অপরাধ

কিশোরদের অপরাধে উদ্বুদ্ধ করছে সিনেমা-সিরিজ

পারিবারিক শিক্ষা ও সুষ্ঠু বিনোদন প্রয়োজন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

পারফেক্ট মার্ডার তথা নিখুঁত হত্যার পরিকল্পনা, ফোন করে চাঁদা আদায়ের অভিনব পন্থা থেকে শুরু করে ব্যাংক ডাকাতি-এসব এখন চলচ্চিত্র ও সিরিজের অন্যতম গল্প। এসব ছবিতে যারা মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে তারা যদি প্রিয় তারকা হয় তাহলে তা আরো বেশি করে দর্শক টানতে পারে। তাতে নির্মাতাদের লাভের অঙ্ক বেশ ভালো হলেও সমাজে তা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ভয়াবহ বিষয় হলো-এসব দেখে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত হয়ে পড়ছে এক  শ্রেণির দর্শক। এই শ্রেণিতে কিশোরের সংখ্যাই বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কারণে বেশ কিছু কিশোরকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের বেশিরভাগই অপরাধমূলক ছবি, ক্রাইম প্যাট্রল দেখে এসব কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। অপরাধজগৎ নিয়ে তৈরি টিভি সিরিজ ও ক্রাইম-অ্যাকশন-অ্যাডভেঞ্চার ঘরানার কিছু কিছু সিনেমা দেখলে মনে হয় সেগুলো একেকটা মগজধোলাইয়ের কারখানায়। এসব সিনেমা বা সিরিয়ালের প্রধান চরিত্রে থাকা জনপ্রিয় তারকা যদি অপরাধীর ভূমিকায় থাকে, তাতে আরো বেশি প্ররোচিত হচ্ছে একশ্রেণির দর্শক। পর্দার দৃশ্যগুলো বাস্তবতাবর্জিত হলেও প্রিয় তারকার কাছ থেকে আইডিয়া নিতে বাছবিচার করছে না তারা। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে এই কিশোররাই। এজন্য পরিবার থেকেই সচেতন করতে হবে তাদের।

সম্প্রতি ঢাকা ও বগুড়ায় দুটি দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটিয়েছে ১৬ ও ১৭ বছরের দুই কিশোর। এ ছাড়া চাঞ্চল্যকর কয়েকটি হত্যার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য। বগুড়ার গাবতলীর একটি ব্যাংক-ডাকাতির দুর্বৃত্তদের খুঁজতে গিয়ে পুলিশ আটক করেছে এক কিশোরকে। সে  বলিউডের ধুম-৩ সিনেমাটি ১৫৪ বার দেখে নিজেকে ডাকাতির জন্য প্রস্তুত করেছিল। মুখোশ পরে দুই নিরাপত্তারক্ষীকে আহত করে রূপালী ব্যাংকের একটি শাখার ভেতর ঢুকে পড়ে ওই এসএসসি পরীক্ষার্থী। প্রথমে দাহ্য পদার্থ ছোড়ে, তারপর ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে দুই আনসার সদস্যকে। ছাদের সিঁড়িঘরের তালা কেটে ভেতরে ঢুকলেও ব্যাংকের ভল্ট ভাঙতে ব্যর্থ হয়।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, ছেলেটি এই বয়সে যে অপরাধের পরিকল্পনা করেছে  তা চমকে যাওয়ার মতো। একজন পেশাদার অপরাধীর মতোই ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল সে। সিনেমা দেখে এবং ডার্ক ওয়েবের জগতে ঘোরাফেরা করেই এমন অপরাধ করার সাহস দেখায় সে। প্রায় ২০ দিন চেষ্টার পর তাকে গ্রেপ্তার করি।

ভারতীয় সন্ত্রাসী পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তির গাড়িতে নকল বোমা রেখে ২০ লাখ টাকা চেয়ে হুমকি দেয় মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের এক কিশোর। গ্রেপ্তারের পর স্বীকার করেছে, সিনেমা দেখে তার মাথায় এ ধারণা আসে। হিন্দিও শিখেছে সময় নিয়ে। হুমকি দেওয়ার ভাষা রপ্ত করতে সময় নিয়েছে তিন মাস। প্রথমেই টার্গেট হিসেবে বেছে নেয় রাজধানীর গুলশানে থাকা বাবার অফিসের বসকে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, কিশোরটি হিন্দি সিনেমা, সিরিয়াল, ইউটিউব দেখে নকল বোমা বানানো থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী পরিচয়ে হুমকি-ধমকি দেওয়ার সব কৌশল রপ্ত করে। 

সম্প্রতি রাজধানীতে বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদা দাবি করার মতো ঘটনা ঘটছে। যদিও বর্তমানে দেশে শীর্ষ সন্ত্রাসী বলে আলাদা কোনো শ্রেণি নেই। কেউ যদি এমন ঘটনার শিকার হন তাদের উচিত দ্রুত পুলিশকে জানানো। মহানগর ডিবি পুলিশের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, এ ধরনের কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রথমে পরিবারকেই এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে তারা হুমকি হয়ে উঠবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চার করার সুযোগ তারা পাবে না।

সাতক্ষীরার কলারোয়াতে ভারতীয় টিভি সিরিয়াল ক্রাইম প্যাট্রল দেখে নিজের ভাই, ভাবিসহ পরিবারের চারজনকে খুন করেন এক ব্যক্তি। কোমল পানীয়র সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অচেতন অবস্থায় চাপাতি দিয়ে তাদের হত্যা করেন তিনি। খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, কিছু টিভি শো খুনকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে মনে হবে ওটা খুব সহজ ও স্বাভাবিক ঘটনা। সেসব দেখে এক শ্রেণির মানুষের ভয় কেটে যাচ্ছে। তারা বুঝতেও পারছেন না, কত বড় অপরাধ করে ফেলছেন। আমরা ইদানীং এমন অনেক ঘটনা জানতে পারছি, যার কৌশলের নেপথ্যে রয়েছে সিনেমা বা টিভি শো। এমন অনুষ্ঠান প্রচার প্রকাশ থেকেও বিরত থাকা উচিত। শিশু-কিশোরদের জন্য পারিবারিক সচেতনতা প্রয়োজন। তারা কী দেখবে, কী দেখবে না সেটা ঠিক করে দেওয়া প্রয়োজন।

কিশোরদের এ ধরনের অপরাধে উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়া সম্পর্কে জানতে চাইলে এভারকেয়ার হাসপাতালের মনস্তত্ত্ববিদ তারানা আনিস বলেন, কিশোর বয়সে মনে নানান অ্যাডভেঞ্চার কাজ করে। এ বয়সে তারা নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। কৌতূহলের বশে নতুন কিছু জানতে ও করতে চায়। এমনো হচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা শিক্ষামূলক কোনো কনটেন্ট সার্চ করছিল, কিন্তু পাশে নিষিদ্ধ কনটেন্টও চলে আসছে। অপরাধে প্ররোচিত করে এমন ভিডিও, টিভি শো, সিনেমা চলে আসছে। তখন তারা ওটার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করছে। এটা বয়সের কারণেই হয়। তাই বয়সভিত্তিক স্টোরি ফিল্টারিং জরুরি। সঙ্গে পরিবারকেও খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়াও মা-বাবার অযত্ন ও অবহেলা, উদাসীনতা, সুষ্ঠু বিনোদনের সংকট, মাদকসেবন, খারাপ সঙ্গসহ আরো অনেক কারণেই কিশোররা অপরাধী হয়ে উঠছে।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করে। যারা মানুষ খুন করে বা বড় অপরাধ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়, তাদের মধ্যে এক ধরনের হিরোইজম কাজ করে। তারা নিজের শক্তি, সাহস, ক্ষমতা দেখিয়ে অন্যদের মনে ভয় ছড়াতে চায়, নজর কাড়তে চায়। এসব বন্ধে পারিবারিক শিক্ষা সুষ্ঠু বিনোদনের প্রয়োজন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads