মো. বাবুল আক্তার:
গরম থেকে নিস্তার নেই, দেশের কয়েকটি জেলা বাদে সপ্তাহ জুড়েই চলবে এ তাপপ্রবাহ। তাই ঝাঁ-ঝাঁ রোদে পুড়তে হবে আরও কয়েকদিন। গত কয়েক দিনের দাবদাহে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন। ঢাকার বাতাসে যেন ঝরছে আগুনের ফুলকি। যশোর ও চুয়াডাঙ্গায় গলে যাচ্ছে সড়কের বিটুমিন। ইতোমধ্যে দেশব্যাপী জারি করা হয়েছে তিন দিনের হিট অ্যালার্ট।
একই সঙ্গে তাপপ্রবাহের কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গরমের কারণে অনলাইন ক্লাসে যাচ্ছে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চাঁদিফাটা এ গরমে বেশি কষ্টে আছেন জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া মানুষেরা। প্রচণ্ড গরমে ওষ্ঠাগত তাদের প্রাণ।
দীর্ঘ ৬৩ বছর পর এ বছরে তীব্র তাপদাহ। এর আগে ১৯৬০ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকার তাপমাত্রা উঠেছিল ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি। এ দিকে তীব্র গরমে দুর্ভোগ নেমে এসেছে দেশের শহরাঞ্চল ও গ্রামীণ জনপদে। গরমের কারণে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে বহু মানুষ। হাঁসফাঁস অবস্থা গবাদি পশুরও। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছেন খামারিরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, সহসাই কমছে না তাপদাহ। সারাদেশে বয়ে যাওয়া তীব্র গরম আরও বাড়বে। মে মাসেও থাকবে তাপদাহ।
ঢাকা : তাপের ঊর্ধ্বমুখী পারদে ওষ্ঠাগত রাজধানীবাসীর প্রাণ। ঘর থেকে বের হলেই যেন মরুভূমির লু হাওয়া। প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে আর্দ্রতা জ্বালা ধরাচ্ছে শরীরে। দরদর করে ঝরছে ঘাম। এই সময়ে মাঝে-মধ্যে কালবৈশাখী ও বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি আনে; কিন্তু এবার তা-ও নেই। গত দুই বছরের মতো এবারও এপ্রিল মাস যেন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। গত দুইদিন (শনি ও রোববার) রাজধানীতে এই মৌসুমের সর্বোচ্চ ৪০ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে।
যশোর : এ মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে যশোরে। গত সাত দিন ধরে যশোরে তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। বেলা বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাপ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বিপাকে পড়ছেন শ্রমজীবী মানুষ। গতকাল বিকালে ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে এ জেলায়।
চুয়াডাঙ্গা : অসহনীয় গরমের অসুস্থ হচ্ছেন আরেক গরম প্রবণ জেলা চুয়াডাঙ্গার মানুষ। বেশিরভাগই আক্রান্ত হচ্ছেন সর্দি, জ্বর, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ায়। গতকাল রোববার চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি। এর আগে ২০১৪ সালে এই জেলার তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করার কথা জানা যায়।
রাজশাহী : রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের ওপর দিয়েও বইছে তাপদাহ। স্বস্তি পেতে সুযোগ পেলেই মানুষ পুকুর বা যে কোনো জলাশয়ে শরীর ভেজাচ্ছেন। গতকাল বেলা ৩টায় রাজশাহীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বরিশাল : এ দিকে বরিশালেও দাপুটে তাপে কাজে নামতে পারছেন না শ্রমজীবী মানুষ। হাসপাতালেও ভিড় বাড়ছে। গতকাল বরিশালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রাঙ্গাবালী : টানা গরমে পুড়ছে পটুয়াখালীর উপকূলীয় রাঙ্গাবালীর বিস্তীর্ণ জনপদ। হাঁসফাঁস অবস্থা গবাদিপশুরও। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পশু খামারিরা।
নওগাঁ : নওগাঁয় ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে তাপমাত্রা। শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি ঠাণ্ডা জাতীয় খাবার খাওয়ানো পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
সহসাই কমছে না তাপদাহ সহসাই কমছে না তাপদাহ। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সব স্কুল-কলেজ সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। ঈদের ছুটি শেষে গতকাল খোলার কথা থাকলেও এখন তা খুলবে ২৮ এপ্রিল। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর ক্লাসও। প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ার কারণে জরুরি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। হাসপাতালে হিট স্ট্রোকের রোগীও বাড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
গত কয়েক দিনে কুষ্টিয়া ও যশোরে লাগাতার তাপপ্রবাহে অতিষ্ঠ জনজীবন। প্রচণ্ড তাপমাত্রার কারণে যশোরের বিভিন্ন স্থানে সড়কের বিটুমিন গলে যাচ্ছে। ডায়রিয়াসহ গরমজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।
গরমের কারণে স্কুল-কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কলেজগুলোয় ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ দিকে অনলাইন ক্লাস নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, সারা দেশের ওপর দিয়ে প্রবহমান তীব্র তাপদাহের (হিট ওয়েভ) কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষাসমূহ যথারীতি চলমান থাকবে।
প্রচণ্ড গরমে বেশি কষ্ট পাচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। দেশের যেসব জেলায় এই দাবদাহ প্রচণ্ড আকার ধারণ করেছে, সেখানকার হাসপাতালে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে রোগী বেশি।
এ দিকে রাজধানীবাসীও তাপের প্রখরতা টের পাচ্ছেন। তবে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে রোগী বাড়লেও সহনীয় পর্যায়ে আছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, ঈদ ও বৈশাখের ছুটি কাটিয়ে এখনো সবাই ঢাকায় ফেরেননি, তাই রোগীও কম।
অপর দিকে চলমান তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতিতে সারা দেশের হাসপাতালগুলোর পর্যাপ্ত শয্যা খালি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন।
গতকাল সকালে সারা দেশের হাসপাতালের পরিচালক, সিভিল সার্জনদের সঙ্গে বৈঠক করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। এদিন দুপুরে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানান মন্ত্রী।
ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, সকালে সারা দেশের যত হাসপাতাল আছে সব পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। আমি কয়েকটা নির্দেশনা দিয়েছি। এর মধ্যে আছে মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা। বয়স্ক এবং শিশুরা প্রয়োজন ছাড়া যেন বাড়ি থেকে বের না হয়। পাশাপাশি হাসপাতালের বেড খালি রাখার জন্য বলেছি, এই মুহূর্তে কোল্ড কেসের রোগী ভর্তি করাতে মানা করেছি, অর্থাৎ যেসব রোগীর অপারেশন এক মাস পরে করলেও চলে কিংবা এখন ভর্তি না করালেও চলবে তাদের এখন যেন না রাখে। যদি চাপ তৈরি হয় তখন যেন শিশু এবং বয়স্কদের ভর্তি করানো যায়। মুখে খাওয়ার স্যালাইনের সংকট হবে না আশা করছি। সার্বিক পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। বলা যাচ্ছে না, কারণ প্রকৃতির ওপর তো আমাদের কারো হাত নেই।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আমি গতকাল শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। সবাইকে নির্দেশ দিয়েছি শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে। আমাকে সবাই জানিয়েছেন এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। যদি পরিস্থিতি খারাপের দিকে যায় সে জন্য পর্যাপ্ত শয্যা খালি রাখার নির্দেশ দিয়েছি।





