আধিপত্য বিস্তার ও জোড় ইজতেমাকে কেন্দ্র করে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা মাঠে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে এক বৃদ্ধ মুসল্লি নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন দুই শতাধিক মুসল্লি। আহতদের মধ্যে ২০ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) এবং অন্যদের টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। গতকাল শনিবার তাবলিগ জামাতের দিল্লি মারকাজের মাওলানা মোহাম্মদ সা’দ কান্ধলভি এবং দেওবন্দ মাদরাসার মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
নিহত মো. ইসমাইল মণ্ডলের (৭০) বাড়ি মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিল্কিপাড়া এলাকায় বলে জানা গেছে।
মো. ইসমাইল মণ্ডলের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত গাজীপুর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবির) পরিদর্শক একেএম কাওসার চৌধুরী বলেন, নিহত ব্যক্তির মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ধারালো কিছু বা বাঁশজাতীয় লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিহত ইসমাইল মণ্ডলের ছেলে জাহিদ হাসান বলেন, তার বাবা আলুর ব্যবসা করতেন। তিনি সা’দপন্থি ছিলেন। শনিবার সকালে তিনি তার (জাহিদ) সঙ্গে টঙ্গী আসেন। তখন জোবায়েরপন্থিরা মাঠে অবস্থান করছিলেন। এ সময় সাদপন্থিরা মাঠে ঢোকার চেষ্টা করেন। ধাক্কাধাক্কির সময় তার বাবা সামনে ছিলেন। তার মাথায় আঘাত লেগেছিল। সাদবিরোধীরা ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করেন তাকে।
সা’দপন্থিদের অন্যতম মুরুব্বি সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম জানান, নিহত মো. ইসমাইল মণ্ডল (৭০) মুন্সীগঞ্জ সদরের রামপাল এলাকার খলিল মণ্ডলের ছেলে। দুপুর পর্যন্ত লাশ ইজতেমা ময়দানেই ছিল। তিনি তাদেরই অনুসারী এক মুসল্লি ছিলেন।
টঙ্গী (পূর্ব) থানার ওসি মো. কামাল হোসেন জানান, সা’দপন্থিরা তাদের পূর্বঘোষিত ৩০ নভেম্বর থেকে পাঁচ দিনব্যাপী জোড় ইজতেমায় অংশ নিতে দুদিন ধরে টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের আশপাশে জমায়েত হতে শুরু করেন। অন্যদিকে ইজতেমা ময়দানের ভেতরে বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্রসহ জোবায়েরপন্থি মুসল্লিরা অবস্থান করছিলেন। গতকাল শনিবার ভোরে জোড় ইজতেমায় যোগ দিতে আসা মুসল্লিরা ময়দানে ঢুকতে চাইলে অপরপক্ষের লোকজন তাদের বাধা দেয়। এ নিয়ে ওই এলাকায় মুসল্লিদের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। একপর্যায়ে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ময়দানের বাইরে থাকা মুসল্লিরা ফটকের তালা ভেঙে এবং সীমানাপ্রাচীর টপকে ভেতরে ঢুকে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং উভয়পক্ষের মুসল্লিদের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। তাদের ইট-পাটকেল ও লাঠির আঘাতে উভয়পক্ষের শতাধিক মুসল্লি আহত হন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। আহতদের টঙ্গী সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওসি আরো জানান, বিকাল ৩টার দিকে ইজতেমার মাঠ থেকে সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে র্যাবের হেলিকপ্টার টহল দেয়।
টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মো. পারভেজ হোসেন জানান, ওই ঘটনায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত আহত দুই শতাধিক মুসল্লি এ হাসপাতালে এসেছেন এবং শতাধিক মুসল্লিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আহত মুসল্লিদের মধ্যে ২০ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়েছে। এদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক (৩০), আবু তালেব (৩৫), নূর হোসেন (১৫), মাওলানা মাসুদুর রহমান (৩৫), ইমরান (৩৫), সফিকুল ইসলাম (৩০), মো. শামীম মাতব্বর (৪৯), মো. শেখ আবদুর রব (৮৪), রাসেদ (৩০), মো. জালাল খান (৫০), রুস্তম আলী (৪০), সোলায়মান আকন্দ (৫৫) প্রমুখের অবস্থা গুরুতর বলে জানান ওই চিকিৎসক।
দুপুরে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ওয়াইএম বেলালুর রহমান ঘটনাস্থল ও টঙ্গী হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের নেতৃত্বের কোন্দলে জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব গত মাসে স্থগিত করা হয়। দেওবন্দপন্থিদের আবেদনে নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি এক আদেশে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করে একটি নির্দেশনা জারি করে।
প্রসঙ্গত, উপমহাদেশে সুন্নি মতাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় সংঘ তাবলিগ জামাতের মূল কেন্দ্র ভারতের দিল্লিতে। মাওলানা সা’দের দাদা ভারতের ইসলামী পণ্ডিত ইলিয়াছ কান্ধলভি ১৯২০-এর দশকে তাবলিগ জামাত নামের এই সংস্কারবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন।
স্বেচ্ছামূলক এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের প্রচার। বিতর্ক দূরে রাখতে এ সংগঠনে রাজনীতি ও ফিকাহ নিয়ে আলোচনা হয় না।