কারাগারে বসেই পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে ১৫ সদস্যের ভয়ংকর টিম। একেক জনের ১০/১২ বছরের অভিজ্ঞতা। কে কোন কাজ করবে তারও দায়িত্ব বণ্টন। এরপর সে অনুযায়ী কাজ। বলছি রাজধানীতে ভয়ংকর এক ডাকাতচক্রের কথা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে রাজধানী ও বাইরে ভয়ংকর এক ডাকাতচক্র একের পর এক ডাকাতি করলেও নিত্যনতুন কৌশলে থেকেছে আড়ালে। অবশেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও টিম এই টিমের ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেপ্তারের সময় বিদেশি পিস্তল, গুলি, ডিবির জ্যাকেট, ওয়াকিটকিসহ ডাকাতি কাজে ব্যবহূত বিপুল পরিমাণ মালামাল জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ব্যাংক ডাকাতি থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি, স্বর্ণের দোকানে ডাকাতি, রাস্তায় বেড়িকেড দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে ডাকাতি সবই করত এই গ্রুপ। নিখুঁত পরিকল্পনায় করা ডাকাতির ঘটনায় তারাও থাকত আড়ালে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রটি জানায়, প্রায় এক যুগ আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে ডাকাতির চিন্তা প্রথম আসে শহিদ মাঝি নামের এক ডাকাতের। সেই এই লাইনে অধ্যাত্মিক গুরু নামেও পরিচিত। একাধিকবার গ্রেপ্তার এই শহিদ মাঝি এখনো আন্ডারগ্রাউন্ডে। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ডিবি।
হেলাল হোসেন ওরফে এসি রানা, শহিদ মাঝির যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে পরিচিত। একটি বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত রানা ডাকাতির সময় নিজেকে এসি হিসেবে পরিচয় দেয়। এ কারণে তার নাম হয়ে উঠে এসি রানা। হুন্ডির টাকা, স্বর্ণ ডাকাতির মাস্টার মাইন্ড সে। একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও বর্তমানে সেও পলাতক। তাকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আপেল হাজি বর্তমানে ডিবির হাতে গ্রেপ্তার। অন্তত ১৪টি মামলার আসামি। শহিদ মাঝি, এসি রানার সমন্বয় হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে ১৫ জনের এই টিমের প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করে সে।
জাহাঙ্গীর আলম ভয়ংকর এই টিমের অপারেশন কমান্ডার। এই চক্রসহ ডাকাতির অন্তত ৫টি চক্রের লোকবল জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত। ডাকাতি করতে যাওয়ার সময় যদি লোকের দরকার হতো তখন জাহাঙ্গীরই সেই সকল গ্রুপের জনবল জোগান দিতো।
গ্রেপ্তারকৃত মজিবুর এই টিমের অস্ত্র জোগানদাতা। পাশাপাশি ডাকাতির মালামাল বিক্রির সমন্বয়ক। বিভিন্ন স্থানে করা ডাকাতির মালামাল যেমন স্বর্ণ সে বিক্রি করে টাকা সবার মাঝে বণ্টন করত। সে কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেছে।
এ গ্রুপের মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত জমির খান অস্ত্রধারী। যখন গুলি করার প্রয়োজন হতো জমির খান গুলি করত। মাসুম গাজি, ডাকাতির কাজে ব্যবহূত হাইসের গাড়ি চালক। সে ডাকাতির জন্য সুবিধাজনক স্থান খোঁজে বেড়াতো। পরবর্তীতে সে এই তথ্য গ্রুপে সরবরাহ করত। কুদ্দুস আলী ডাকাতির আগ পর্যন্ত অস্ত্রভাড়া, সুবিধাজনক স্থান খোঁজা এবং ডাকাতির দিনের খরচ সে জোগাতো। এ কারণে গ্রুপের অর্থদাতা হিসেবে পরিচিত সে। কাউসার মিয়া পাহারাদার ও শফিকুল খরাদি এরা ডাকাতির স্থানের পাহারাদার হিসেবে থাকত। ডাকাতির স্থানে পুলিশ বা অন্য কোনো ব্যক্তি আসছে কি-না তা তদারকি করত।
জানা যায়, জামিনে থাকা ও কারাগারে থাকা এই গ্রুপের অধ্যাত্মিক নেতা শহিদ মাঝি, এসি রানা ও আপেল হাজির মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে আপেল হাজি ডাকাতির পরিকল্পনা করে। বাস্তবায়ন শেষে আড়ালে থাকার কৌশলও ঠিক করা হয়। পরে আপেল হাজিও যোগ দিতে রাজি হয়। জামিনে বেরুনোর পর টিম গোছানোর দায়িত্ব দেওয়া হয় মজিবরকে। এইভাবে পুরো টিম গঠন করা হয়। অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনায় একের পর এক ডাকাতি সংঘটিত করে এই গ্রুপ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অত্যন্ত ৩০/৪০টি ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে জড়িত এ চক্র। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তারও হয়েছে এরা। তবে এবারই প্রথম সংঘবদ্ধভাবে একটি গ্রুপের হয়ে একসঙ্গে তারা আটজন গ্রেপ্তার হয়।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (তেজগাঁও বিভাগ) ওয়াহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, যে গ্রুপকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এরাই ডাকাতি করা গ্রুপের অন্যতম ও ভয়ংকর। কারাগারে বসে অত্যন্ত প্রশিক্ষিত একটি গ্রুপ করে বেশকিছু দিন ধরে ডাকাতি করত।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে ডাকাতি করা এই গ্রুপের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড হলো শহিদ মাঝি ও সোহেল রানা ওরফে এসি রানা। এরা দুজন পলাতক। পরবর্তীতে তারা জামিনে বেরিয়ে এসে ১৫ জনের একটি গ্রুপ করে।
তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকা ছাড়াও আশুলিয়া, সাভার, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী এমনকি হবিগঞ্জ পর্যন্ত এই গ্রুপটির বিস্তৃতি ছিল। ব্যাংক ডাকাতির পাশাপাশি স্বর্ণের দোকান ও বাসে ডাকাতি করত তারা। ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, এদের পেশাই হলো ডাকাতি করা। এদের সবার বিরুদ্ধে ১০ থেকে ১২ টি করে মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়ার পর গ্রুপের সদস্যরাই টাকা দিয়ে জামিন করে। জামিন করানোর পর আবারো ডাকাতিতে লিপ্ত হয়।
ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, এ গ্রুপের আরো দুজন মাস্টারমাইন্ড গ্রেপ্তারের বাইরে রয়েছে। এ দুজনকে গ্রেপ্তার করলে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটিত হবে। তাদেরকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।





