এম এ বাবর:
আজিজ, বেনজীর ও আনার কেন্দ্রিক ঘটনাগুলো দেশজুড়ে নানা আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিন ব্যক্তিই আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। তাই এ ইস্যুতে আওয়ামী লীগেও অস্বস্তি।
দেশের দুটি বাহিনীর সাবেক দুই প্রধানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা অনেকটাই নজিরবিহীন। এর মধ্যে একজন এমপির নির্মম খুনের ঘটনার নেপথ্যে স্বর্ণ চোরাচালানের অন্ধকার দিক সামনে এসেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। আর এ ধরনের ঘটনাকে ব্যক্তিগত বলা হলেও এক্ষেত্রে সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহারের সময় সুরক্ষা পেয়েছেন বলে দাবি তাদের।
উল্লিখিত তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির একজন সদ্য বিদায়ী সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। দ্বিতীয় জন সদ্য বিদায়ী পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ এবং তৃতীয় ব্যক্তি সরকার দলীয় একজন সংসদ সদস্য (জনপ্রতিনিধি) আনোয়ারুল আজীম (আনার)। ভিন্ন ভিন্ন কারণে এবং ঘটনায় তারা আলোচনায়। তিন ঘটনার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু তিন ঘটনায় এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যক্তিদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অনিয়ম। একজন জীবন দিয়ে তার অন্ধকার জগতের দরজা খুলে দিয়েছেন। একজন ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছেন। তৃতীয়জনের স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে। এ তিনটি ঘটনার পর একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে, জনগণের সেবার দায়িত্ব যারা পাচ্ছেন, তাদের হাতে জনগণ কতটা নিরাপদ? আর দুর্নীতিবাজরা, চোরাকারবারি, ক্ষমতা অপব্যবহারকারীরা কীভাবে জনপ্রতিনিধি হচ্ছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন? এ ধরনের ব্যক্তিদের হাতে জনগণ কতটা নিরাপদ, এমন প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
আলোচিত ঘটনাগুলো প্রকাশিত হয়েছে দেশ ও বিদেশ থেকে। সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ২০ মে। আর ঢাকার একটি আদালত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও মেয়ের নামে থাকা স্থাবর সম্পদ জব্দ করার আদেশ দিয়েছেন গত বৃহস্পতিবার। তাদের দুজনের বিরুদ্ধেই ক্ষমতার অপব্যবহারসহ দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে। তারা দুজনই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুটি বাহিনীর প্রধান ছিলেন। ফলে সরকার এর দায় এড়াতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
এরই মাঝে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম খুন হয়েছেন ভারতের কলকাতায়। দেশের বাইরে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর খুন হওয়ার ঘটনা জানা যায়। দুই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এ খুনের ঘটনার পেছনে সীমান্তে চোরাচালান নিয়ে বিরোধের বিষয়কে তুলে ধরা হচ্ছে। টানা তিনবারের এই সংসদ সদস্য এবার নির্বাচনি হলফনামায় বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে বিভিন্ন সময় ২১টি মামলার কথা উল্লেখ করেছিলেন। যদিও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই কোনোটিতে খালাস বা কোনোটিতে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। কিন্তু এখন কলকাতায় গিয়ে তার খুন হওয়ার ঘটনা যেমন নানা অভিযোগকে সামনে আনছে, একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি না থাকলেও বারবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ সদস্য হওয়ার বিষয় নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
জেনারেল আজিজ আহমেদ সাবেক সেনাপ্রধান। তিন বছর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২১ সালের জুনে তিনি অবসরে যান। ক্ষমতার অপব্যবহার, তিন ভাইয়ের অপরাধ ধামাচাপা দিতে প্রভাব খাটানো এবং ভাইদের সেনা কেনাকাটায় অবৈধ সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে জেনারেল আজিজ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাবেক সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছে, তা নতুন নয়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আলজাজিরায় এ নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টারস মেন’ শিরোনামে ওই প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করেছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
চাকরি জীবনে জেনারেল আজিজ দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সেনাপ্রধান হওয়ার আগে তিনি বিজিবির মহাপরিচালক ছিলেন। দুই জায়গাতেই তার ব্যাপারে নানা মুখরোচক আলোচনা শোনা যায়। সরকারের ঘনিষ্ঠ এরকম একটি ধারণা দিয়ে তিনি দাপট দেখিয়েছেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে বিস্তর অভিযোগ আছে। কিন্তু এসব অভিযোগ তদন্ত তো দূরের কথা, আমলেই নেওয়া হয়নি।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে আমাদের গৌরবের সশস্ত্র বাহিনী। ২০০৯ সাল থেকে সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক মানের একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছে। সেনাপ্রধানরা অবসরের পর নিভৃত জীবনযাপন করেন। দায়িত্ব পালন করে তাদের পেশাদারিত্ব, সততা ও নিষ্ঠা তরুণদের জন্য অনুকরণীয় হয়। কিন্তু জেনারেল আজিজদের সময়ে ব্যাপারটি তেমন ছিল না।
বিজিবির প্রধান বা সেনাপ্রধান হিসেবে তার অনেক কর্মকাণ্ডেই পেশাদার অফিসাররা অস্বস্তিতে পড়েছেন। বিব্রত হয়েছেন। সেনাপ্রধানের চেয়ে সরকারের ঘনিষ্ঠ এ পরিচয়টি তার ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠেছিল।
গত ২৩ মে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ এবং তার স্ত্রী, কন্যার সব স্থাবর সম্পদ এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার নির্দেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের এই আদেশ। গত কিছুদিন ধরেই সাবেক এই পুলিশ প্রধানের বিপুল অবৈধ সম্পদ নিয়ে তোলপাড় চলছিল। একটি জাতীয় দৈনিকে তার দুর্নীতির ফিরিস্তি প্রকাশিত হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি হাইকোর্টের দৃষ্টিতে আনেন একজন আলোচিত সংসদ সদস্য। হাইকোর্টে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে। দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত নির্দেশ দেয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে। তদন্তের স্বার্থেই দুদক বেনজীর এবং তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদ ক্রোক করার আবেদন করে।
বেনজীর আহমেদ বেপরোয়া হয়ে ওঠার নানা কেচ্ছা-কাহিনি অলিগলিতে আলোচনা হয়। পুলিশের প্রায় কর্মকর্তাই তার পরিবর্তনের বিস্মিত। তার ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরাই হতাশার সুরে বলেন, পুলিশ প্রধান হওয়ার পর তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। নানা রকম বিতর্ক এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। প্রচণ্ড ক্ষমতার দাপটে তিনি যা খুশি তা-ই করেছেন বলেও অনেক মন্তব্য করেন। পুলিশ প্রধান থাকা অবস্থায় তার লাগামহীন দুর্নীতি সরকারের বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছিল। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষপদে থাকা অবস্থায় তিনি অবৈধভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারকে কলকাতায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত বুধবার এ খবরটি নিশ্চিত করে কলকাতা পুলিশ। গত ১২ মে তিনি চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। ১৮ মে থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আনার হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যমে এখন পর্যন্ত যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা লোমহর্ষক। এ হত্যাকাণ্ডের পর চোরাচালানের ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডে’র চাঞ্চল্যকর সব খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
তিনবারের সংসদ সদস্য আনারের মৃত্যুর পর তার জীবনের অন্ধকার অধ্যায় সামনে এসেছে। মৃত্যুর পর জানা গেল তিনি চোরাচালান চক্রের একজন ‘গডফাদার’ ছিলেন। ওই এলাকার চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতেন এই সংসদ সদস্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এ বি এম নাজমুস সাকিব বলেন, সাবেক দুই বাহিনীর দুই প্রধান ও এমপি আনার খুন হওয়া এই তিন ঘটনার মধ্যে অবশ্যই যোগসূত্র আছে। তিনটি ঘটনাই খুব কাছাকাছি সময়ে ঘটেছে। তিনটি ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনো ধরনের অপরাধ যুক্ত। কেউ অপরাধের শিকার, কেউ অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত। প্রশাসন ও রাজনীতিতে দুর্নীতি করেছেন, এমন আরও অনেকে আছেন। বেনজীর-আজিজ-আনার, তিনজনকে দুর্নীতির সুযোগ করে দিয়েছে বর্তমান ক্ষমতা কাঠামো। এখানে একে অপরের সহযোগী হয়ে চলে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি। তাছাড়া তিনটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিন ব্যক্তি আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। তাই সরকার কোনোভাবে এ দায় এড়াতে পারে না।
তবে ক্ষমতাসীন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বস্ত্রমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এক্ষেত্রে সরকারের দায় দেখেন না। তিনি জানান, কেউ কোনো অনিয়ম করলে তা গোপনেই করবে। সরকার কাউকে পাহারা দিতে পারবে না। এসব কাজের জন্য অনিয়মকারীকেই জবাবদিহি করতে হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার বসে নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ইতোমধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব নিয়ে সংশয়ের কোনো সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যক্তিকে অনিয়মের সুযোগ করে দেয় প্রতিষ্ঠান। সরকার ও সেই প্রতিষ্ঠানগুলো কখনোই দায় এড়াতে পারে না। দুই বাহিনী প্রধানই ক্ষমতা অপব্যবহারের সময় সরকারের সুরক্ষা পেয়েছেন। এসব ঘটনা দুর্নীতি-অনিয়মের ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’ অর্থাৎ ক্ষুদ্র অংশমাত্র। কিছু সংখ্যক পুলিশ, আমলা বা রাজনীতিবিদ দুর্নীতি করছে। তাদের দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আজিজ আহমেদ ও বেনজীর আহমেদের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে ক্ষুণ্ন করতে ভূমিকা রেখেছে। দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে এনে জেনারেল আজিজ আহমেদসহ তার পরিবারের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে বিদেশি একটি টেলিভিশনে আজিজ আহমেদ ও তার ভাইদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে সেনাপ্রধান এবং তার ভাইদের বিভিন্ন অপকর্মগুলোর নিরপেক্ষ ও নির্মোহ তদন্ত করা ছিল সরকারের দায়িত্ব। সরকার অভিযোগগুলো আমলেই নেয়নি। বিশেষ করে নাম, ঠিকানা, পিতৃপরিচয় পরিবর্তন করে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট নেওয়ার মতো বিষয়গুলো প্রমাণিত। এসব জালিয়াতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আজিজ আহমেদ এবং তার ভাইদের অপরাধ তাদের ব্যক্তিগত। রাষ্ট্র বা সরকার কেন তার দায় নেবে? অন্যদিকে সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরকে নিয়ে অনুসন্ধানে নেমে শত শত কোটি টাকার সম্পদের খোঁজ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দেশের দুটি বাহিনী প্রধানের এমন কর্মকাণ্ড সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
তিনি বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাদের (আজিজ বেনজীর) যে ভূমিকা ছিল, তার কারণেই তাদের অপকর্মের দিকে তাকিয়েও মুখ বুজে রাখা হয়েছে কিনা, সেই প্রশ্ন জনমনে রয়েছে। এছাড়া তিন বারের সংসদ সদস্য আনার চোরাচালান চক্রের একজন ‘গডফাদার’ ছিলেন এটি যেকোনো গোপন বিষয়, তা নয়। ওপেন সিক্রেট। সবাই জানতেন। আওয়ামী লীগেও নিশ্চয়ই বিষয়টি অজানা নয়। সবকিছু জেনেশুনে একজন চোরাকারবারিকে কীভাবে তিন-তিনবার জনপ্রতিনিধি হিসেবে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিল? এসব স্বাভাবিক ঘটনা নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।





