গত ২৭ জুন ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলে পেশাগত কাজে বাড্ডা থেকে আগারগাঁও যাচ্ছি। চালককে স্মার্ট শিক্ষিত মনে হলো। কিছুক্ষণ পর তিনি বেশ উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই কাল (২৮ জুন, সোমবার) থেকে কি মোটরসাইকেল চালনাও বন্ধ হয়ে যাবে? বললাম না, বৃহস্পতিবার থেকে সব বন্ধ। জানালেন, ‘এবারতো তাহলে না খেয়েই মারা যেতে হবে।’ জিজ্ঞেস করলাম কেন, আপনাকেতো বেশ স্বাবলম্বী মনে হচ্ছে। বললেন, ‘যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি, পেটে খাবার না থাকলেও স্বাবলম্বী ভাব দেখাতে হয় ভাই।’
ধীরে ধীরে তিনি তার অবস্থা সম্পর্কে বলতে লাগলেন, ‘আগে লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি এবং একটা কোচিং সেন্টারে পড়ানোর মাধ্যমে মোটামুটি ভালোই চলছিল। প্রতিমাসে পরিবারকেও কিছু টাকা পাঠাতাম। কিন্তু গতবছর মার্চ থেকে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেছে। প্রথমে গ্রামে গিয়ে কিছুদিন ছিলাম। নিজের কিছু সঞ্চয় ছিল তাও শেষ হয়ে যায়। গ্রামে কিছু করতে না পেরে জীবিকার সন্ধানে কয়েক মাস পর আবারো ঢাকায় ফিরে আসি। তিনি জানান, বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে টাকা ধার করে পুরনো এই মোটরসাইকেলটা কিনে রাইড শেয়ারিং শুরু করি। কিন্তু রাইড শেয়ারিংয়ে আগের মতো আয়-রোজগার নেই। ঢাকা শহরে থাকা-খাওয়া এখন ব্যয়বহুল। তাছাড়া, নিজে কম খেয়ে-পড়ে হলেও বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাতেই হয়। নইলে পরিবারের লোকজনকেও না খেয়ে থাকতে হয়। এছাড়া, ধারদেনা শোধের পাশাপাশি মোটরসাইকেলটা পুরোনো হওয়ায় যা-ই আয় করি তার একটা অংশ চলে যায় সারাতে। এখন হাতে কোনো টাকা-পয়সা নেই। দুমাসের মেস ভাড়া বাকি পড়েছে। এই মুহূর্তে আবারো লকডাউনের ঘোষণা। এবার বুঝি সত্যিই না খেয়ে মরতে হবে।’
এবারের তৃতীয় দফার কঠোর লকডাউনে এমন অসংখ্য দিন আনে দিন খায় মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের বিপুল জনগোষ্ঠী আবারো কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দিনমজুর, পরিবহন সেক্টর, মার্কেট-শপিংমল ও ফুটপাতের ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন সেক্টরের মানুষ লকডাউনের কবলে পড়ে কর্মহীন হয়ে আবারো মানবেতর জীবনের মুখোমুখি।
চলতি বছরের এপ্রিলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) প্রকাশিত এক জরিপ বলছে, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। ‘পভার্টি ডায়নামিকস অ্যান্ড হাউসহোল্ড রিয়েলিটিস’ শীর্ষক জরিপে দেখা গেছে, ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এই নতুন দরিদ্রশ্রেণির সংখ্যা জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত যা ছিল ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ। জরিপে যারা সাধারণত দারিদ্র্যসীমার ওপরেই বসবাস করেন, কিন্তু যে কোনো অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন, তাদের নতুন দরিদ্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। এ বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ৪৪ শতাংশ। এ হিসাব থেকে জাতীয় পরিসরে নতুন দরিদ্রের এ হিসাব (১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ) প্রাক্কলন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশামিক ৩০ শতাংশ। কিন্তু এবছর জানুয়ারিতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) প্রকাশিত জরিপ বলছে, করোনাভাইরাস মহামারির অর্থনৈতিক প্রতিঘাতে দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে। সানেমের ২০২০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের অতি দারিদ্র্যের হার ২০১৮ সালের ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে বেড়ে হয়েছে ২৮ দশমিক ৫০ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন এই দরিদ্রশ্রেণি সাধারণত দারিদ্র্যসীমার ওপরেই বসবাস করে, কিন্তু যে কোনো অভিঘাতে তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। যাদের অনেকে আবার অর্থনৈতিক সংকট কেটে গেলে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়। কিন্তু করোনা মহামারির মাঝে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি বড় অংশের জন্য থমকে আছে। তাদের মতে, জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য একটি অংশের জীবনমানে হঠাৎ অবনমন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা যায় না। এ অবস্থায় নতুন দরিদ্রদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া জরুরি হয়ে পড়লেও তার কোনো লক্ষণ নেই।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, শহরের নিম্নআয়ের মানুষের বহুবিধ সমস্যার মধ্যে অন্যতম এখানকার বেশিরভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিত। একারণে তারা চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে। তিনি বলেন, ‘নির্মাণ খাত, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, হোটেল-রেস্তোরাঁয় সংশ্নিষ্টরা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। আমরা দেখেছি, শহরে অপ্রাতিষ্ঠানিক পেশায় নিয়োজিতদের আয় কমেছে ১৪ শতাংশ। তাদের আবার ৮ শতাংশ এখনো বেকার। অনেকেই আবার টিকে আছেন কর্মবদল করে। এছাড়া, তাদের খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। বেড়েছে আবাসন খরচের পাশাপাশি বেড়েছে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবহন এবং গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের মতো ইউটিলিটি খরচও। অন্যদিকে, শহর এলাকার নিম্নআয়ের মানুষের আয় কমে যাওয়ায় তাদের মধ্যে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। এক বছর আগে তাদের ঋণ নেওয়ার হার ছিল বার্ষিক আয়ের ১৩ শতাংশের মতো। এটি দ্বিগুণ হয়ে এখন ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়।’
সরকার লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র, দুঃস্থ, অসচ্ছল ও কর্মহীন ব্যক্তিদের মানবিক সহায়তা দিতে দেশের ৬৪টি জেলার অনুকূলে ২৩ কোটি ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু এসব সহায়তার বেশিরভাগই প্রকৃত দরিদ্রদের হাতে পৌঁছায়না। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা মোকাবিলায় এই সহায়তা কার্যকরও না। তাই সরকারকে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম আরো জোরদারের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাহাবুবুল মোকাদ্দেম আকাশ বলেন, ‘এই দারিদ্র্যের হার যাতে দীর্ঘমেয়াদি না হয়, সেদিকে সরকারের খেয়াল রাখা দরকার। চিকিৎসা খাতে সাবসিডি বাড়ানো দরকার। যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।’





