এবার অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভূমিদস্যুদের সঙ্গে জড়িত পৃষ্ঠপোষকদের আমলনামা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তাদের আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, পৃষ্ঠপোষকদের নামের তালিকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সেখানে যাচাই-বাছাইয়ের পর ১৭ জনের নামের তালিকা শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের হাতে দেওয়া হয়। পাশাপাশি অ্যাকশনে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এমনকি দুর্নীতি, জুয়া খেলা, মাদক ব্যবসা, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজদের ছাড়ের ব্যাপারে কেউ যাতে কোনো প্রকার সুপারিশ বা তদবির না করেন এমন কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ নির্দেশের পরই তিনি বিদেশ সফরে যান।
অন্যদিকে গত বুধবার যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, খালেদের ক্যাসিনো থেকে শুরু করে সব অপকর্মের গুরু হিসেবে পরিচিত ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট। খালেদ গ্রেপ্তারের পরই তিনি আত্মগোপনে যান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে খুঁজছে। আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, দীর্ঘদিন ধরে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সতর্ক করে আসছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এরপরও কিছু নেতাকর্মী বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এ পরিস্থিতিতে দলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এসব নেতাকর্মীর চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হয়েছে। তদন্তে এসব অভিযোগের প্রমাণ মেলায় অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হয় সরকারের শীর্ষ মহল। সেখান থেকে নির্দেশ পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও হার্ড লাইনে অবস্থান নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের উদ্ধৃতি দিয়ে এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, মহানগরীর থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের বহু নেতা ও দলীয় অনেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর অবৈধ ক্যাসিনোর ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভূমিদস্যুতার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। কেউ কেউ আবার এসব অনৈতিক কাজের পৃষ্ঠপোষকতা করে লাভবান হয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সরকারের শীর্ষ মহল থেকে কঠোর নির্দেশনা পেয়ে সব ধরনের অপরাধ দমনে হার্ড লাইনে অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসাসহ নানা জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়া সরকারদলীয় ক্যাডার নেতাদের পাশাপাশি এদের প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছেন। সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা এমন প্রভাবশালী ২০-২৫ জন নেতা এখন গ্রেপ্তার আতঙ্কে রয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, ক্যাসিনো সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সব কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।
ডিএমপি কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম ২২ সেপ্টেম্বর শনিবার বলেন, রাজধানীতে অবৈধ জুয়ার আড্ডা বা কোনো ধরনের ক্যাসিনো পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না। এসবের নেপথ্যে যত প্রভাবশালীই জড়িত থাকুক না কেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর হবে। র্যাবের পাশাপাশি পুলিশও অভিযান শুরু করেছে। বগুড়া, চট্টগ্রাম, টঙ্গীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ক্যাসিনোতে যারা জুয়া খেলতে আসেন তারাই মাদক সেবন করছেন। ক্যাসিনো যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেখানে মাদক সেবনও বন্ধ হবে। ক্যাসিনো বন্ধ করেও যদি কেউ মাদক ব্যবসা চালানোর চেষ্টা করেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১৯ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো চালানোর সঙ্গে প্রশাসনের কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরে ক্যাসিনো চলার বিষয়টি পুলিশের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানতেন বলে অভিযোগ আছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গোয়েন্দারাই আমাদের তথ্য দিয়েছে। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে অপারেশন শুরু হয়েছে। প্রশাসনের কেউ যদি এখানে জড়িত থাকেন, বা কারো বিরুদ্ধে যদি সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তারা বিচারের মুখোমুখি হবেন।





