ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে বিএনপি

সংগৃহীত ছবি

রাজনীতি

ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জে বিএনপি

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ২৩ নভেম্বর, ২০২১

চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না হতে পারায় বর্তমানে কঠিন সংকটের মুখোমুখি বিএনপি। এই সংকট উত্তরণে দলের শীর্ষ নেতারা নানা পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নানামুখী চাপ ও সরকারের বাধা সত্ত্বেও দেশের রাজনীতিতে বিএনপি এখনো আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই বিবেচিত। তাই চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে বিএনপির সামনে এখন তিনটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। এগুলো হচ্ছে; কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করা, আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবি আদায় এবং তৃণমূলসহ দল পুনর্গঠন করে দাবি আদায়ে জোরালো আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতির মাঠ ধরে রাখা। কারণ ২০২৩ সালের নির্বাচনে ফল ভালো না করতে পারলে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন তারা। 

এদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি। গতকাল সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বেগম জিয়ার মুক্তি ও তাকে বিদেশে চিকিৎসার দাবিতেও সমাবেশ করছে তারা। এর আগে শনিবার (২০ নভেম্বর) নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ের সামনে গণঅনশন থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই ইস্যুতে গত রোববার (২১ নভেম্বর) দলটির সংসদ সদস্যরা এক মানববন্ধনে জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগের হুমকিও দেন। আর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গতকালের সমাবেশে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে চিকিৎসার দাবিতে আগামীকাল বুধবার সারা দেশে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।

সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বক্তব্য দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। এ সরকার সবদিক থেকে ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে। আমাদের সামনে এখন আর কোনো পথ নেই। একটিমাত্র পথ আছে সেটি হলো আন্দোলন, আন্দোলন এবং আন্দোলন। আগামী ২৪ তারিখে আমরা সারা দেশে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে স্মারকলিপি দেবো। এতে যদি মুক্তি না হয় তাহলে আরো কঠোর থেকে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

এ সময় দলীয় নেতাকর্মীদের ফখরুল বলেন, আপনারা হঠকারিতা করবেন না। অতীতে অনেক হঠকারিতার জন্য আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের দেশনেত্রীকে মুক্ত করবো। তাই আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের একটা সরকার প্রতিষ্ঠা করি।

অন্যদিকে বিএনপির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কর্মকৌশল নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে নানা আলোচনা চলছে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্যও আগামী নির্বাচনটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ ওই নির্বাচনের ফলাফলের ওপরই তাঁর নেতৃত্বের প্রজ্ঞা ও কার্যকারিতা অনেকখানি স্পষ্ট হবে বলে রাজনীতিতে আলোচনা আছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় তারেক রহমানের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফল ঘরে তুলতে পারেনি বিএনপি। সরকারের প্রভাব ও হস্তক্ষেপের কথা উঠলেও নির্বাচনে বিএনপির কর্মকৌশলেও ঘাটতি ছিল বলে পরবর্তীকালে দলের মধ্যে নানাভাবে আলোচনা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রিয়তা থাকার পরও ভুল রাজনীতির কারণে এখনো ‘চোরাগলিতে’ আটকে আছে বিএনপি। দলের ভেতর বিভিন্ন ধরনের সংকট এবং করোনার ধাক্কায় আরও টালমাটাল দলটি। এ থেকে উত্তরণে দলটির সামনে রয়েছে নানামুখী চ্যালেঞ্জ। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দলের ৭ম কাউন্সিল, পুরোনো ও নতুন জোটের রাজনৈতিক নানা হিসাবনিকাশ, দল এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অন্তর্দ্বন্দ্ব কাটিয়ে পুনর্গঠন, সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বপ্রথম নেতাকর্মীদের মধ্যে আস্থা ও মনোবল ফিরিয়ে আনতে হবে। সৎ, যোগ্য, ত্যাগী ও মেধাবী নেতাকর্মীদের খুঁজে নেতৃত্বের আসনে বসাতে হবে। দলমতনির্বিশেষে দেশের বিভিন্ন সেক্টরের জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ এবং দলে টেনে গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে নিজেদের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করে তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

তবে দলের নীতিনির্ধারকরা জানান, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা অতিক্রম করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তাই দলটির চোখ এখন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) পুনর্গঠন নিয়েও বাড়তি মনোযোগ তাদের। পাশাপাশি দল পুনর্গঠন দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজও আগে ভাগে শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্তনু মজুমদার বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি কঠিন এসব চ্যালেঞ্জ কিভাবে মোকাবিলা করবে সেটাই মুখ্য বিষয়। যদিও সমপ্রতি বিভিন্ন ইস্যু যেমন দ্রব্য ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে লাগাতার কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকে বিএনপি। এ অবস্থায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান-দুই শীর্ষ নেতার অনুপস্থিতিতে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে বেগম জিয়ার মুক্তি আন্দোলন জোরদার করা বিএনপির সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনতে দলের নেতা-কর্মীদের আন্দোলনকে আরও জোরদার করা উচিত। এজন্য দলের শীর্ষ নেতাদের অবশ্যই তৃণমূলকে নেতৃত্ব দিতে হবে। যদিও নেতৃত্বের সংকটের কারণে বিএনপি একটি বড় দল হিসেবে দাঁড়াতে পারছে না। বিএনপি নেতারা সবসময় লন্ডন থেকে মেসেজের জন্য অপেক্ষা করেন এবং বক্তব্যের ফুলঝুড়ি দিয়ে যাচ্ছেন। তারা তৃণমূলকে পুনরুজ্জীবিত করতে ও দলকে শক্তিশালী করে তাদের সংগঠনকে শক্তিশালী বা কোনো কৌশল বাস্তবায়ন করতে পারছে না। তাই নেতাদের মধ্যে থাকা ভুল বোঝাবুঝি দূর করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএনপিকে ইতিবাচক রাজনীতি করতে হবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করতে না পারলে বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কঠিন হবে’ বলেন বিশিষ্ট এই মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের মাঝে বিক্ষোভ আছে, হতাশা আছে, দুঃখ আছে, দুঃখবোধ আছে। রাজনীতিক কর্মীদের মাঝেও আছে। এখন আন্দোলন করা অতীতির যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। কাজেই সে দিকটাও বিএনপিকে মনে রাখতে হবে। এখন হঠকারিতার কোনো অবকাশ নেই। যারা আন্দোলন করবেন তারা যেন মনে রাখেন, আন্দোলন যেন সহিংস না হয়। যাতে করে সাধারণ জনগণ এই আন্দোলনে অংশ নিতে ভয় না পায়। কারণ সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ না থাকলে শুধু কর্মীদের দিয়ে আন্দোলন হয় না। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

তিনি বলেন, আমরা ৬৯-সালে আন্দোলন করেছি। তখন দেখেছি সাধারণ মানুষ কীভাবে আন্দোলনে শরিক হয়েছে। এখন সবকিছুই পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন সেই কালচার দেশে নেই। সাধারণ মানুষকে আন্দোলনমুখী করতে হবে। শুধু একটি রাজনৈতিক দল থাকলেই হয় না, সেই দলকে মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে হয় এবং সেই জাগরণ ও শক্তি দিয়েই বিএনপিকে আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করতে হবে।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, বিএনপি নেত্রীর মুক্তি ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে আন্দোলন করলে চলবে না। গণমুখী আন্দোলনের মাধ্য বিএনপিকে মাঠে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে তত্ত্বাবধয়াক ব্যবস্থা বর্তমান সরকার বাতিল করেছে। তাই এটি আদায় করতে হলে বিএনপিকে কঠোর আন্দোলন বা গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যেটা আওয়ামী লীগ পেরেছিল। এ অবস্থায় বিএনপির কর্মকৌশল কী, তার ওপরই আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন নির্ভর করছে।

বিএনপির একসময়ের প্রভাবশালী নেতা, বর্তমানে এলডিপির সভাপতি ড. অলি আহমদ মনে করেন- বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে না পারায় দলটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। তাই আগামী দিনে কার অবস্থান কী হবে, সেটি বলা মুশকিল। তবে বড় বড় দলের জন্য আগামী দিনগুলো সুখকর না-ও হতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মনে করেন, বিএনপির সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তিনটি। এক. দলের চেয়ারপার্সনকে মুক্তি করা। দুই. বর্তমান ভোটারবিহীন সরকারের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করা। তিন. দেশে একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা এবং জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

এসব দাবি আদায়ে আমরা কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করব উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এবং স্থায়ী কমিটির সদস্যদের যৌথ নেতৃত্বে বিএনপি চলছে। দলের চেয়ারপার্সন প্রায় তিন বছর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারছেন না। এত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও বিএনপি থেকে কেউ অন্য দলে যোগ দিয়েছেন-এরকম ঘটনা ঘটেনি। অনেকে হয়তো পরিস্থিতির কারণে নীরব আছেন, আবার অনেকে সক্রিয় আছেন। যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ আসে, তখন বোঝা যাবে বিএনপির কী আছে। বিএনপি সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে এখন অনেক শক্তিশালী। তাছাড়া নির্বাচন করার ক্ষেত্রে যে বাধাগুলো আছে, তা জনগণের সামনে দৃশ্যমান। বাধাগুলো আমাদের অতিক্রম করতে হবে, মোকাবিলা করতে হবে। একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পূর্বশর্তগুলো পূরণ করার জন্য আমাদের যা যা করা দরকার, তা-ই করতে হবে। 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads