অযৌক্তিক ও অবৈধভাবে গৃহস্থালিসহ সব পর্যায়ের প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এক ধাপে এক শতাংশেরও বেশি দাম বৃদ্ধির এমন প্রস্তাবের বিরোধিতা করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা তা কার্যকর না করারও দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আয়োজিত গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ওপর গণশুনানিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলীসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান বিইআরসি’র কাছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। বিইআরসির আইন অনুযায়ী তাদের কাছে বছরে একবারের বেশি গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে না কোম্পানিগুলো। গত বছরের অক্টোবরে সংস্থাটি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছিল, তবে ওই দাম গ্রাহককে দিতে হয়নি। সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী বাড়তি দাম (এক বছরের জন্য সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা) সরকার দিয়েছে।
শুনানিতে এপ্রিলে এলএনজি (তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আসবে এই অজুহাতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। কিন্তু এখনো পাইপলাইনই নির্মিত না হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর অযৌক্তিক বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সালেক সুফি। তিনি বলেন, বিতরণ কোম্পানিগুলো এলএনজি আমদানির যৌক্তিকতা তুলে ধরছে, কিন্তু তারা সেটা পারে না। তারা বিভিন্ন কোম্পানিকে ঋণ দিয়েছে। এটা কোন নীতিতে দিয়েছে তারা? তারা কি ব্যবসায়ী নীতি পরিবর্তন করেছে?
তিনি আরো বলেন, সংস্থাগুলো বলছে, পেট্রোবাংলার নির্দেশে দিয়েছে। এপ্রিল থেকে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি আসবে বলা হচ্ছে। কিন্তু পাইপলাইনের কাজই শেষ হয়নি। গ্যাস আসবে না তাই ধরে নিয়ে গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ৬০০-৭০০ টাকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আবাসিকে মিটার না দিয়ে গ্যাস খাতকে দুর্নীতির মধ্যে রাখা হচ্ছে। মিটার যুক্ত গ্রাহকের ৩০০-৪০০ টাকা বিল আসে। মিটারবিহীনরা দিচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। কিন্তু তারা ৫০ ভাগও গ্যাস ব্যবহার করে না। এটা বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ হাউজ অ্যান্ড ফ্ল্যাট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আপনারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিতে পারবেন না। তাহলে দাম বাড়াবেন কেন? দুর্নীতি ছাড়া গ্যাসের কোনো কাজ হয় না। এই দুর্নীতি বন্ধ করতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এখনই কোম্পানিগুলো লাভজনক জায়গায় আছে। দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে গ্যাসের দাম না বাড়িয়েই আরো লাভ করতে পারবে কোম্পানিগুলো।’
সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্শন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, ‘অন্য কোনো জ্বালানিকে প্রণোদনা দেওয়ার জন্য যেন সিএনজি’র দাম বাড়ানো না হয়। এতে হলে শুধু সিএনজি খাতেরই ক্ষতি হবে না, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যেরও ক্ষতি হবে।’
এদিকে শুনানিতে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি আবাসিকে এক চুলা বর্তমান দর ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩শ’ ৫০ টাকা, দুই চুলা ৮শ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪শ’ ৪০ টাকা, প্রি-পেইড মিটারে ৯.১০ (ঘনমিটার) টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬.৪১ টাকা করার প্রস্তাব করেছে।
অন্যদিকে বিদ্যুতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৩.১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.৭৪ টাকা, সিএনজিতে ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮.১০ টাকা, সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ২.৭১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮.৪৪ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯.৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮.০৪ টাকা, শিল্পে ৭.৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৪.০৫ টাকা, বাণিজ্যিকে ১৭.০৪ টাকার পরিবর্তে ২৪.০৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাখরাবাদের গ্যাস কোম্পানির পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম এবং জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) নারায়ণ চন্দ্র পাল বক্তব্য রাখেন।
এদিকে কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ড দেওয়ার বিষয়ে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ডিভিডেন্ড দিতে হয়। কারণ কোম্পানি আইনে ডিভিডেন্ড দেওয়ার বিধান রয়েছে। তিনটা কোম্পানি বোর্ড ডিভিডেন্ড ঠিক করে দেয়। কিন্তু এটা আমার কাছে যৌক্তিক মনে না হলেও বাস্তবতা মেনে নিতে হয়।’ প্রি-পেইড মিটার দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রকল্প হাতে নিয়েছি। দ্রুততার সঙ্গে কাজ শুরু হবে।’
তবে চলতি অর্থবছর সমাপ্তির পর প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে তিতাসের বিতরণ চার্জ বাড়ানো যৌক্তিক হবে বলে জানিয়েছে বিইআরসির মূল্যায়ন কমিটি।
গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য আবদুল আজিজ।
এর আগে গত মঙ্গলবার গণশুনানিতে উপস্থিত ছিলেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে শিল্প-কারখানায় মজুরি ও অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে। এতে আগের চেয়ে উদ্যোক্তাদের খরচ ২৯ শতাংশ বেড়েছে। এখন আবার গ্যাসের দাম বাড়ালে উদ্যোক্তারা দেউলিয়া হয়ে যাবে।
গণশুনানিতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি আবাসিকের পাশাপাশি যানবাহনে ব্যবহূত সিএনজির (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস) দাম প্রতি ইউনিট (প্রতি ঘনমিটার) ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮.১০ টাকা, শিল্পকারখানার বিদ্যুৎকেন্দ্রে (ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র) সরবরাহ করা গ্যাস (প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৮ টাকা ৪ পয়সা) এবং সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করা গ্যাসের দাম (প্রতি ইউনিট ৩ টাকা ১৬ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৭৪ পয়সা) বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে তিতাস।
গণশুনানিতে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, এক অর্থবছরে গ্যাসের মূল্য একবারের বেশি বৃদ্ধি করা যায় না, এটি বিইআরসির আইনেই বলা আছে। এলএনজি (তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানির কথা বলে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির যে প্রস্তাব বিতরণ কোম্পানিগুলো দিয়েছে তা অবৈধ। এর কারণ, এলএনজি আপুস্ট্রিম (উৎস) গ্যাস। এর মূল্য নির্ধারণ কররে সরকারের জ্বালানি বিভাগ। এটি এখনো তারা করেনি। পেট্রোবাংলা বিতরণ কোম্পানিগুলোকে এলএনজির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, যার ভিত্তিতে তারা মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে, যা অবৈধ। এটি করে সরকারকে মানুষের সামনে তারা হেয় করেছে।
এ সময় কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য মিজানুর রহমান, মাহমদুউল হক ভুইয়া, রহমান মুশেদ, আবদুল আজিজ খান উপস্থিত ছিলেন।