জাতীয়

চাকরি বিধি নিয়ে আতঙ্ক!

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৩ মার্চ, ২০২২

উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে বহিষ্কারের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। তাদের এ আতঙ্কের কারণ চাকরি বিধির ৫৪(২) ধারা নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি হারানোর ভয় পাচ্ছেন। তাই আগের মতো স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এতে দুদকের কাজের গতি খানিকটা কমেছে।

তবে দুদক সচিব মাহবুব হোসেন জানান, এতে দুদকের কাজের গতি কমেনি, থেমেও যায়নি, স্বাভাবিক গতিতেই কাজ চলছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, কারও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না এমন কোনো পরিস্থিতি এখানে তৈরি হয়নি। সবাই স্বাধীনভাবে কাজ করছে। নির্ভয়ে বিধি মোতাবেক কাজ করতে হবে। কমিশনও অন্যায়ভাবে বা বিধিবহির্ভূত কোনো কাজ করবে না।

দুদক কর্মকর্তা বলেন, ‘গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমাদের মাসিক সমন্বয় সভায় সবাইকে নির্ভয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে, ভয়ের কোনো কারণ নেই। চাকরি বিধিমালায় ৫৪/২ ধারা আগে থেকেই ছিল। নতুন করে এটা ইনসার্ট করা হয়নি। এটি আদালতেও অবতারণা হয়েছে। এটি নিয়ে এখনই কোনো মতামত দেওয়া সমীচীন হবে না।’ বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এই সভায় যুক্ত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দুদকে এখন একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। কেউ কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত করার আগে ১০ বার ভাবছে। দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে কেউ প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়তে চাইছে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান বা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাধারণ মানুষ দুর্নীতি করে কম। দুর্নীতি করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা অনুসন্ধান করতে গিয়ে চাকরি হারাতে হলে সবাই তা পাশ কাটিয়ে যাবে। তদন্ত বা অনুসন্ধান করতে গিয়ে কেউ বিধি লঙ্ঘন করলে বা আর্থিকভাবে লাভবান হলে, এগুলো প্রমাণ সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। শুধু অভিযোগের প্রেক্ষিতেই কাউকে চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়া হলে কর্মপরিবেশ স্বাভাবিক থাকতে পারে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপ-পরিচালক পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে দুদকে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে। সবাই ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। নোটিশ জারি বা জিজ্ঞাসাবাদের সবকিছুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমোদন নিয়ে করা হয়। কিন্তু অভিযোগ ওঠার পর শুধু তদন্ত বা অনুসন্ধান কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া হয়।’

দুদকের এই কর্মকর্তা বলেন, তদন্ত বা অনুসন্ধানের মূল কাজগুলো করেন উপ-সহকারী পরিচালক, সহকারী পরিচালক বা উপ-পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এরা সবাই দুদকের স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা। আর ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বেশিরভাগই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে আসেন। তারাও নানারকম প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। অনেক সময় অবৈধ আদেশ না শুনলেও চাকরিতে নানা সমস্যা তৈরি হয়। এভাবে তো কাজের পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব না।

এদিকে গত মঙ্গলবার দুদক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মশিউর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সামপ্রতিক ঘটনায় দুদকে কর্মপরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে এবং হচ্ছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত ২০ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)এ সুষ্ঠু অনুসন্ধান এবং তদন্তের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং চাকরি বিধিমালার বিতর্কিত ৫৪(২) বিধির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পেন্ডিং আবেদন কমিশন কর্তৃক প্রত্যাহারের বিষয়ে দুদকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ হতে কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর কমিশনের সচিবের মাধ্যমে আবেদন করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনোরূপ আশ্বস্তও করা হয়নি। সম্প্রতি এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে (যেমন- বিভাগীয় মামলা দায়ের, শোকজ ইত্যাদি) যা প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক কর্মপরিবেশকে নষ্ট করছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোনো ধরনের নোটিশ ব্যতীত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে শুধু তিন মাসের বেতন দিয়ে রাজস্ব খাতভুক্ত সরকারি কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হলে ওই কর্মচারী দ্বারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। অতি সম্প্রতি দুদক চাকরি বিধিমালার বিতর্কিত বিধি ৫৪(২) এর প্রয়োগ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষে দাখিলকৃত আবেদনের প্রেক্ষিতে কমিশন হতে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না পাওয়ায় দুদকের সর্বস্তরের কর্মচারীদের মধ্যে চাকরির নিরাপত্তাহীনতা, হতাশা ও আস্থাহীনতার পরিবেশ বিরাজ করছে। দুদক একটি স্বাধীন ও স্বশাসিত সংস্থা, যার কর্মচারীরা প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে অনুসন্ধান/তদন্ত করবেন। কিন্তু চাকরি বিধিমালার বিতর্কিত বিধি ৫৪(২) এর প্রয়োগের ফলে স্বাধীনভাবে কাজ করার কর্মপরিবেশ থাকছে না।

এমন পরিস্থিতিতে দুদক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দুদক সচিবের কাছে বিদ্যমান পরিস্থিতির অবসানে কমিশনের নিয়মিত সভায় আবেদিত বিষয়সমূহ আলোচনা-পূর্বক কমিশনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও সিদ্ধান্ত দুদকের কর্মচারীদের লিখিতভাবে জানানোর অনুরোধ করা হয়। এ বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে দুদকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads