তারুণ্যের  রমজান

প্রতীকী ছবি

ধর্ম

তারুণ্যের রমজান

  • প্রকাশিত ২৫ এপ্রিল, ২০২১

রহমতের পয়গাম ও হেদায়তের বার্তা নিয়ে আমাদের জীবনে হাজির হয়েছে মাহে রমজান। আত্মশুদ্ধি অর্জন ও সংযমের মাস। তাকওয়া অর্জনের মাস। নিঃসন্দেহে আমাদের তরুণসমাজও এর বাইরে নয়; বরং তারা রমজানের ফজিলত অর্জনে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকবে। যুব বয়সই হলো হেদায়াতলাভের উপযুক্ত সময়। পবিত্র কোরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমরা আপনার কাছে তাদের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি; তারা তো ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের রবের ওপর ঈমান এনেছিল এবং আমরা তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত-১৩) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদগণ লিখেছেন যে, কর্ম সংশোধন, চরিত্র গঠন এবং হেদায়াতলাভের উপযুক্ত সময় হচ্ছে যৌবনকাল। বৃদ্ধ বয়সে পূর্ববর্তী কর্ম ও চরিত্র এত শক্তভাবে শেকড় গেড়ে বসে যে, যতই এর বিপরীত সত্য পরস্ফুিট হোক না কেন, তা থেকে বের হয়ে আসা দুরূহ হয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতে বিশ্বাস স্থাপনকারী সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অধিকাংশ ছিলেন যুবক। (ইবন কাসীর)

যুবসমাজই হচ্ছে একটি দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। যৌবনকালই কর্মসম্পাদন, ক্যারিয়ার গঠন এবং নেক আমল অর্জনের মুখ্য সময়। এই বয়সের ইবাদত আল্লাহর নিকট খুব পছন্দীয়। এই বয়সের মূল্য, মান-মর্যাদা তা জীবনের অন্য বয়সে নেই। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ সাত ব্যক্তিকে তাঁর (আরশের) ছায়ায় স্থান দেবেন; যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।...(তন্মধ্যে) ওই যুবক (অর্থাৎ ওইসব যুবক-যুবতী) যার যৌবন অতিবাহিত হয় আল্লাহর ইবাদতে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস-৬৬০)

রমজান মাস তরুণদের ইবাদতের এই সুযোগকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় যে, আজ আমাদের তরুণ-তরুণীরা দিিবদিক শূন্য হয়ে ছুটছে মরীচিকার পেছনে। রমজানে মহামূল্যবান সময়ের বেশিরভাগই কাটিয়ে দেয় গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ডের মধ্যে চেটিং, ফোনালাপ, বান্ধুবান্ধদের মধ্যে গল্পগুজব, মুভি দেখার মাধ্যমে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটি দিক খুব বেশিমাত্রায় লক্ষণীয় তা হচ্ছে স্মার্ট ফোনের লাগামহীন ব্যবহার। সাহরি-ইফতারসহ সময়ে অসময়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখে সেলফি তোলাতে। অহেতুকভাবে এই স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে কাটিয়ে দেয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রমজানের শুরুতে মসজিদের তরুণদের ঢের উপস্থিতি লক্ষ করা গেলেও ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। একশ্রেণির তরুণরা সাধারণত রমজান মাসের রোজাই রাখে না। বিশেষত উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণদের মাঝে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়। পবিত্র কোরআন নাজিলের এই মাসে কোরআন অধ্যয়ন ও তারাবির নামাজের সাথে তাদের সম্পর্ক না থাকলেও বছরে আর বাদবাকি মাসের ন্যায় আইপিএল, বিপিএলসহ বিভিন্ন খেলা দেখার পেছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় তারা ঠিকই ব্যয় করতে পারে। অপ্রয়োজনীয় কারণেই রাত জাগে তারা। আগেবাগেই সাহরি খেয়ে জামাতের সাথে ফজরের নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়ে।

অনেক তরুণীদেরও দেখা যায় রমজানের ব্যাপারে পর্যাপ্ত অবহেলা। অধিকাংশই ইসলামি চেতনাবিমুখ। অনেকেই আবার ইসলামি পোশাক বাদ দিয়ে অনইসলামি পোশাকেই বেশি অভ্যস্ত। রমজানকে ঘিরে তাদের আকর্ষণ যতটা তার চেয়ে ঢের বেশি ঈদ শপিংকে ঘিরে। তারপর রমজানের ১৫ দিন অতিক্রান্ত হলেই তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় শপিংমলগুলোতে। ফেসবুকজুড়ে থাকে তাদের রং-বেরং এর ইফতারির আয়োজন। রোজা রাখুক বা না রাখুক ফেসবুকে ইফতার-সাহরির ছবি শেয়ার করতে ব্যস্ত তারা। তাকওয়া (তথা আল্লাহকে রব হিসেব মেনে নিয়ে জীবনের সব কাজ তার হুকুম অনুযায়ী পরিচালনার) যে মূল মিশন নিয়ে হাজির হয় রমজান। তার সবই এসব তরুণ-তরুণীদের জীবন নিষ্ফল বৃথা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কত সিয়াম পালনকারী আছে যাদের রোজা হবে শুধু উপোস থাকা। আর কতলোক রাতের ইবাদতকারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া ইবাদতের কিছুই হবে না।’ (অর্থাৎ পাপকাজ থেকে বিরত না হওয়ার কারণে তার রোজা যেন রোজা নয়, তার রাতের সালাতও যেন ইবাদত নয়)।’ (আহমাদ, হাদিস নং-৯৬৮৩ ; দারেমী, হাদিস নং-২৭৬২)

মোদ্দাকথা বর্তমান তরুণ প্রজন্ম যে ধ্বংসের অতল তলে নিমজ্জিত তা আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য এক অশনি সংকেত। পবিত্র  কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই সমস্যার সমাধানের জন্য পরিবার, সমাজ, নেতৃবৃন্দ, ইমাম-আলেমসমাজ ও রাষ্ট্রীয় কতৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। দুই একটি সহজ ও সহনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে তরুণসমাজের এই সমস্যাগুলোর প্রতিকার সম্ভব। প্রথমত : দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। কেননা যেকোন ধর্মেরই মূল বাণী হচ্ছে প্রতিটি মানুষকে নৈতিকতাবোধসম্পন্ন আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত : মসজিদ, মাদরাসাগুলোতে আলেমদের সাথে যুবকদের সাক্ষাত ও উঠাবসা জোরদার করা। যুবকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্ন-উত্তরের ব্যবস্থা রাখা। যাতে সমস্যাগুলোর সমাধানে তাদের পথ চলার গতি স্পষ্ট হয়। তরুণসমাজের জন্য রমজান মাস উপলক্ষে আকর্ষণীয় পুরস্কারে বিভিন্ন ইসলামী জ্ঞানের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। তরুণদের এই ব্যবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্য এ মসজিদমুখী করতে মসজিদকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। অন্যথায় তরুণসমাজকে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ কষ্টকর।

লেখক : মেহেদী হাসান সাকিফ

প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads