জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

ড. আনিসুজ্জামান

সংগৃহীত ছবি

ফিচার

সফল শিক্ষাবিদের গল্প

জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

  • প্রকাশিত ২২ অক্টোবর, ২০১৮

মো. শফিকুল ইসলাম

আমাদের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গবেষণায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন আনিসুজ্জামান। দু’হাত উজাড় করে তিনি আমাদের দিচ্ছেন, স্বার্থপরের মতো আমরা নিচ্ছি। কিন্তু এ যেন অফুরন্ত ভান্ডার, তাকে নিঃশেষিত করা যাচ্ছে না। গোটা জাতি তার চিন্তাচেতনা, ভাবনা-দর্শনের কাছে আজ নতজানু। সনিষ্ঠ জ্ঞান-তপস্যা তাকে পরিপূর্ণ করে রাখছে এখনো।

আনিসুজ্জামান পেশায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, চিন্তায় ও মননে দূরদর্শী একজন রাষ্ট্রনায়ক। জাতির সব ক্রান্তিলগ্নে একজন শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি জাতিকে দেখিয়েছেন আশার আলো। সফল এই শিক্ষাবিদের জন্ম ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গে। শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন অনন্য স্বাক্ষর। তার বাবা ডা. আবু তাহের মোহাম্মদ ছিলেন বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক। মা ‘হাতেম তাই’ গ্রন্থের লেখক। এই অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয় থেকে বোঝা যায়, আনিসুজ্জামানের অস্তিত্বের মধ্যেই আছে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি-ভাবনার গোপন ন্যায়সূত্র। বাংলা সাহিত্য একাডেমি, একুশে পদক, ভারতের পদ্মভূষণ এবং দেশ-বিদেশের আরো অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান অর্জন করেছেন তিনি। মহান ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন, রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী আন্দোলন এবং ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।

তিনি স্কুল জীবনে কখনো ভালো মেধাবী ছাত্র ছিলেন না। ভালো ছাত্র হয়েছেন কলেজ জীবনে এসে। তার জের চলে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার প্রমাণ হলো নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক পুরস্কার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন কখনো দেখেননি। কিন্তু যখন লেকচার হিসেবে যোগদান করেন তখনও তিনি ভাবতেন কখনো কি অধ্যাপক হতে পারবেন? তবু সেই পদে তিনি অধিষ্ঠিত হতে পেরেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সহকর্মীদের প্রশয় ও ভালোবাসার জন্য।  

১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে স্নাতক সম্মান এবং এমএ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। অনার্সে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৃতিত্বস্বরূপ ‘নীলকান্ত সরকার’ বৃত্তিলাভ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।

আনিসুজ্জামান- এই নামটি এখন আর একজন ব্যক্তির নাম নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের নাম- মুক্তবুদ্ধির প্রতিষ্ঠান, অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধের প্রতিষ্ঠান, বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও ন্যায়পরায়ণতা রক্ষার প্রতিষ্ঠান, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের প্রতিষ্ঠান। মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র, স্বরূপের সন্ধানে, আঠারো শতকের বাংলা চিঠি, পুরানো বাংলা গদ্য, আমার একাত্তর, কাল নিরবধি প্রভৃতি গবেষণাগ্রন্থ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যুগ যুগ ধরে বাংলা সাহিত্য চিনিয়ে দেওয়ার স্মারক হিসেবে বিবেচিত হবে। অস্কার ওয়াইল্ডের An Idol Husband-এর বাংলা নাট্যরূপ আদর্শ স্বামী, আলেক্সেই আরবুঝুরের An Old World Comedy-এর বাংলা নাট্যরূপ পুরনো পালা ইত্যাদি গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন। এক কথায় বলা যায়, আনিসুজ্জামান তার বিপুল কর্ম ও আদর্শের ঐতিহ্য।

ড. আনিসুজ্জামানের কাছ থেকে আহরণের কোনো শেষ নেই। তার জীবন ও কর্ম নিয়ে অব্যাহত চর্চা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে পাঠ করা। সে প্রক্রিয়াও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তিনি নিজে সবাইকে প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য কিছু প্রকাশনা তাকে কেন্দ্র করেই বের হচ্ছে। তার প্রতিভার ও কর্মক্ষেত্রের বহুমাত্রিকতা আবিষ্কারের চেষ্টা হচ্ছে। শুধু তাকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নয়, সৃজনশীলতা, গবেষণা, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতিশীলতার রসদ সংগ্রহের জন্য। তার মধ্য দিয়ে নিজেদের আবিষ্কারের জন্য।

দেশব্যাপী যখন ভয়াল জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ বিস্তার, যখন সংসদ সদস্য হয়ে যুদ্ধাপরাধীরা দেশের পতাকা ও মাটিকে কলঙ্কিত করেছে, তখন আশি ছুঁই ছুঁই আনিসুজ্জামান অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে জাতিকে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে তিনি প্রকাশ্যে আদালতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তার মতো শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীর পক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়া বাঙালির ইতিহাসে অমলিন হয়ে থাকার মতো বিরল ঘটনা।

মানুষের উপেক্ষিত এলাকাগুলো শনাক্ত করে তিনি জীবনের আলো ফেলেছেন। বিভিন্ন বক্তৃতায়, গল্প ও লেখার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন। আজ আমাদের সামাজিক ও সাহিত্যিক অভিভাবক খুঁজতে গেলে তার বিকল্প মেলা দুরূহ হয়ে পড়ে।

আনিসুজ্জামান জীবনে কখনো নিজেকে ফাঁকি দেননি। একটি ক্ষণও জ্ঞানের আলোহীন পথে হাঁটেননি। এই মানুষটি প্রতিনিয়ত একটি পুরস্কার অর্জন করে চলেছেন আর তা হলো দেশের মানুষের ভালোবাসা। সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি শত বছর বেঁচে থাকবেন এটাই আমাদের চাওয়া।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads