মুক্তমত

টেকসহ উন্নয়নে গণপরিবহনের আধুনিকায়ন জরুরি

  • প্রকাশিত ২৮ অক্টোবর, ২০২১

মাজহারুল ইসলাম শামীম

 

বিংশ শতাব্দীতে মানুষ যেমন জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে, তেমনি নিজেদের সৃষ্ট কারণেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আমাদের এই বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যা বেশি। বিপুল জনসংখ্যার চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তায় রয়েছে লাখ লাখ গাড়ি। অথচ আমাদের প্রয়োজন হলো একসাথে অধিক জনগণ চলাচলের ব্যবস্থা করা। কিন্তু আমরা আজ বিলাসবহুল বা নিজেদের সুবিধা বাড়াতে ছোট ছোট ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয় করা বাড়িয়ে দিচ্ছি। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন গণপরিবহনে চলাচলকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে, সেখানে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ঘটছে উল্টো ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় দিনকে দিন ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দ্রুত গতিতে বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়ছে না গণপরিবহনের সংখ্যা। বর্তমানে শুধু ঢাকায় না সকল শহরে মাইক্রোবাস, রিকশা, সিএনজি, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ইত্যাদি পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু গণপরিবহন হিসেবে কোনো বাস বা লেগুনার সংখ্যা বাড়ছে না। বরং সেই পুরাতন বাস বা লেগুনা দিয়ে গণপরিবহনের সেবা চালিয়ে যাচ্ছে, যেটা জনগণের কাছে অস্বস্তির কারণ।

এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ঢাকার রাস্তায় ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার যথাক্রমে ৪৯ ও ১৮ শতাংশ বাড়লেও গণপরিবহন বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। কিন্তু রাস্তার আয়তন কম হওয়ায় বাড়ছে যানজট। আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা বসবাসের অযোগ্য, ২০১৮ সালে এমনই এক ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। বসবাসের অযোগ্য হওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে ‘দূষণ’ এবং ‘যানজট’ অন্যতম। দূষণ ও যানজট আন্তঃসম্পর্কিত। সড়কে দীর্ঘ যানজট বায়ুদূষণ বৃদ্ধিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। আর এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গাড়িও কম দায়ী নয়। জনবহুল এই শহরে সকালবেলায় এখন আর পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে না। বরং পাখির ডাকের জায়গায় অবস্থান নিয়েছে গাড়ির হর্নের বিকট শব্দ। কিন্তু করোনা আমাদেরকে একটি শিক্ষা দিয়েছে, কীভাবে ট্রাফিক অব্যবস্থাপনার কারণে রাজধানী চলাচল ও বসবাস অযোগ্য হয়ে ওঠে। আর নিয়ন্ত্রণহীন গাড়ি ও যানজট না থাকলে ঢাকার এক স্থান থেকে আরেক স্থান যেন অনেক নিকটে চলে আসে। স্বল্পতম সময়ে পৌঁছা যায় গন্তব্যে। থাকে না বায়ু ও শব্দদূষণ।

ডিটিসিএ’র এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২৫০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজধানী ঢাকা শহরে বর্তমানে খাতা-কলমে বাস রুটের সংখ্যা ২৯১টি। এই সংখ্যক রুটে আড়াই হাজার কোম্পানির ৩০ হাজার গাড়ি চলাচল করে। জানা গেছে, এসব রুটের মধ্যে কিছু বর্তমানে অকার্যকর। অন্যদিকে ২০১০ সালে ঢাকা শহরে মোট নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৯৩ হাজার ৭৭টি। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখেরও বেশি। বর্তমান সময়ের অন্য আরেকটি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীতে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১৭ লাখ ১৩ হাজার ৫৫৪টি। এর মধ্যে মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি ৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৩৫টি, যা মোট গাড়ির ৪৯ শতাংশ। প্রাইভেটকার নিবন্ধিত হয়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৮৬০টি, যা মোট গাড়ির ১৮ শতাংশ। আর বাসের সংখ্যা ৩৬ হাজার ৯৭৮টি, যা মোট গাড়ির ২ শতাংশ।

এসব তথ্য চিত্র দেখলে বুঝা যায় যে, বাংলাদেশে গণপরিবহন বৃদ্ধির চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি কি পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেটা অবশ্যই জনগণেরর জন্য অকল্যাণকর। এর মাধ্যমে গুটিকয়েক মানুষ উপকৃত হচ্ছে; কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠী দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

আমরা যদি একটু ভালো করে লক্ষ করি, ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে আছে। অথচ প্রতি ১০ স্কয়ার ফুটের জায়গার একটা গাড়িতে মাত্র দু-একজন যাত্রী যাতায়াত করে। কিন্তু একই সময়ে একই সড়কে, গণপরিবহনের একটা গাড়িতে বসে ও দাঁড়িয়ে ৪০/৫০ জন যাত্রী চলাচল করতে পারেন। সেই হিসেবে যে পরিমাণ ব্যক্তিগত গাড়ি, তা ঢাকার রাস্তার অর্ধেকের বেশি দখল করে থাকে। বাকি অংশ থাকে গণপরিবহন ও অবৈধভাবে ফুটপাতের দখলে। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করার কথা বলা হলেও কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। যানজট নিরসনে এবং বৃহৎ জনগণের কল্যাণে পাবলিক সার্ভিস তথা গণপরিবহন বাড়াতে হবে এবং উন্নত সেবার মান নিশ্চিত করতে হবে। আবার গণপরিবহন বাড়াতে হলে প্রথমে গণপরিবহনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং সড়কে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ি মুক্তি ঘোষণা করতে হবে। পাশাপাশি গণপরিবহনে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন নিশ্চিত করতে হবে এবং সরকার থেকে নির্ধারিত পরিমাণ ভাড়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে, জনগণের ভোগান্তি যে তিমিরে, সেই তিমিরেই রয়ে যাবে। তাছাড়া একটি বিষয় সরকারকে সর্তক করতে হবে, এক পরিবারে সর্বোচ্চ কতটা ব্যক্তিগত গাড়ি থাকতে পারবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দিতে হবে। বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয়েও নিষেধাজ্ঞা আনতে হবে।

গত ২৬ জুলাই বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বলা হয়, যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এই শহরে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে যানবাহন চলে। গত ১০ বছর আগেও ঢাকায় যানবাহনের গতি ছিল প্রতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। সুতরাং আমাদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে দিয়ে গণপরিবহনের সেবার মান বাড়িয়ে দিতে হবে। যেন জনগণ স্বস্তি বোধ করে এবং চাহিদামতো সেবা পায়। অনেক ক্ষেত্রে জনগণ ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয় করে গণপরিবহনের সেবার মান নিম্নগামী হওয়ার কারণে। এমতাবস্থায় গণপরিবহনে সেবার মান বৃদ্ধি করার পাশাপাশি যায় তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ি ক্রয় কমতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রয় ও রেজিস্ট্রেশন সময়োপযোগী আইন বাধ্যতামূলক।

অবশেষে একটা কথা বলা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অল্প জায়গায় বেশি যাত্রী পরিবহন করা যায়, সেই ধরনের বাহনকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে বাসের সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। ঢাকায় বর্তমানে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার অত্যধিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল নিরুৎসাহিত করতে পাবলিক বাস, হেঁটে ও সাইকেলে চলাচলের সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন। ফিটনেসবিহীন গাড়ি পরিহার করে ভালো মানের গাড়ি নামানো উচিত, যেন সব পর্যায়ের মানুষ গণপরিবহনে যাতায়াতে উৎসাহিত হয়। এভাবে যদি আমরা গণপরিবহনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে আমাদের টেকসই উন্নয়নের পথটা অনেক দূর এগিয়ে যাবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য শুধু দু-একটি সেক্টরে উন্নয়ন হলে হবে না। প্রতিটা সেক্টরে সমভাবে উন্নয়ন করতে হবে। তাই ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার পরিহারে গণপরিবহনের সেবার মান বৃদ্ধিসহ আধুনিকায়ন আবশ্যক।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ফেনী সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads