খাদ্য নিরাপত্তায় ধান-চাল সংগ্রহের গুরুত্ব

সংগৃহীত ছবি

মুক্তমত

খাদ্য নিরাপত্তায় ধান-চাল সংগ্রহের গুরুত্ব

  • আবদুল হাই রঞ্জু
  • প্রকাশিত ২০ মে, ২০২১

গত ২৬ এপ্রিল চলতি অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ কর্মসূচি উপলক্ষে ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, এ বছর কৃষক বাঁচাতে বাড়তি দামে ধান ও চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত বছর প্রতি কেজি ধানের দাম ছিল ২৬ টাকা, সেখানে এক টাকা বৃদ্ধি করে এবার প্রতি কেজি ধান ২৭ টাকা দরে সাড়ে ৬ লাখ টন ধান সরাসরি কৃষকদের নিকট থেকে কেনা শুরু করেছে খাদ্য বিভাগ। গত বছর প্রতি কেজি চালের মূল্য ছিল ৩৭ টাকা, সেখানে এবার প্রতি কেজিতে ৩ টাকা বৃদ্ধি করে ৪০ টাকা কেজি দরে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও ৩৯ টাকা কেজি দরে দেড় লাখ টন আতপ কিনবে সরকার। ইতোমধ্যে ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উল্লেখ্য, গত বোরো ও আমন মৌসুমে ধান চালের দাম বেশি থাকায় সরকার অভ্যন্তরীণভাবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান ও চাল সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে দেশীয় চাহিদা পূরণ করতে গত আমন মৌসুমের শেষ ভাগে এসে সরকার সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি শুরু করে। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেশি থাকায় আশানুরূপ চাল আমদানি করতে পারেনি। যে কারণে অতীতের যে-কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্যশস্যের মজুত সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত সরকারের খাদ্যগুদামে চালের মজুত ছিল ৪ লাখ ১২ হাজার টন, আর গমের মজুত ছিল মাত্র ৭১ হাজার টন। খাদ্যশস্যের এ মজুত একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। জাতিসংঘের বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, যে-কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অন্তত মোট জনগোষ্ঠীর ৬০ দিনের খাদ্য মজুত রাখতে হয়। সে হিসেবে, আমাদের এক দিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় ৪৬ হাজার টন, ফলে আমাদের জন্য ৬০ দিনের খাদ্য মজুতের দরকার প্রায় ২৭ লক্ষ টন। কোনোদিনই বিশাল এ পরিমাণ খাদ্য মজুত আমাদের ছিল না। আর এত খাদ্য মজুত উপযোগী খাদ্য গুদামও আমাদের নেই। সর্বসাকুল্যে ২০-২২ লাখ টন খাদ্য মজুত ধারণ ক্ষমতার খাদ্য গুদাম আমাদের রয়েছে। এর মধ্যে নতুন, পুরাতন বস্তা মজুতের জন্য গুদামের প্রয়োজন হয়। এসব চাহিদার জায়গা বাদ দিয়ে ১৮ থেকে ২০ লাখ টনের বেশি খাদ্য মজুত রাখা সম্ভব হয় না। আর সরকার আদৌ এত পরিমাণ চাল ও গম মজুত রাখে না। সর্বসাকুল্যে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টন পর্যন্ত খাদ্যশস্য মজুত রাখে সরকার। যেমন গত বছর ৩১ মার্চ সরকারি খাদ্যগুদামে খাদ্য মজুত ছিল ১২ লাখ টনের কিছু কম। কিন্তু এ বছর সরকারের সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে খাদ্যশস্যের মজুত তলানিতে চলে আসে। ফলে ভোক্তার কষ্ট অনেক বেড়ে যায়। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষদের মোটা চাল ৫০ টাকা কেজিতে কিনে খেতে হয়েছে।

যদিও সরকার সাধারণ ভোক্তার স্বার্থে চাল, আটার দাম বাড়লে খোলাবাজারে স্বল্পমূল্যে চাল, আটা বিক্রি করে থাকে; কিন্তু সরকারি মজুত কম থাকায় সে কার্যক্রমও এবার ভালোভাবে চালাতে পারেনি। তবে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীদের মধ্যে ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ স্বল্প আয়ের সব মানুষ তো আর এ চাল পান না। মোদ্দাকথা, সরকারি গুদামে নিরাপদ খাদ্য মজুত না থাকলে সরকারের পক্ষে সামাজিক নিরাপত্তার নানা কর্মসূচিও চালু রাখা সম্ভব হয় না। ফলে ব্যবসায়ীদের কারসাজি বাড়ে, পরিণামে ভোক্তার কষ্টও বাড়ে; যদিও দেশে উৎপাদিত খাদ্যশস্যের মধ্যে অতি যৎসামান্যই সরকার মজুত করে রাখে। আর বাকি ধান, চাল চাষি ও ব্যবসায়ী পর্যায়েই মজুত থাকে। যেখানে বছরে মোট চালের উৎপাদন হয়, প্রায় পৌনে চার কোটি টন, সেখানে সরকার সর্বোচ্চ চালের মজুত রাখে ১২-১৩ লাখ টন। এরপরও সরকারের খাদ্য মজুত সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো কারণে সরকারের খাদ্য মজুত কমে আসে, তাহলে ভোক্তাবান্ধব বাজার ব্যবস্থা ধরে রাখা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

মূলত সরকারের খাদ্যশস্য মজুতবিমুখ অদূরদর্শিতার শুরু গত বছরের বোরো মৌসুম থেকেই। ওই বছর সরকার ১০ লাখ টন চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের উদ্যোগ নিলেও বাজারে ধান চালের দাম বেশি থাকায় শেষ পর্যন্ত ৬ লাখ ৮০ হাজার টন চাল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম পুরোপুরি সফল হয়নি। আবার চাল আমদানিতে ৬২ দশমিক পঞ্চাশ শতাংশ শুল্ক আরোপ থাকায় চাল আমদানি হয়েছে মাত্র ৪ হাজার টনের মতো। অর্থাৎ আমদানিও হয়নি, আবার অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহও সফল হয়নি। সব মিলে খাদ্যশস্যের মজুত কমতে শুরু করে। সরকার খাদ্যশস্যের মজুত বাড়াতে গত আমন সংগ্রহ মৌসুমে প্রায় ৮ লাখ টন সিদ্ধ ও ৫০ হাজার টন আতপ চাল অভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ধান চালের বাড়তি দামের কারণে চাল কল মালিকদের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ চাল কল মালিক খাদ্য বিভাগের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। শেষ পর্যন্ত চুক্তিবদ্ধ চাল কল মালিকদের সবাই বাড়তি মূল্যের কারণে সরকারকে চাল দিতে পারেনি। ফলে খাদ্যশস্যের কাঙ্ক্ষিত মজুতও গড়ে ওঠেনি। ফলে চালের বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাধ্য হয়ে সরকার নড়েচড়ে বসে এবং ঝড়ের বেগে সরকারি-বেসরকারিভাবে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়। চাল আমদানির শুল্ক ৬২ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে দুই দফায় কমিয়ে এনে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করেও কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ চাল আমদানি করতে পারেনি।

তবে আমন মৌসুমের শুরুতে সরকার বেসরকারি পর্যায়ে এবং জিটুজি পদ্ধতিতে চাল আমদানির উদ্যোগ নিলে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ চাল মজুত করা সম্ভব ছিল। বাস্তবে আমাদের দেশের ক্ষমতাসীনরা সঠিক সময়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে চান না। কথায় আছে-সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। অর্থাৎ সময়ের কাজ সময়েই করতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে এর বিরূপ প্রভাবে ভোক্তার কষ্টও বাড়বে, আবার সরকারকেও বিব্রত হতে হয়। তবে বোরো ধান ইতোমধ্যে কাটা-মাড়া শেষ পর্যায়ে। বাজারে নতুন ধান ওঠায় চালের বাজারও কমতে শুরু করেছে।

স্বস্তির খবর হচ্ছে, গত টানা দুবছর কৃষক ধানের বাড়তি মূল্য পাওয়ায় ধান চাষে আগ্রহ বেড়েছে। এ বছর ব্যাপকভাবে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। আবাদের অবস্থাও ভালো ছিল। শেষ পর্যন্ত বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে। ইতোমধ্যে ধান কাটা-মাড়া নিয়ে কৃষক মহা ব্যস্ত। ভয় হয়, এই সময়ে শিলাবৃষ্টি ও আগাম বন্যার। বাড়তি বৃষ্টি ও আগাম বন্যা হলেই বিপদ। ভাগ্য ভালো এ বছর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি। ফলে অধিকাংশ জমির ধান কেটে কৃষক ঘরে তুলতে পেরেছে। আবার নির্বিঘ্নে ধান কাটতে সরকার যান্ত্রিকভাবে সহায়তা করায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ হয়েছে। শুধু হাওরেই নয়, দেশের অনেক নিম্নাঞ্চলে ধান কাটামাড়াইও শেষ। তবে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এ বছর সরকারকে অভ্যন্তরীণ ধান চাল সংগ্রহকে সফল করে তুলতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য ছোট-বড় সকল চালকলকে চুক্তির আওতায় আনার প্রয়োজন ছিল। অবশ্য সরকার এ বছর সকল ছোট-বড় চাল কলকে চুক্তির আওতায় আনতে সক্ষমও হয়েছে। আমরা মনে করি, অভ্যন্তরীণ চাল সংগ্রহকে সফল করে সরকারকে নিরাপদ খাদ্য মজুত গড়ে তুলতে হবে।

বাস্তবতা হচ্ছে, নিরাপদ খাদ্য মজুত গড়ে তুলতে দেশে খাদ্যগুদামের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা উচিত। যদিও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে দুই মেয়াদে প্রায় ১২/১৩ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত উপযোগী খাদ্য গুদাম নির্মাণ করেছে। আবার পুরাতন খাদ্য গুদামগুলোও সংস্কার করা হয়েছে। তবুও জনসংখ্যার তুলনায় যে পরিমাণ খাদ্যশস্য সরকারিভাবে মজুত রাখার প্রয়োজন, সে পরিমাণ খাদ্যগুদামের এখনো যথেষ্ট অভাব রয়েই গেছে। যদিও সরকার খাদ্য মজুতের বিষয়টি মাথায় রেখে সাইলো নির্মাণের উদ্যোগও নিয়েছে। আমরা মনে করি, খাদ্যশস্য মজুত উপযোগী খাদ্যগুদাম নির্মাণে সরকারকে গোটা দেশেই, বিশেষ করে উত্তারাঞ্চলে আরো বেশি নতুন নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণের জন্য প্রকল্প হাতে নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব তা বাস্তবায়ন করা উচিত। কারণ সরকারের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহের সিংহভাগই সংগ্রহ হয় উত্তরাঞ্চল থেকে। সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে উত্তরাঞ্চলকে এখন খাদ্যভান্ডার বলা হয়। অথচ এই উত্তরাঞ্চলে সাইলোসহ বড় বড় খাদ্য গুদাম থাকার কথা থাকলেও তা নেই। ফলে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ মৌসুমে অনেক সময়ই খাদ্য গুদামে স্থান সংকুলানের অভাবে ধান, চাল, গম, সংগ্রহ বাধাগ্রস্ত হয়। সঙ্গত কারণে খাদ্যশস্য সংরক্ষণ উপযোগী আরো খাদ্য গুদাম নির্মাণ করে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে নিরাপদ খাদ্য মজুতের পথকে মসৃণ করতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই।

 

লেখক : সমাজকর্মী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads