নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবির অন্যতম নেতা এমদাদুল হক ওরফে উজ্জ্বল মাস্টার। বছরের পর বছর ধরে আত্মগোপনে থাকা উজ্জ্বল মাস্টারকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলো র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র্যাব। সবশেষ উজ্জ্বল মাস্টার জেএমবির একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন। আর এ গ্রুপটি তাদের অর্থ বাড়ানোর জন্য ডাকাতির পরিকল্পনা করে আসছিল। তবে বড় কোনো নাশকতার আগেই র্যাবের এই অভিযানে ধরা পড়েন তিনি। র্যাব জানায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের খাগডহর এলাকায় গ্রেপ্তার চার জঙ্গি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় জঙ্গি আস্তানার তথ্য দেন। তাদের কথা অনুযায়ী বাসাটিতে জেএমবির শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা থাকতেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে বসিলায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। আর এ আস্তানা থেকেই আটক করা হয় দীর্ঘদিন ধরে খোঁজ করা জঙ্গি এমদাদুল হক ওরফে উজ্জ্বল মাস্টারকে। বর্তমানে জেএমবির বেশ কিছু গ্রুপ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি করার জন্য নাম পরিচয় গোপন করে আস্তানা গড়ে আছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে। দ্রুত সবাইকে গ্রেপ্তার করা যাবে।
র্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ময়মনসিংহ থেকে গ্রেপ্তার জেএমবির চার সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই জঙ্গির আস্তানা সন্ধান পাওয়া যায়। গ্রেপ্তার জঙ্গিরা জিজ্ঞাসাবাদে বসিলা থেকে আটক জঙ্গির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়েছিল র্যাবকে। এর ভিত্তিতে র্যাব ঢাকার বাইরে জামালপুর ও রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মধ্যরাত থেকে বসিলার জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালায়। অভিযানে বর্তমান সময়ের জেএমবির এই শীর্ষ নেতাকে আটক করতে সক্ষম হয়।
তিনি বলেন, অভিযানস্থল থেকে পিস্তল, গুলি, নগদ পৌনে তিন লাখ টাকা, রাসায়নিকদ্রব্য, দেশীয় পদ্ধতিতে তৈরি বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও বেশ কিছু জিহাদি বই জব্দ করা হয়।
তিনি আরো বলেন, বাসার দারোয়ান ও আটক জঙ্গিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে চলতি মাসের ২ তারিখে ভবনটির দোতালায় একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করার কথা বলে। বাসা ভাড়ার সময় পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে পরিবারের লোকজন এলে জাতীয় পরিচয়পত্র দেবে এমন শর্তে বাসাটি ভাড়া নেয় আটক জঙ্গি ও আরেকজন। বাসাটিতে আরো দুজন লোকের আসা-যাওয়া ছিল। তারা গতকাল বাসাটি থেকে বের হয়ে যায়।
পরে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে র্যাব। কারওয়ানবাজারের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন খন্দকার আল মঈন।
তিনি জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাত-্উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবি সদস্যরা বর্তমানে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পুরাতন সদস্যদের সংগ্রহ করছে এবং সংগঠনকে চাঙা করছে।
তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় জেএমবির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংগঠনের অর্থের প্রয়োজনে এমদাদুল হক ওরফে উজ্জ্বল মাস্টার ডাকাতির পরিকল্পনা করছিলেন এবং কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন।
ময়মনসিংহে গ্রেপ্তার যারা : গত ৪ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহে গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন-ময়মনসিংহের জুলহাস উদ্দিন, মো. আলাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোহাম্মদ রোবায়েদ আলম ও রংপুরের মো. আবু আইয়ুব।
তাদের কাছ থেকেও একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, ৩ রাউন্ড গুলি, ৮টি বোমাসদৃশ বস্তু, ৪টি ব্যাগ, লক ব্রেকিংসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। জব্দ করা হয়েছে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা।
র্যাব ১৪-এর অধিনায়ক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা তাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ডাকাতির জন্য দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এ জন্য জামালপুরের একটি গোপন আস্তানায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাদের।’
জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে ময়মনসিংহের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, এনজিও, স্বর্ণালংকারের দোকান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে একটি টার্গেট ঠিক করেছিল। জল ও স্থলপথ হয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছার পরিকল্পনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে নৌকা, মাইক্রোবাস ও বাইক অন্তর্ভুক্ত ছিল। লুট করা অর্থ ময়মনসিংহের একটি এলাকার অপর একটি দলের নিকট হস্তান্তর করার পরিকল্পনা ছিল।
তারা আরো জানান, চলতি বছরের গত ৩১ আগস্ট জামালপুরের মাদারগঞ্জের একটি আস্তানায় তারা জড়ো হয়। পরবর্তীতে পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জামালপুরের জামতলা চর এলাকা থেকে ব্রাহ্মপুত্র নদ দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাত্রা করে। গোপনীয়তা বজায় রাখতে তারা বিভিন্ন চরে যাত্রাবিরতি করে। এরপর মধ্যরাতে ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়ে ময়মনসিংহের খাগডহর এলাকায় পৌঁছায়।
ডাকাতির নেতৃত্বে ছিল গ্রেপ্তার জঙ্গি জুলহাস। তার নেতৃত্বে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে দায়িত্ব পালনের পরিকল্পনা করেছিল। দলের সদস্যদের হাউস ও লক ব্রেকিংসহ বিভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মো. রোকনুজ্জামান বলেন, গ্রেপ্তার চারজনের প্রধান ছিলেন জুলহাস। তিনি ২০০৫ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে আলিম পাস করেন। ২০০২ সালে জামালপুরের একটি মাদ্রাসায় দাখিল পড়ার সময় এক দর্জি মাস্টারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হন। ওই দর্জির দোকানে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং সেখানে বিভিন্ন উগ্রবাদী ওয়াজ ও গজল শুনতেন। এরপর মুক্তাগাছায় একটি মাদ্রাসায় আলিম পড়ার সময় তিনি জেএমবিতে যুক্ত হন। সে সময় মুক্তাগাছার একজন আঞ্চলিক নেতার অধীনে তিনি বায়াত গ্রহণ করেন। বায়াত গ্রহণে ১০ জন জেএমবি সদস্য অংশ নেন। এই ১০ জনের কয়েকজনকে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তারও করেছে। কয়েকজন এখনো আত্মগোপনে আছেন।
অধিনায়ক বলেন, বাংলা ভাই ও শীর্ষ জঙ্গি নেতা সালাউদ্দিন সালেহীনের সঙ্গে জুলহাসের পরিচয় হয়েছিল। সালেহীন বিভিন্ন সময়ে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলে অবস্থানকালে জঙ্গি জুলহাস তাদের বিভিন্ন সহায়তা করতেন। তিনি ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জঙ্গিসংশ্লিষ্টতায় ২ বছর কারাগারে ছিলেন। বাংলাভাইয়ের একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন জুলহাস।
এরপর তিনি নিজ এলাকায় জঙ্গিবাদ প্রচারের জন্য একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা ও সেখানে শিক্ষকতা শুরু করেন। ওই মাদাসার দুজন শিক্ষক জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্টতা থাকায় গ্রেপ্তার হন। তখন তিনি সম্ভাব্য গ্রেপ্তার এড়াতে ২০১২ সালে আত্মগোপনে চলে যান। ফলে মাদরাসাটি বন্ধ হয়ে যায়। জুলহাস টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় ছদ্মনামে বিভিন্ন মাদরাসা, মসজিদে ইমামতি ও শিক্ষকতা পেশায় থেকে জঙ্গি কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন।
গ্রেপ্তার জঙ্গি রোবায়েদ ময়মনসিংহের একটি কলেজ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেন। ময়মনসিংহে পড়ার সময় এক সহপাঠীর মাধ্যমে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হন। এরপর জেএমবিতে যোগদান করেন। ২০১৩ সালে ময়মনসিংহে একটি নাশকতা মামলায় বেশ কয়েক দিন কারাগারে ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ২০১৫ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইংরেজিতে এমএ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রামের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।
তিনি ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও টেকনাফের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। শিক্ষকের ছদ্মবেশেও বিভিন্ন এলাকা ও প্রতিষ্ঠানে জঙ্গিবাদ প্রচার করতেন। জেএমবি সাইবার দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। তিনি করোনাকালে অনলাইন দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করে বেশ কয়েকজনকে জঙ্গিবাদে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
গ্রেপ্তার জঙ্গি আইয়ুব উত্তরবঙ্গের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি (অনার্স) সম্পন্ন করেন। ২০১৯ সালে উত্তরবঙ্গের সাইবার দলের প্রধানের মাধ্যমে জেএমবিতে অন্তর্ভুক্ত হন। তিনি উত্তরাঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে জেএমবি দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পান।
দ্রুত স্বল্প শিক্ষিতদের জেএমবিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই মধ্যে তিনি পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও নীলফামারিতে বেশ কয়েকজন শ্রমিক, অটোচালক ইত্যাদি শ্রেণির পেশাজীবীদের জঙ্গিবাদে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। উত্তরবঙ্গের জেএমবি নেতা তাকে ডাকাতিতে নির্বাচিত করার জন্য শীর্ষ এক নেতার কাছে সুপারিশ করেন।
অপরদিকে জঙ্গি আলাল ২০১০ সালে জুলহাসের মাধ্যমে জেএমবিতে যুক্ত হন। জুলহাসসহ যে দশজন একত্রে জেএমবিতে বায়াত নিয়েছিলেন, তিনি তাদের বিশেষ সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতেন। সাংগঠনিক প্রয়োজনে তিনি ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জে সফর করেছেন।
প্রসঙ্গত, গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাত রাজধানীর বসিলার ওই বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়। অভিযানে জঙ্গি উজ্জ্বল মাস্টারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ আস্তানাতে থাকত আরো কয়েকজন জঙ্গি। যারা ডাকাতিসহ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।





