জাতীয়

নিরাপদ নন ভ্যাকসিন গ্রহীতারা

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১০ অগাস্ট, ২০২১

কঠোর বিধিনিষেধ সত্ত্বেও সারা দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুতে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হাসপাতালে ঠাঁই পাচ্ছে না করোনা রোগীরা। একটি আইসিইউ বেডের জন্য প্রতিদিন প্রায় অর্ধশত গুরুতর করোনা রোগীকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তার ওপর আগামীকাল বুধবার থেকে লকডাউন শিথিলের ঘোষণা করা হয়েছে। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেই আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লি করোনার তৃতীয় ঢেউ নিয়ে প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করেছে। রোববার সরকার তৃতীয় ঢেউ মোকাবিলার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকাও জারি করেছে। অর্থনীতি সচল রাখতে লকডাউন শিথিল করায় আগামীতে করোনার সংক্রমণ ব্যাপক হারে বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। টিকা মানেই চূড়ান্ত রক্ষাকবচ নয় উল্লেখ করে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ টিকাই শরীরে ‘ইফেকটিভ ইমিউনিটি’ তৈরি করে। যাতে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে নিজের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ পেলেও রোগটা মারাত্মক আকার ধারণ করে না। তাই এটা পরিষ্কার যে টিকা গ্রহীতারাও ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন। তাদের শরীরে উপসর্গ দেখা না-ও দিতে পারে এবং নিজেদের অজান্তে ভাইরাস ছড়াতেও পারেন।

দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চলমান কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করে রোববার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, গত ৩ আগস্ট অনুষ্ঠিত কোভিড-১৯ সংক্রমণের পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত, দেশের আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী ১১ আগস্ট থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সড়ক, রেল ও নৌ-পথে আসন সংখ্যার সমপরিমাণ যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন যানবাহন চলাচল করতে পারবে। সব সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে খোলা থাকবে। চলবে শপিংমল, মার্কেট, দোকানপাটসহ সব কিছুই। 

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, টিকা-গ্রহীতারাও নিরাপদ নন। দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার দুই সপ্তাহ পর ভ্যাকসিনের কাজ শুরু হয়। তাই এখন স্বাস্থ্যবিধি মানা ও মাস্ক পরতেই হবে। মাস্কপরা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

তিনি বলেন, ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক দেশে অনেকেই টিকা নেননি, কিন্তু তারা মাস্ক পরছেন। দেশের মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা দেখা যাচ্ছে। গত ৩০ দিনে সংক্রমণের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে উল্লেখ করার মতো বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। শনাক্তের হার ও রোগী শনাক্তের সংখ্যা খুবই সামান্য হারে কমতে দেখা যাচ্ছে। তবে সংক্রমণ কমছে, সেটা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাবে না, বরং দেশে করোনার সংক্রমণ এখনো বিপৎসীমার অনেক উপরে আছে। মৃত্যুর হার এখনো কমেনি। সংক্রমণ কমতে শুরু করলে তার এক সপ্তাহ পর মৃত্যু কমতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেছেন, লকডাউন দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। লকডাউন দেওয়ায় সংক্রমণ কিছুটা কমবে। তবে লকডাউন পুরোপুরি কার্যকর হলে সংক্রমণ আরো কমত। এখন জরুরি স্বাস্থ্যবিধি মানা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্কপরা এবং সবাইকে টিকার আওতায় আনা।

করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ বলেছেন, চলমান লকডাউন যেমনই হোক, সংক্রমণ কিছুটা কমেছে। তবে ঠিকমতো লকডাউন বাস্তবায়িত হলে করোনা সংক্রমণের হার ২০ শতাংশের নিচে নেমে আসত। এখন শনাক্তের হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে উঠানামা করছে। এখন ব্যাপকভিত্তিক টিকা দিতে হবে। একই সঙ্গে সবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্কপরা নিশ্চিত করতে হবে। শনাক্তের হার ২ থেকে ৩ শতাংশে নেমে না আসা পর্যন্ত মুখে মাস্ক পরতেই হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেছেন, দিনের পর দিন লকডাউন দিয়ে রাখা যায় না। দেশের অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। যেহেতু লকডাউন ১১ আগস্ট শেষ হচ্ছে। তাই সংক্রমণ রোধ করতে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। আর ব্যাপক হারে গণটিকা দিতে হবে। তাই লকডাউন শিথিল হলেও সবাইকে মাস্কপরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, গত ২৪ জুলাই এর পর থেকে ৯ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রতিদিনই করোনায় মারা গেছেন দুইশর বেশি মানুষ। এই ১৬ দিনে মোট মারা গেছেন ৩ হাজার ৮৫১ জন। এর মধ্যে গত ২৫ জুলাই মারা যান ২২৮ জন, ২৬ জুলাই ২৪৭ জন, ২৭ জুলাই ২৫৮ জন, ২৮ জুলাই ২৩৭ জন, ২৯ জুলাই ২৩৯ জন, ৩০ জুলাই ২১২ জন, ৩১ জুলাই ২১৮ জন, ১ আগস্ট ২৩১ জন, ২ আগস্ট ২৪৬ জন, ৩ আগস্ট ২৩৫ জন, ৪ আগস্ট ২৪১ জন, ৫ আগস্ট ২৬৪ জন, ৬ আগস্ট ২৪৮ জন, ৭ আগস্ট ২৬১ জন এবং ৮ আগস্ট ২৪১ জন ও সর্বশেষ গতকাল ৯ আগস্ট সকাল ৮টা পর্যন্ত মারা গেছেন ২৪৫।

গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে ২৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এনিয়ে করোনায় দেশে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৮৯৭ জনে। এ সময় নতুন করে শনাক্ত হয়েছেন ১১ হাজার ৪৬৩ জন। এ নিয়ে দেশে মোট শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫৮ জনে। ২৪ ঘণ্টায় করোনা থেকে সুস্থ হয়েছেন ১৪ হাজার ৪১২ জন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ১২ লাখ ১৯ হাজার ৮৫৯ জন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৪৬ হাজার ৯৫৩ জনের। পরীক্ষা করা হয়েছে ৪৭ হাজার ২০৭টি। নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ২৪ দশমিক ২৮ শতাংশ। দেশে এ পর্যন্ত মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৮১ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৭টি। মোট পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ১৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।

বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়াদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের আছেন ৮৩ জন। এছাড়া চট্টগ্রামে ৭১, রাজশাহীতে ১০, খুলনায় ২৫, বরিশালে ৬, সিলেটে ১৮, রংপুরে ১৯ এবং ময়মনসিংহে ১৩ জন মারা গেছেন।

এদিকে গতকাল সোমবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, এ মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে কোভ্যাক্স থেকে ৩৪ লাখ এবং চীন থেকে ২০ লাখ ডোজ করোনার টিকা আসবে। এসব টিকা আসলে আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে আরো সহজ হবে। ফাইজারের টিকা আমরা নভেম্বরে পাবো। টিকা পাওয়া সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ১২ তারিখের পর গণটিকা কার্যক্রম কতদিন চলবে। তবে ১৫ তারিখের মধ্যে টিকা আসার পর এই কার্যক্রম আরো জোরদার হবে। নিবন্ধনের পর যাদের মেসেজ আসেনা তাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে। কারণ টিকা পাওয়া সাপেক্ষে মেসেজ যাবে।

মন্ত্রী আরো বলেন, টিকা নিয়ে একটা সফল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতি ইউনিয়নে ছয়শ টিকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কিছু এলাকায় তার চেয়ে বেশি নিয়েছে। পৌরসভার টিকা কার্যক্রম চলবে। এছাড়া টিকা নরমাল কার্যক্রমও চলবে। তাছাড়া, চীনের সাথে আলোচনা করে আরো ৬ কোটি ডোজ টিকা কেনার জন্য চুক্তি পর্যায়ে আছি। চীনের টিকা অক্টোবরে ২ কোটি এবং নভেম্বরে ২ কোটি পাবো। ফাইজারের টিকা ৬ লাখ পাবো। এর বাইরে ভারতের টিকা পাবো। তবে এখন ভারতের জট খোলেনি।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মানুষের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে সরকার লকডাউন শিথিল করছে। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় আবারো কঠোর লকডাউন দেওয়া হতে পারে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads