চলে গেল ভরসার হাতটি

চলে গেল ভরসার হাতটি

সংরক্ষিত ছবি

রাজনীতি

চলে গেল ভরসার হাতটি

  • রেজাউল করিম হীরা
  • প্রকাশিত ৭ জানুয়ারি, ২০১৯

এক-এগারোর সরকারের সময় দলের ওপর চরম দুর্যোগ। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন কারাবন্দি। সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলও জেলে। ওই দুঃসময়ে দলের হাল ধরেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। নানা চড়াই-উতরাই মোকাবেলা করে সে সময় দলটিকে ঐক্যবদ্ধ করেন নিভৃতচারী এই নেতা। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে সেই দুঃসময়ের অগ্নিপরীক্ষায় নিজেদের আরও কঠিন ঐক্যে সংগঠিত করে নেন। তার এক দশক পরও আওয়ামী লীগ আজ ঐক্যবদ্ধ। শুধু দুঃসময়ের সেই কাণ্ডারির ভরসার হাতটি নেই। গত বৃহস্পতিবার সবাইকে কাঁদিয়ে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন রাজনীতির সেই কিংবদন্তি— সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, বাংলাদেশের রাজনীতিতে যিনি সৈয়দ আশরাফ নামেই বেশি পরিচিত। এই মহান নেতার প্রস্থানে শোকে কাতর সারা দেশ। দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে তিনি রাজনীতির প্রিয় ‘প্রাণপুরুষ’। তার শূন্যতা কখনো পূরণ হবার নয়।

২০০৭ সালে এক-এগারোর সরকার ক্ষমতায় এসে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে। তারপর নানা অজুহাতে একের পর এক রাজনীতিবিদদের কারবন্দি করা হয়। বাদ যাননি আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। তখনকার আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত আবদুল জলিলও গ্রেফতার হন। দেশের রাজনীতিতে নেমে আসে অমাবশ্যা। রাজনীতিবিদরা দিশেহারা হয়ে পড়েন তখন। চারদিকে দল ভাঙার গুঞ্জন। এমন দুঃসময়ে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলের হাল ধরেন সৈয়দ আশরাফ। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও ভূমিধস জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এই নেতা। পরে ভারমুক্ত হয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয় তাঁকে। দুই মেয়াদে সাফল্যের সঙ্গে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৬ সালের শেষের দিকে নিজে সরে এসে অন্যদের সুযোগ করে দেন এই মহান ব্যক্তিত্ব। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফকে দলটির সভাপতিম্ললীর সদস্য করা হয়।

কিশোরগঞ্জ সদর আসন থেকে সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। আওয়ামী লীগ সরকারের গত দুই মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন এই নির্লোভ মানুষটি। ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে প্রথমবার এমপি হন। পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি কর্মেই তিনি রেখে গেছেন সততার অনন্য দৃষ্টান্ত। মন্ত্রী থাকার পরও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নিজের আয় থেকে নির্বাচনে এক টাকাও খরচ করতে পারেননি। অথচ গত ১০ বছরে দেশের অনেক মন্ত্রী-এমপির সম্পদ কয়েক গুণ বাড়লেও সৈয়দ আশরাফকে তার আত্মীয়-স্বজনরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ২৫ লাখ টাকা দেন নির্বাচনে খরচ করার জন্য। সেই টাকায় নির্বাচন করেন এবং জয়লাভ করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনে তার জমা দেওয়া হলফনামার ফরম-২১ থেকে জানা যায়, রাজধানীর গুলশানে পাঁচ কাঠার একটি প্লট এবং পৈতৃকসূত্রে কিশোরগঞ্জে ১টি ও ময়মনসিংহে একটি বাড়ি ছিল। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাঁর আর শপথ নেওয়া হলো না।

ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের এই কা্লারি। তাঁর এই অসময়ে চলে যাওয়ার খবরে শোকাতর হয়ে পড়ে সারা দেশের মানুষ। দলমত নির্বিশেষে সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন— এমন ভালো মানুষটির প্রস্থানে রাজনীতির শূন্যতা কখনোই পূরণ হবার নয়।

দলের সভাপতিম্ললীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, সৈয়দ আশরাফ ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ। আজীবন দলের দুঃসময়ে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আমরা সবাই যখন কারাবন্দি তখন জিল্লুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রাজনীতির মাঠে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের প্রয়োজনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা পূরণ করা দুরূহ। ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাস করতেন না। আমাদের ছেড়ে তাঁর চলে যাওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য এক বড় শূন্যতা।      

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যেভাবে নির্লোভ ও সৎভাবে জীবনযাপন করেছেন, তা সচরাচর দেখা যায় না। প্রয়াত এই নেতার ব্যক্তিগত গুণে মুগ্ধ তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও।

রাজনীতির মাঠে তাঁর বিপরীত শিবিরে থাকা জোট ও দলগুলোর নেতাদের শোক বার্তায় এর প্রমাণ মেলে। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এক শোকবার্তায় বলেন,  সৈয়দ আশরাফের মতো অভিজ্ঞ সাংসদ ও সৎ, দক্ষ রাজনীতিবিদের বিশেষ প্রয়োজন ছিল। তাঁর মৃত্যুতে দেশ হারাল মহৎপ্রাণ ত্যাগী দেশপ্রেমিক একজন রাজনীতিবিদকে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদ্যস্য আবদুল মঈন খান শোকবার্তায় বলেছেন, সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুতে জাতি একজন ‘সত্যিকারের গণতন্ত্রীকে’ হারাল। তার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হবার নয়। ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব  অধ্যাপক আব্দুল করিম বলেন, রাজনীতির মাঠে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন একজন সৎ, নির্ভীক ও সজ্জন ব্যাক্তি। অত্যন্ত সাধাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত সৈয়দ আশরাফ ছিলেন নির্লোভ ও নিরহংকারী। তাঁর মতো বিচক্ষণ মানুষের বর্তমান রাজনীতিতে খুবই প্রয়োজন ছিল।

রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন মানুষ। গত শনিবার সন্ধ্যায় যখন এই নেতার মরদেহ দেশে নিয়ে আসা হয়, তখন বেইলি রোডের বাসায় মানুষের ঢল নামে। শুধু প্রিয় এই মানুষটিকে শেষবারের মতো এক নজর দেখার জন্য। মানুষের ঢল সামলাতে বার বার মাইকিং করা হলেও তাতে কোনো কাজ হয়নি।

গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর ১২টায় কিশোরঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তৃতীয় জানাজা হয় দুপুর ২টায় ময়মনসিংহের আঞ্জুমান ঈদগাহ মাঠে। পরে বাদ আছর বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন আদর্শবান-ত্যাগী-নিবেদিতপ্রাণ ও সর্বজনস্বীকৃত এই নেতা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads