টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সুনামগঞ্জে ফের বাড়ছে সুরমার নদীর পানি। তবে এখনো তা বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে সিলেটে বন্যায় ভেঙেছে ৪১ হাজার ঘরবাড়ি। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে এসব তথ্য জানা গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ১৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সুরমার পানি ১৬ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এতে জেলায় বন্যা পরিস্থিতির ফের অবনতি ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পানি বাড়ায় জেলার নিচু এলাকা নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। পৌর শহরের তেঘরিয়া, আরপিন নগর, বড়পাড়া, পূর্ব নতুনপাড়া, হাজিপাড়া, নবীনগর, ধূপাখালি এবং ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকছে। তেঘরিয়া এলাকার বাসিন্দা ফরহাদ আহমেদ বলেন, ঘরবাড়ি থেকে মাত্র চার দিন হইছে পানি নামছিল। কিন্তু আজকে সকাল থকি আবারো ঘরে বারান্দায় পানি প্রবেশ করা শুরু করেছে। আজকে বৃষ্টি এ রকম হতে থাকলে ঘরেও পানি ডুকতে বেশি সময় লাগবে না, বিপদের মধ্যে মহাবিপদ।
উত্তর আরপিন নগর এলাকার বাসিন্দা লুকনা বিবি বলেন, আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়িত আইলাম দুই দিন অইল। এখন দেখি আবার পানি আইচ্ছে। তিনটা মেয়ে, স্বামী ও শাশুড়ি নিয়া কষ্টের মধ্যে আছি। কাজকাম নাই। মানুষের ঘরে কাজ করিয়া দিন আনি দিন খাই। কিন্তু পানি আইলে আমরা বন্দি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বলেন, সুনামগঞ্জ ও মেঘালয়ে বৃষ্টি হওয়ায় সুরমাসহ অন্যান্য নদীর পানি বাড়ছে। তবে এখনো সুরমার পানি বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এক দিন আগে তা ১৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
এদিকে সিলেট ব্যুরো জানায়, দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোল্লাগাওয়ের জহুর আলীর মাটির ঘর বন্যায় একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে মাটির বেড়া উড়ে গেছে টিনের চালাও। পানি নামার পর ঘর মেরামতের কাজ করছিলেন জহুর। তিনি বলেন, একজন কিছু টিন দিয়ে সহায়তা করেছে। বাকি টাকা ধারকর্জ করে জোগার করে ঘর মেরামত করছি। ঘর ঠিক না করলে তো খোলা আকাশের নিচে থাকতে হবে। বন্যায় ঘর হারিয়েছেন জহুরের মতো অনেকেই।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে সিলেটের ১৩ উপজেলায় ৪০ হাজার ৯১টি কাঁচা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে কোনোটি আংশিক, কোনোটি সম্পূর্ণ। সিটি করপোরেশনের হিসাবে নগরে এই সংখ্যা প্রায় এক হাজার। সব মিলিয়ে সরকারি তথ্যেই জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির সংখ্যা ৪১ হাজারের বেশি।
জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, জেলার ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির তালিকা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি নির্মাণ ও মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করা হয়েছে। বন্যায় যারা ঘর হারিয়েছেন, তাদের ঘর সরকারি উদ্যোগে মেরামত করে দেওয়া হবে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিধায়ক রায় চৌধুরী বলেন, নগরে হাজার খানেক ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির তালিকা আমরা প্রস্তুত করছি। এরপর তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বন্যায় ঘর হারা সিলেট সদর উপজেলার শিবেরবাজার এলাকার লায়েক মিয়া বলেন, সরকার থেকে কখন ঘর বানিয়ে দেওয়া হবে আর আমরা কখন ঘরে উঠবো তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। তার আগে আমরা কোথায় থাকব? আমাদের তো থাকার কোনো জায়গা নেই এখন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সিলেট সিটি করপোরেশনসহ ১৩ উপজেলা ও ৫ পৌরসভা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ লোক পানিবন্দি ছিলেন। সবশেষ পাওয়া তথ্যে, জেলার ৬১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন। টানা কয়েক দিন কমার পর বুধবার থেকে আবার বাড়তে শুরু করেছে সুরমা-কুশিয়ারাসহ সিলেটের প্রধান নদ-নদীর পানি। বুধবার রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি হচ্ছে সিলেটের উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়েও। এতে জেলার বন্যা পরিস্থিতি আবারো অবনতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।





