কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগেই সারা দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তৃণমূলের কমিটি গঠনের চাপে আছে আওয়ামী লীগ। আগামী ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে অনুষ্ঠেয় কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মাত্র ১০ দিন আগে তৃণমূলের কমিটি নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্দেশ আছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে দলের অধিকাংশ সাংগঠনিক জেলায় সম্মেলন করার বিষয়ে দিনক্ষণ বেঁধে দেওয়া হয়নি। ফলে হাতে থাকা আড়াই মাসের মধ্যে সারা দেশে সম্মেলনের আয়োজন ও তৃণমূলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন আদৌ সম্ভব কি না, এ নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতা জানান, দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ তৃণমূলে সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্বে থাকে। কার্যনির্বাহী সংসদের মেয়াদ সাধারণত তিন বছর। বর্তমান কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের তিন বছর পূর্ণ হবে চলতি বছরের অক্টোবরে। মেয়াদ প্রায় শেষদিকে হলেও গত তিন বছরে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মাত্র একটি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন করতে পেরেছে। শেষ মুহূর্তে এসে একসঙ্গে সারা দেশে অল্প সময়ের মধ্যে সম্মেলন করতে হচ্ছে বলে চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে তৃণমূলের মেয়াদোত্তীর্ণ সব কমিটির সম্মেলন শেষ করতে ইতোমধ্যে সারা দেশে নির্দেশও পাঠানো হয়েছে।
সূত্রমতে, আওয়ামী লীগের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় অভিযান চলতে থাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার পাশাপাশি অনেকে আত্মগোপনে আছেন। দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতাকর্মীদের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্কে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক নেতা মাঠে নেই। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সারা দেশে জোরালো আকারে পরিচালনার কথা বলা হচ্ছে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলের সব এলাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্মেলনের আয়োজন নাও হতে পারে বলে মনে করেন দলের নেতাকর্মীরা। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কমিটির নির্বাচন শেষ করার নির্দেশ আছে দলের।
অন্যদিকে আগামী কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত ‘শুদ্ধি অভিযানের’ পক্ষে আওয়ামী লীগ। সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত এবং দলের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি করছেন যারা, তাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দল এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে। এর মধ্য দিয়ে বিতর্কিত, চাঁদাবাজ, অভিযুক্ত ও নানাভাবে অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীদের সরিয়ে দিয়ে দলকে ‘বিতর্কমুক্ত’ করা যাবে বলে মনে করছে ক্ষমতাসীন দল।
একই সঙ্গে দলে তরুণ, স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে সারা দেশের তৃণমূলের কমিটিতে ঠাঁই দেওয়া যাবে। অনেক এলাকায় দলের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চাপা থাকলেও তৃণমূলের কমিটি নির্বাচনের সময় দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে মাঠে গড়ানোর আশঙ্কা করেন অনেকে। অভিযান চলতে থাকলে দলের ‘আগাছা ও দৃষ্কৃতকারীরা’ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে যেতে পারবেন না বলে তাদের ধারণা। তখন কমিটিও অনেকটা ঝামেলাযুক্ত হয়ে করা যেতে পারে বলে মনে করেন তারা। ডিসেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় সম্মেলন হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালু রেখে ও এর মধ্যে তৃণমূলের কমিটি নির্বাচন করে নতুন কমিটি নিয়ে নতুন বছরে পা রাখার পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব।
নীতিনির্ধারক সূত্র জানায়, সারা দেশে দলের ৭৩টি সাংগঠনিক জেলা আছে। এর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ কমিটিরই মেয়াদ নেই। মেয়াদ পার হওয়া এসব কমিটি দিয়ে চলছে টানা সাড়ে দশ বছরের বেশি সময় ধরে সরকারে থাকা আওয়ামী লীগের অধিকাংশ তৃণমূল। অনেক জেলার কমিটির নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে আশ্বাস পেলেও এলাকাগুলোর নেতাকর্মীরা নির্ধারিত সময়ে নতুন কমিটি পাননি। আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর দলের ২১তম ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সব জেলা ও মহানগরের সম্মেলন করতে হবে। আসন্ন কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে তৃণমূলের সব কমিটির নির্বাচন বা দেশের সব এলাকায় সম্মেলন করা সম্ভব কি না, এমন প্রশ্ন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীরও।
ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, মেয়াদোত্তীর্ণ মহানগর, জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন সম্মেলনগুলো যতটা সম্ভব সম্পন্ন করতে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দলের সাত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা কয়েক দফায় বৈঠকে বসে একটি খসড়া পরিকল্পনাও সাজিয়েছেন। অক্টোবর মাসের মধ্যে ইউনিয়ন, ১৫ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা আর ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে জেলা ও মহানগরের সম্মেলন করতে চান দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা।
সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় সম্মেলনের আগের প্রস্তুতি হিসেবে তৃণমূলের নতুন কমিটি নির্বাচনের বিষয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিশেষ প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অনেক দিন ধরে। কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে দলের তৃণমূলকে যতটুকু সম্ভব গোছানোর লক্ষ্যে নানা কার্যক্রম শুরু হয় গত জুন মাসেও। তৃণমূলকে ঢেলে সাজাতে দলের প্রধান শেখ হাসিনা তখন কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব দিয়ে আটটি বিভাগীয় টিম গঠন করে দেন। তৃণমূল কমিটি গঠনের লক্ষ্যে অনেক জেলায় বর্ধিত সভাও শেষ করেন কেন্দ্রীয় নেতারা। সময় কম হওয়ায় তখন থেকেই বিশেষ নজর দেওয়া হয় বিভিন্ন জেলার মেয়াদ পার করা ও দীর্ঘদিন সম্মলেন না হওয়া কমিটিগুলোর দিকে। সেসব জেলায় জরুরি বার্তায় তাগিদও দেওয়া হয় দ্রুত সম্মেলন করার। তৃণমূলকে সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত করতে কেন্দ্রীয় আটটি টিম আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মাঠে থাকছে।





