নারীর জীবনমান এবং সমাজ, গোষ্ঠী ও পরিবারে নারীর ক্ষমতায়নের সূচকে ১৬৭টি দেশের মধ্যে ১৪২তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। নতুন প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। জরিপে দেখা যায়, সারা বিশ্বেই নারীর অধিকার পুরোপুরি নিম্নমুখী ও হতাশাজনক পর্যায়ে নেই।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির উইমেন, পিস ও নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট এবং অসলোর পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে ‘দ্য উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি ইনডেক্স’ শিরোনামে গবেষণাকর্মটি পরিচালিত হয় যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ২০১৭ সালের ১২৭তম থেকে ১৫ ধাপ পিছিয়ে এ বছর ১৪২তম হয়েছে।
২০১৭ সালে ১৫০টিরও বেশি দেশের ওপর গবেষণা চালিয়ে এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো ইউমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ ইনডেক্স প্রকাশ করে। এই তালিকায় কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ প্রভৃতি বিষয়গুলো সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, জাতিসংঘ, বিশ্ব ব্যাংক এবং আরো কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া তথ্য-উপাত্ত গবেষণায় ব্যবহার করা হয় যাতে প্রতিটি দেশে নারীর জীবনমান ও ক্ষমতায়ন সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়।
তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে নরওয়ে। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য সফলতার মাধ্যমে তালিকায় যথাযথ স্কোর অর্জন করেছে তারা। তালিকায় সুইজারল্যান্ড আছে দ্বিতীয় স্থানে। এর পরে রয়েছে যথাক্রমে ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ড।
ইনডেক্স রেটিংয়ে সর্বনিম্ন স্কোর পেয়ে তালিকায় সবার নিচে রয়েছে ইয়েমেন। দেশটিতে নারীর জীবনমানে উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইয়েমেনের ওপরে যথাক্রমে রয়েছে আফগানিস্তান, সিরিয়া, পাকিস্তান ও দক্ষিণ সুদান।
গবেষণায় বাংলাদেশ সম্পর্কিত তথ্যে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ বাংলাদেশি পুরুষ বিশ্বাস করেন, নারীদের দ্বারা বেতনভুক্ত চাকরি করাটা গ্রহণযোগ্য না। গবেষণায় আরো দেখা যায়, ৬৯.৯% নারী তাদের এলাকায় নিরাপদ বোধ করেন যেটি পূর্বের তালিকায় ছিল ৮০%। নারীর কর্মসংস্থান ও আইনি বৈষম্যেও হতাশাজনক চিত্র দেখিয়েছে বাংলাদেশ।
এবারের তালিকায় দেখা যায়, গত দুই দশকে বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থান প্রায় ৩ ভাগেরও বেশি উন্নতি হয়ে ৩৮ শতাংশে পৌঁছেছে। উৎপাদন খাত আরো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তবে কৃষিতে নারীর কর্মসংস্থান কমেছে।
গবেষণায় বলা হয়, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের ফলে ১ হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়, এতে সংকুচিত হয়ে আসা গার্মেন্ট খাতে নারীদের উৎপাদনশীল কাজে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বর্তমানে ৮৫ শতাংশেরও বেশি নারী এখন অনুৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত।
বাংলাদেশের বৈষম্যমূলক আইনও নারী ক্ষমতায়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ৩৪ শতাংশ নারী সম্পত্তির অধিকার ভোগে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলায়, ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে অথবা চাকরি পেতে ও শুধু পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত পেশায় ঢুকতে প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়।
আইন-কানুনের ক্ষেত্রে ইনডেক্সটি একটি সামগ্রিক স্কোর দিয়েছে, যেখানে দেখা যায় বাংলাদেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য নারীর ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও জর্জটাউন ইনস্টিটিউটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জেনি ক্লুগম্যান বলেন, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় উন্নতি হয়েছে। সবটাই নিম্নমুখী ও হতাশাজনক নয়। ক্লুগম্যান বলেন, গবেষণাটির উদ্দেশ্য ছিল তথ্য দেওয়া ও কাজকে অনুপ্রাণিত করা। জাতিসংঘের ১৫ সালের উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণ করার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো গুরুত্ব বহন করে।
জাতিসংঘের ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে লিঙ্গ সমতা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিবৃত্তিসহ আরো বেশ কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জন করা হবে। গবেষণায় দেখা যায়, নারীর জীবনমানের সঙ্গে নিরাপত্তাও যুক্ত যা প্রায় ৫০টি দেশে অবনতি হয়েছে।
গবেষণায় আরো বলা হয়, আইনি বৈষম্যের কারণে বিশ্বে ২৭০ কোটি নারী বিভিন্ন পেশায় ঢুকতে পারে না যেগুলো শুধুই পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত।





