বহু বছরের পুরনো দেশের প্রায় সবগুলো চিনিকলের আধুনিকায়নের কাজ করা অনেক আগে জরুরি হয়ে পড়লেও এখনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে চিনিকলগুলোতে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের তাগিদ দিয়ে আসছে সরকার। এরমধ্যে যারা প্রস্তাব দিচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের প্রস্তাব নিয়ে নানা দ্বিমত। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
তিন বছর আগে দেশের চিনিকলগুলোর মান উন্নয়নে পরামর্শ দেয় জার্মানির একদল বিশেষজ্ঞ। তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রস্তাবও দেয় চিনিকল মালিকরা। তবে সেই ‘প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়’ জানিয়ে সবগুলো চিনিকল বিদেশি বিনিয়োগে দেওয়া যায় কি না সেটা চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে বিএসএফআইসি।
গত বছরের শুরুতে বহুমুখী বা উপজাত পণ্য উৎপাদনের উপায় খুঁজতে শুরু করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)। প্রতিটি মিল কী ধরনের বহুমুখী পণ্য উৎপাদন করে লাভজনক হতে পারে সেটা জানাতে মিলগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের চিঠি দেয় সংস্থাটি।
এরপর গত বছর জুনে বিভিন্ন মিল থেকে প্রস্তাবও এসেছে। কিন্তু পরবর্তীকালে থেমে গেছে সে উদ্যোগ। তবে বিএসএফআইসি বলছে, মিলগুলো থেকে যে প্রস্তাব এসেছে সেগুলো বাস্তবসম্মত নয়। ফলে সেসব প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএসএফআইসির ১৫টি চিনিকলের প্রস্তাবে বহুমুখী পণ্য হিসেবে স্পিরিট ও অ্যালকোহল উৎপাদন, ফলের রস প্রক্রিয়াজাতকরণ, পানি পরিশোধনাগার নির্মাণ, রাইস মিল, ফ্লাওয়ার মিল, হিমাগার স্থাপন এবং পশুপালনেরও প্রস্তাব ছিল। যার কোনোটিতে সায় দেয়নি বিএসএফআইসি।
এ বিষয়ে বিএসএফআইসি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান কবির আহাম্মদ সরকার বলেন, তাদের (মিল কর্তৃপক্ষের) এসব প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। এসব করে মিল লাভজনক দূরের কথা, টেকানো যাবে না। এমন কিছু প্রস্তাব আমরা চাচ্ছি, যাতে মিলগুলো তাদের খরচ পুষিয়ে লাভজনক হতে পারে।
গণমাধ্যমে নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা বলেন কয়েকজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তারা জানান, প্রস্তাব নেওয়ার পর থেকে এ বিষয়ে কিছুই জানায়নি বিএসএফআইসি।
ঠাকুরগাঁও চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, আমরা হিমাগার স্থাপনসহ কয়েকটি প্রকল্পের প্রস্তাব করেছি। কিন্তু প্রস্তাব নেওয়ার পরে সে বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা আরো ভাবছি। বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের থেকে এখন চিনিকল নিয়ে নতুন পরিকল্পনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। থাইল্যান্ড ও জাপান আমাদের তিনটি চিনিকলে বিনিয়োগ করতে চায়। সেভাবে সবগুলো চিনিকল বিদেশি বিনিয়োগে দেওয়া যায় কি না সেটা আগে চেষ্টা করা হবে।
পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের তথ্যমতে, দেশে মোট সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিনিকল আছে ১৫টি। এর মধ্যে ৯টি উৎপাদনে রয়েছে। বাকি ছয়টিতে আখ মাড়াই কার্যক্রম চালু থাকলেও সরাসরি উৎপাদনে নেই। দেশের চিনিকলগুলোর অধিকাংশেরই তিন থেকে চার হাজার একর জমি রয়েছে। কিছু মিল ছোট, যার মধ্যে সবচেয়ে ছোট পাবনা চিনিকল লিমিডেট। এর আয়তন ৬০ একর।
বড় মিলগুলোর মধ্যে কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লিমিটেড, সেতাবগঞ্জ সুগার মিলস, নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস, রংপুর সুগার মিলে বড় ধরনের বিনিয়োগ আশা করছে বিএসএফআইসি। ছোটখাটো মিল বা ফ্যাক্টরিতে বহুমুখী পণ্য উৎপাদনে এসব মিলের জমি নষ্ট হবে। ফলে পরবর্তী সময়ে নতুন বিনিয়োগ মিলবে না।
এসব বিষয়ে বিএসএফআইসির চেয়ারম্যান মো. আরিফুর রহমান অপু বলেন, আমাদের (বিএসএফআইসি) আর্থিক পরিস্থিতি ভালো নয়। যে কোনো উদ্যোগ নিতে হলে অবশ্যই ভেবেচিন্তে নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, হুটহাট বিনিয়োগের সক্ষমতাও এ সংস্থার নেই। বড় বিনিয়োগের পরিস্থিতিও নেই। বিদেশি বিনিয়োগের যেসব প্রস্তাব, আমরা সেগুলো আগে পর্যালোচনা করছি।
জানা যায়, দেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে তিনটি ত্রিশের দশকের, তিনটি পঞ্চাশের দশকের, সাতটি ষাটের দশকের এবং দুটি বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরে স্থাপিত হয়।
এগুলো ৪০ থেকে ৫০ বছরের আয়ুষ্কাল ছিল। ফলে অধিকাংশ চিনিকলের যন্ত্রাংশ অতি পুরাতন ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় এগুলির স্থাপনকালীন উৎপাদন ক্ষমতা ও দক্ষতা যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। ১০ টি চিনিকলের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ৯টি চালু রাখা হয়েছে এখন।
জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে সরকারি ব্যবস্থাপনায় অন্তত ১৫টি চিনিকল রয়েছে। সেই সব চিনিকল এলাকা বা জোনে সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ একর জমি আখ চাষের উপযোগী হলেও সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে মাত্র ৪৯ হাজার ৯০৮ একর জমিতে আখ চাষ হচ্ছে। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে আখ চাষ হয়েছে এক লাখ ২৭ হাজার ২৮৩ একর জমিতে, আবার ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৭৭ হাজার ৫০০ একর জমিতে। অপর দিকে চিনি ও খাদ্য করপোরেশনের আওতায় এসব চিনিকল জোন এলাকায় প্রতি একরে আখ উৎপাদন হয় গড়ে মাত্র ১৮ টন। অথচ সুগারক্রপস গবেষণা ইনস্টিটিউশন কর্তৃক উদ্ভাবিত ৪৮টি উন্নতমানের জাতের উৎপাদন প্রতি হেক্টরে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ টন।
অপর দিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে দেশে ২০২০-২১ ইং অর্থবছরে মাত্র ২৯ হাজার ৮০ হেক্টর জমিতে ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টন আখ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে প্রতি হেক্টরে উৎপাদন ধরা হয়েছে গড়ে মাত্র ৫৮ টন। এ দিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলতি অর্থবছরে মাত্র ৯২০ হেক্টর জমিতে ৫৮ হাজার ৮৮২ টন আখ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ সমগ্র জেলায় রয়েছে মাত্র ৩২০ হেক্টরে জমিতে ২২ হাজার ৪০ টন আখ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা। সে কারণে কৃষি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে চট্টগ্রামসহ দেশের নদী সাগর ও পাহাড়ের পাদদেশের অন্তত ১৪-১৫ লাখ হেক্টর অনাবাদি জমিতে আখ চাষের উদ্যোগ নিতে হবে। এর মধ্য দিয়ে আখ চাষের উৎপাদন যেমন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে তেমনি চিনিকলগুলোতে আখ মাড়াই করে চিনি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নতমানের ভদকা, স্প্রিট, অ্যালকোহল ও জৈবসার উৎপাদনের মধ্য দিয়ে পাল্টে যেতে পারে দেশের অর্থনৈতিক চিত্র।
সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েক লাখ হেক্টর অনাবাদি জমিকে আখ চাষের আওতায় আনা গেলে পাল্টে যাবে দেশের চিনি ও গুড় শিল্পের ভবিষ্যত, এমনটাই মনে করেন সংশ্লিষ্ট মহল।





