কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন রূপ নিল মৃত্যুতে

ছবি: বাংলাদেশের খবর

সারা দেশ

কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন রূপ নিল মৃত্যুতে

  • রিফাত আহমেদ রাসেল, দুর্গাপুর (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ২ সেপ্টেম্বর, ২০২০

অল্প দিনেই কোটিপতি হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন মুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ হয়ে রূপ নিল মৃত্যুপুরীতে। লোভের বশবর্তী হয়েই নেত্রকোনা দুর্গাপুরে প্রাণ হারিয়েছেন অটোরিকশার মেকানিক সবুজ মিয়া।

বড় ভাই কাঞ্চন নিয়ার কথা রাখতে গিয়ে গত রোববার (৩০ আগস্ট) দুর্গাপুরের শিবগঞ্জে একটি ভাঙ্গারীর দোকানে মর্টার শেল বিস্ফোরণে প্রাণ হারায় সবুজ মিয়া (৩৫)।

এ ঘটনায় আহত হয় দোকানের মালিক কাঞ্চন মিয়ার ছেলে নাহিদ মিয়াও। নাহিদকে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ এবং পরে ঢাকার বার্ন ইউনিটে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।

বিস্ফোরণের পর থেকেই পুরো এলাকা জুড়ে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি হয় । এমনকি বিস্ফোরণের শব্দ প্রায় ৫ কিলোমিটার দূর থেকেও শুনতে পান স্থানীয়রা। শব্দের সূত্র ধরেই ওই দিন রাতেই যে যার মতো করে ঘটনাস্থলে ভিড় জমায়।

শক্তিশালী বিস্ফোরণে ভাঙ্গারি দোকানের স্টিলের শাটার, টিন প্রায়ই ২০/২৫ ফুট দূরে উড়ে গিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। শুধু ভাঙ্গারির দোকানেই না বিস্ফোরণে পাশে থাকা পশুখাদ্যের দোকান ও একটি বসত বাড়ির সীমানা ওয়াল ভেঙে যায়।

এদিকে ঘটনার পর থেকেই পুরো এলাকা থেকেই নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা। বিস্ফোরণের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে জেলা পুলিশ সুপার আকবর আলী মুন্সির নেতৃত্বে পুলিশ, সিআইডি, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট, বোম ডিসপোজাল ইউনিট, র‌্যাব ১৪ সহ একাধিক সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত পরিচালনা করে।

শুরুতে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে ভাঙ্গারির দোকান থাকা ব্যাটারিগুলোকেই দায়ী করছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু বিস্ফোরণের প্রায় দুদিন পর স্থানীয়দের ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ মর্টার শেল বলে নিশ্চিত করেন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা ।

বিস্ফোরিত বস্তুটির অংশবিশেষ সংগ্রহের পর বিস্ফোরিত বস্তুটি মর্টার শেল বলে নিশ্চিত হয় তারা। আর পুরো দোকানটিতে একটি মাত্র মর্টার শেলের উপস্থিতি ছিল বলে জানান বোম ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা।

সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ময়মনসিংহ পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ। এর আগে, জেলা প্রশাসক কাজী মো: আব্দুল রহমান সহ স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনাস্থলটি পরিদর্শন করেন ।

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাঞ্চন মিয়া দীর্ঘদিন ধরেই পুরাতন জিনিসপত্র কেনা বেচার ব্যবসা করে আসছিলেন। এবং তার ভাই সবুজ মিয়া ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা মেরামতের কাজ করতেন। গত কয়েকদিন আগে পাশের একটি গ্রামের ভাঙ্গারীর দোকান থেকে প্রায় দুই টন পুরাতন জিনিসপত্র কিনে আনেন কাঞ্চন।

ওই সময় ওই জিনিসপত্রের সাথেই ২৫ টাকা কেজি দরে ১০ থেকে ১২ কেজি ওজনের দরে মর্টার শেল টিকি নেন তিনি। মর্টার শেলটিকে মূলত সীমানা পিলার ভেবে অল্প দিনেই কোটিপতি হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন কাঞ্চন মিয়া। বস্তুটির ভিতরে কি আছে এটি দেখতেই গত রোববার রাতে ছোট ভাই সবুজ মিয়াকে তার দোকানে ডেকে আনেন তিনি।

ভাইয়ের কথা মেনে পাশের আরেকটি দোকান থেকে বড় হাতুরি ও শাবল দিয়ে বস্তুটিকে খোলার চেষ্টা শুরু করেন সবুজ। এ সময় দোকানের বাহিরে পাহারা দিচ্ছিলেন কাঞ্চন মিয়া। সবুজ মিয়া মর্টার শেলটির গায়ে আঘাত করা মাত্রই বিকট শব্দে এটির বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের পর ভাইয়ের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ ও ছেলেকে আহত অবস্থায় দেখে ভয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান কাঞ্চন মিয়া। পরে স্থানীয় আরও কয়েকজনের সহায়তায় তিনি নিজেই থানায় এসে পুলিশের কাছে ধরা দেন।

মর্টার শেলটি দীর্ঘদিনের পুরনো বলে মনে করছেন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও বোম ডিসপোজাল ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাখাওয়াত আলম। তিনি জানান, বিস্ফোরিত বস্তুটি একটি পুরাতন মর্টার শেল। এটি আনুমানিক ১০ থেকে ১২ কেজির ২৬ ইঞ্চি লম্বা এবং ১২০ মিলি মিটারের মতো হবে। অবিস্ফোরিত অবস্থায় দীর্ঘদিন এটি মাটির নিচেই ছিল। তবে পরিপূর্ণ ভাবে এটি কত বছর আগের তা ল্যাবে পরীক্ষার পরই জানা যাবে ।

এই দিকে এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. আকবর আলী মুনসী জানান, দোকান মালিক কাঞ্চন মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় তিনি এটিকে কেজি হিসেবে কিনেছে বলে জানিয়েছেন। কাঞ্চন মিয়ার কাছে যিনি বিক্রি করেছিলেন তাকেও খুঁজছি। তাকে পেলে হয়তো জানা যাবে কোথায় থেকে তিনি এটি সংগ্রহ করেছিলেন। তবে এটি অনেক পুরনো মর্টারশেল। হয়তো যুদ্ধকালীন সময়ে এই সীমানা উপজেলায় পড়েছিলো। আর এটিই কুড়িয়ে পেয়ে পিলারের অংশ ভেবেই হয়তো বিক্রি করেছে। এটি কোন অপরাধজনিত ঘটনা নয় যে এটি পরিস্কার বুঝা যাচ্ছে। তারপরও আমদের নজরদারি থাকবে। কোন সীমানা থেকে কিভাবে পেয়েছিল এটিকে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads