কোভিড পজিটিভের ৯০ ভাগ রোগীই না বুঝে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে মৃদু ও মাঝারি উপসর্গেও অনেকে গ্রহণ করছেন উচ্চমাত্রার এই ওষুধ, যেগুলোর বেশিরভাগেরই নাম নেই জাতীয় নির্দেশিকায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রবণতা কোভিড চিকিৎসায় জটিলতা বাড়ানোর পাশাপাশি মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কোভিডের প্রথম ঢেউয়ে মানুষ ভিটামিন সি, ডি, জিঙ্ক এবং কম মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েছেন। কিন্তু দ্বিতীয় ঢেউয়ে অ্যান্টিবায়োটিক কেনার প্রবণতা বেড়েছে চরমভাবে। চড়া মূল্যে বিক্রি হওয়া এসব ওষুধ জীবন বাঁচানোর তাগিদে দেদার কিনছেন সাধারণ মানুষ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই ৯৩ ভাগ মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে আসছেন, আর বহির্বিভাগে এ হার ৭২ ভাগ। গড়ে ৯০ শতাংশ মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক খেলেও তা সর্বোচ্চ দশ শতাংশ মানুষের প্রয়োজন। এটি সামগ্রিক কোভিড চিকিৎসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফজলে রাব্বী চৌধুরী বলেন, আমাদের ওই অ্যান্টিবায়োটিকগুলোকে চালিয়ে যেতে হয়, কারণ তারা আগেই দুই থেকে তিন দিন খেয়েছেন। দিনের শেষে ৯৬-৯৭ ভাগ রোগী এটি পাচ্ছেন।
হাসপাতালেও বেড়েছে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার। চিকিৎসকদের একটি অংশ দায়িত্বশীল আচরণ করছেন না বলেও অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. ফজলে রাব্বী চৌধুরী আরো বলেন, আমাদের অনেক চিকিৎসক সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিচ্ছেন। অ্যাজিথ্রোমাইসিন দিয়েছেন, কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ অ্যান্টি ভাইরাল ফেভিপিরারের মতো দামি দামি ওষুধ লিখে দিয়েছেন। যদি কোভিড পজিটিভ হয় এগুলো খেয়ে ফেলা যাবে।
লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. শাহীনুল আলম বলেন, কোভিড একটি ভাইরাস রোগ, আর অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে। অতএব সকল কোভিড রোগীর শুরুতেই অ্যাজিথ্রোমাইসিন পাবেন এটা নয়, এটা আমাদের বলা যায় সবশেষ রিসোর্স। এ ক্ষেত্রে আমাদের অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহারের দিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
সমস্যা সমাধানে জাতীয় কোভিড গাইডলাইন হালনাগাদ করে দেশের সকল চিকিৎসককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন।
এদিকে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে যেভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ প্রতিরোধের ক্ষমতা বেড়ে যাচ্ছে, তাতে বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
অক্সফোর্ড বলছে, বিশ্বে স্বাস্থ্য বিষয়ে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো অ্যান্টিবায়োটিক ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়া। তাদের হিসাব অনুযায়ী, অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করার কারণে পৃথিবীতে ইতোমধ্যে মৃত্যু হচ্ছে ১৫ লাখ মানুষের। এই গবেষণায় অর্থায়নের জন্য দশ কোটি পাউন্ড অর্থ দান করেছে ইনিওস কেমিক্যাল কোম্পানি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চান্সেলার লুইস রিচার্ডসন বলেছেন, কোভিড মহামারী বুঝিয়ে দিয়েছে একটা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে জেনেও তাকে উপেক্ষা করলে তার জন্য কী ধরনের চড়া মূল্য দিতে হয়।
অ্যান্টিবায়োটিকের অতিব্যবহার এবং অপব্যবহার”এর ফলে রোগজীবাণুর মধ্যে এই ওষুধ প্রতিরোধের শক্তি যেভাবে বেড়ে গেছে তা মোকাবিলা করতে ইনিওস অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট নামের এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ৫০ জন গবেষক।
বিশ্ববিদ্যালয় হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এখনই এই সমস্যা মোকাবিলার উদ্যোগ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি বছর স্বাভাবিকের ওপর একশ কোটি বাড়তি মৃত্যু ঘটবে।





