অপরাধ

নিয়ন্ত্রণহীন রোহিঙ্গারা

সন্ধ্যা হলেই পাল্টে যায় ক্যাম্পগুলোর দৃশ্যপট

  • আজাদ হোসেন সুমন
  • প্রকাশিত ৩১ অগাস্ট, ২০১৯

দিন যত যাচ্ছে রোহিঙ্গারা ততই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকার এদের ব্যাপারে কঠোর হবে-হচ্ছি করছে আর রোহিঙ্গারা চেপে বসছে সরকারের ঘাড়ে। সন্ধ্যা হলেই পাল্টে যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর দৃশ্যপট। সেখানে রোহিঙ্গারা নিজেদের রাজত্ব কায়েম করে। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ভয়ে শিবিরে ঢোকে না। তাদের কাছে আছে আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় অস্ত্রের ভান্ডার। ছদ্মবেশে জঙ্গিদের যাতায়াত আছে বলেও মনে করেন। রোহিঙ্গা সমাবেশের কথা সরকার জানত না। এতে গোয়েন্দা ব্যর্থতার আরেকটি চিত্র ফুটে উঠেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রোহিঙ্গাদের হাতে ৫ লাখ অবৈধ মোবাইল ফোন। কীভাবে তারা মোবাইল ফোন পেল এবং এতে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

সমাবেশের কথা জানত না সরকার

রোহিঙ্গারা আশ্রিত। মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার তাদের আশ্রয় দিয়েছে। এ কথা তারা বেমালুম ভুলে গেছে। তারা এখন সমাবেশ ডেকে নানা দাবি করছে, ঘোষণা দিচ্ছে তারা ফিরে যাবে না। সমাবেশে রোহিঙ্গা নেতারা এ জাতীয় বক্তব্য দিলেও বাংলাদেশের মানুষের উদারতার কথা একবারও উল্লেখ করেনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বদান্যতার কথাও তারা বলেনি। তারা নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়েই আছে। এই রোহিঙ্গাদের ওপর কড়া নজরদারির জন্য সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। যারা রোহিঙ্গা বিষয়ে আগাম তথ্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানোর কথা। কিন্তু রোহিঙ্গাদের এত হাঁকডাক ও এত বড় সমাবেশ হলেও গোয়েন্দারা ছিলেন নিষ্ক্রিয়। তারা সরকারকে আগাম কোনো তথ্য জানাননি। জানতে পারেননি পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসকও। ২৬ আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে অবলীলায় বলেছেন, রোহিঙ্গা সমাবেশ সম্পর্কে আমাদের আগে থেকে জানানো হয়নি। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার সব পক্ষের সঙ্গে পরামর্শক্রমে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

সন্ধ্যার পর বদলে যায় দৃশ্যপট

ক্যাম্পগুলো দিনের আলোতে থাকে এক রকম। কিন্তু সন্ধ্যার পর বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। রাতের আঁধার নামার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র পদচারণা শুরু  হয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। অন্যদিকে পর্যাপ্ত রাস্তাও নেই। ক্যাম্পের  ভেতরে বড় কয়েকটি রাস্তা তৈরি করা হয়েছে যেগুলো ‘আর্মি রোড’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এসব রাস্তার মাধ্যমে সব জায়গায় পৌঁছানো যায় না। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে  পৌঁছাতে পাহাড়ি উঁচু-নিচু রাস্তায় অনেকক্ষণ হাঁটতে হয়। ফলে যেকোনো অপরাধ করে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব। রাতের বেলায় এসব জায়গায় যেতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপদ বোধ করেন না। ফলে সেখানে রোহিঙ্গাদের রাজত্ব কায়েম হয়। এই সুযোগ জঙ্গিরা কাজে লাগাতে পারে। এ ব্যাপারে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান বলেন, নারী পাচার, নারী ধর্ষণ, খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক পাচার, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র মজুত করাসহ হেন কোনো অপরাধ নেই যেখানে রোহিঙ্গারা জড়াচ্ছে না। সুযোগ পেলে তারা জঙ্গিবাদেও জড়াবে। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো হয়তো তাদের সদস্য সংগ্রহের জন্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে টার্গেট করতে পারে। এখনই সময় তাদের ওপর আরো কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। নইলে অদূর ভবিষ্যতে এর চড়া মাশুল দিতে হবে।

সশস্ত্র  গোষ্ঠীর তৎপরতা

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ইতোমধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একাধিক গ্রুপ তৈরি হয়েছে। নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য গ্রুপগুলো অস্ত্র সংগ্রহ করছে। এই সশস্ত্র  গোষ্ঠীগুলোই ক্যাম্পের ভেতরে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ক্যাম্পের  ভেতরে একটা কথা প্রচলিত আছে, ক্যাম্প দিনের বেলায় বাংলাদেশের আর রাতের বেলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর। এটা এখন ওপেন সিক্রেট।’

কর্মকর্তারা বলছেন, এই সশস্ত্র গোষ্ঠী চায় না যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাক। তারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রেখে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে চায়। এর মাধ্যমে সেই সশস্ত্র গোষ্ঠী মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করছে বলে মনে করেন সে কর্মকর্তা। সম্প্রতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়ার পর সে গোষ্ঠী অনেক রোহিঙ্গাকে ভয়ভীতি দেখিয়েছে, যাতে তারা ফিরে যেতে রাজি না নয়। স্থানীয় প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

সূত্রমতে, গত ২ বছরে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে অর্ধশত রোহিঙ্গা খুন হয়েছে। যে হারে সন্ধ্যার প্রর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তৎপর হয়ে ওঠে যেকোনো সময় রোহিঙ্গা শিবিরে বড় ধরনের সংঘর্ষ এবং হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে।

৫ লাখ অবৈধ মোবাইল

রোহিঙ্গাদের হাতে প্রায় ৫ লাখ অবৈধ মোবাইল ফোন রয়েছে। এ নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে, রোহিঙ্গাদের হাতে এসব মোবাইল গেল কী করে। কাদের সহায়তায় তারা এসব মোবাইল পেল-এসব তদন্ত শুরু হয়েছে। কিন্তু ঘটনা যা ঘটার তা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। আশ্রয়শিবিরে অবাধে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন রোহিঙ্গারা। স্থানীয়দের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে সিম নিবন্ধন করে একশ্রেণির দোকানদার তা তুলে দিচ্ছেন তাদের হাতে। আর এসব সিম ব্যবহার করে অপরাধমূলক নানা কাজের অভিযোগ উঠেছে অনেকের বিরুদ্ধে। প্রশাসন বলছে, শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এসব সিমের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা বলেছেন, শুধু মোবাইল সিম নয়, ক্যাম্পগুলোতে থ্রিজি নেটওয়ার্কে ইন্টারনেটও ব্যবহার করছে রোহিঙ্গারা। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনেও বাংলাদেশের  মোবাইল নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকে। ফলে সেখানেও অনেক বাংলাদেশি সিম ব্যবহার হচ্ছে। কিছু মোবাইল অপারেটর রোহিঙ্গা কাম্পের মাঝে মোবাইল টাওয়ার নির্মাণ করেছে। উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের টিভি  সেন্টার এলাকা। রোহিঙ্গাদের এই জটলায় প্রত্যেকের হাতেই মোবাইল ফোন। একাধিক  সেটও  দেখা গেছে কারো হাতে। অনুপ্রবেশের শুরু থেকেই রোহিঙ্গাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মানা হচ্ছে না তা। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় নিজেদের নামে মোবাইল ফোনের সিম নিবন্ধনের সুযোগও নেই তাদের। এসব নিয়মকানুন জানা না থাকলেও স্থানীয় বাজার থেকে অবাধেই সিম পাওয়ার কথা জানিয়েছেন  রোহিঙ্গারা। জিজ্ঞাসাবাদে রোহিঙ্গারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জানিয়েছেন, আমরা যখন প্রথম মিয়ানমার থেকে নদী পার হয়ে এপারে আসি, তখনই স্থানীয় বাজার থেকে সিম কিনেছি। আমারটা শাহপরীর দ্বীপের এক দোকান থেকে কেনা। কোনো কাগজ লাগেনি। এসব নাম্বার ক্যাম্পের কর্মকর্তাদের কাছেও আছে। উনারা দরকার হলে ফোন করেন। অন্য এক বাসিন্দা বলেন, এখানে মোবাইল ফোন খুব দরকারি। ধরুন এই পাহাড়ে কোনো সমস্যা হলো, আমরা তখন মোবাইল ফোনেই সব জানাই। এভাবেই এখানে আত্মীয়স্বজনদের খবর রাখি। কেউ বাধা দেয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসাবে,  রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বাংলাদেশি বিভিন্ন মোবাইল ফোন অপারেটরের সিম আছে পাঁচ লাখের বেশি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ফোন ব্যবহার করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন অনেক  রোহিঙ্গা।

প্রশাসন বলছে, রোহিঙ্গা শিবিরে অবৈধ  মোবাইল সিমের ব্যবহার বন্ধে কয়েক দফা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে, যা এখনো চলমান। এরপরও এসব পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় নেওয়া হচ্ছে আলাদা উদ্যোগ। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন,  রোহিঙ্গাদের রেজিস্ট্রেশন কার্ড দিয়ে নিবন্ধনের মাধ্যমে সিম দিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হবে।

এ ব্যাপারে সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, এটা উদ্বেগের বিষয়। জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। রোহিঙ্গারা কেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে। আবার সেটাও অবৈধভাবে। রোহিঙ্গারা এখন আর নিরীহ নেই। তারা বুক চিতিয়ে সদর্প অবস্থান জানান দিচ্ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে তারা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। কারণ তারা জেনে গেছে সরকার ইচ্ছে করলেই তাদের ফেরত পাঠাতে পারছে না। তাদের সঙ্গে এনজিওরা আছে, আছে অনেক মোড়লরাও। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিভিন্ন দল-উপদল আছে। একদল আছে তারা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ করছে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads