাগ্রস্ত হতে থাকে, বিপদের সম্মুখীন হতে থাকে, সমাজে অস্থিরতা বাড়তে থাকে, যুবসমাজের অবক্ষয় শুরু হতে থাকে, সর্বোপরি সমাজ তার বাসযোগ্যতা হারিয়ে অসারে পরিণত হয়। বিপরীতে এই অসারতার অন্ধকার প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য অবারিত সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশ্ব পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে দেশীয় সংস্কৃতিকে লালন, পালন, সঞ্চালন ও বিকশিত করার মধ্য দিয়ে আলোকিত করেই কেবল একটি সমাজকে সুস্থ, সুন্দর ও আধুনিক বাসযোগ্য সমাজে পরিণত করা সম্ভব। ২০৪১ সালের নির্ধারিত লক্ষ্য, মিশন এবং ভিশন অর্জনে সমগ্র দেশে প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।

পুলিশ সুপার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads