জাতীয়

কারচুপিতে ঠকছেন ক্রেতা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৮ মার্চ, ২০২১

স্বর্ণ থেকে শুরু করে ফুটপাতের ভাসমান দোকান, সবখানেই চলছে ওজনে কারচুপি। এতে প্রতিনিয়ত ঠকছেন ক্রেতারা। ওজন মাপক যন্ত্রে কারচুপি করে ঠকানো হচ্ছে ক্রেতাদের। নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) থেকে ভেরিফিকেশন সনদ ছাড়া ওজনযন্ত্র ব্যবহার অবৈধ হলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ী তা মানছেন না। ওজন কারচুপির বিরুদ্ধে বিএসটিআই ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচলনা করলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৯ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ওজন কারচুপি বন্ধে দেশের বাজারগুলোতে ‘ওজনবন্ধু’ সেবা চালুর ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তা আলোর মুখ দেখেনি। এদিকে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়া ওজন পরিমাপক বাটখারা (ওজন পরিমাপক ঢালাই লোহা) তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও এই নিয়মও মানা হচ্ছে না। কেরানীগঞ্জ, টিপু সুলতান রোড, শ্যামপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করা হচ্ছে বাটখারা।

আবার স্বর্ণের দোকানে ভরির ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও দেশের অধিকাংশ স্বর্ণের দোকানে এখনো দাড়িপাল্লায় বাটখারা দিয়ে ভরির মাপে সোনা বেচাকেনা চলছে।

এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাশিদা আক্তার জানান, স্বর্ণ কেনাবেচায় গ্রামের ব্যবহার করতে হবে। ভরির মাপে স্বর্ণ বেচাকেনা আইনত নিষিদ্ধ। তারপরও অনেক স্বর্ণ ব্যবসায়ী এ নিয়ম মানছেন না। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বিএসটিআই কর্তৃক ভেরিফিকেশন সনদ ছাড়া যে কোনো ধরনের ওজনযন্ত্র ব্যবহারও নিষিদ্ধ। সনদ ছাড়া ওজন যন্ত্র ব্যবহার করলে ‘ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন ২০১৮’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে।

গতকাল সোমবার এই অপরাধে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ২টি ফলের দোকানসহ ৩টি দোকানকে আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জরিমানা করাটা আমাদের আসল উদ্দেশ্য না। আমাদের লক্ষ্য সবাই যেন নিয়মের মধ্যে থেকে চলেন। তিনি বলেন, ওই বাজারের সকল দোকানদারকে ডিজিটাল মিটার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ওইসব মিটার বিএসটিআই থেকে ভেরিফিকেশন করতে বলা হয়েছে।

তবে বিএসটিআই কর্তৃক ডিজিটাল মিটার ভেরিফিকেশন করার পরও ওইসব মিটারে কারচুপি করা যায় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসটিআই-এর একজন পরিদর্শকও (মেট্রোলজি) স্বীকার করেন, বিএসটিআই থেকে সনদ নেওয়ার পরও কারচুপি করা সম্ভব। তিনি বলেন, অসৎ ব্যবসায়ীরা মিটারের ক্যালিব্রেশন অপশনে গিয়ে ম্যানুপুলেট করে কারচুপি করে থাকে।

এদিকে প্রতিনিয়ত বাজার করতে গিয়ে মাপে কম পাওয়ায় ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। মিরপুর ১ নম্বরের বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন বলেন, বাজার থেকে মাছ, মাংস, সবজি যাই কিনি না কেন প্রায়ই সেগুলোতে ওজনে কম থাকে। এক দোকান থেকে পণ্য কিনে অন্য কোথায় পরিমাপ করলে ওজনে কম-বেশি হয়। তিনি বলেন, বিএসটিআই ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা উচিত। তা না হলে ক্রেতারা ওজনে ঠকতেই থাকবে।

এদিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও ওজনে কম দেওয়া অত্যন্ত ঘৃনিত ও বড় ধরনের অপরাধ বলে মনে করেন ইসলামি চিন্তাবিদরা। এ বিষয়ে রাজধানীর বঙ্গভবন মসজিদের পেশ ইমাম মো: জিয়াউর রহমান বলেন, ওজনে কম দেওয়া কবিরা গুনাহ। এটা হারাম। ওজনে কম দিয়ে অর্জিত সম্পদ দিয়ে গঠিত শরীর জাহান্নামের আগুনে পুড়বে। তিনি আরো বলেন, ওজনে কম দেওয়ার কারণে অতীতে মাদইয়ান নামে একটি জাতিকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

স্বর্ণের দোকান, পেট্রোল পাম্প, ভোজ্য তেল, রড-সিমেন্ট, কনজ্যুমার আইটেম, এমনকি নামি-দামি প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত পণ্যেও ওজন কম দেওয়ার অভিযোগ আছে। এছাড়া পাড়া-মহল্লার দোকান কিংবা ফুটপাতে ভাসমান দোকানগুলোতে ব্যবহূত ওজন মাপকযন্ত্রেও কারচুপি হচ্ছে। বিশেষ করে মুরগি ও মাংসের দোকানগুলোতে ওজনে কম দেওয়াটা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। ওজন কম দেওয়ার অভিযোগ আছে দেশের স্বনামধন্য রিটেইল শপগুলোর বিরুদ্ধেও। ওজন কম দেওয়ার অপরাধে চট্টগ্রামের ষোলশহরে মিনা বাজারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

গত শুক্রবার ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের দুটি পেট্রোল পাম্পকে ওজনে কম দেওয়ার অপরাধে একলাখ টাকা জরিমানা করে বিএসটিআই।

কাঁচাবাজারগুলোতে ক্রেতাদের ওজন কম দেওয়া রোধে ২০১৮ সালের শেষ দিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর  ‘ওজন বন্ধু’ নামে একটি প্রকল্প শুরুর ঘোষণা দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রাজধানীর ১০ টি বাজারের প্রবেশমুখে উন্নতমানের ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তৎকালীন উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, প্রথমে রাজধানীর দশটি বাজারে এসব পরিমাপ যন্ত্র বসানো হবে। পরে সারা দেশের বাজারগুলোতে বসানো হবে এসব যন্ত্র। বাজার কমিটির সাথে সরকার যৌথভাবে এ কাজ করবে। প্রাথমিকভাবে ভোক্তা অধিকারের জনবল দিয়ে এসব যন্ত্র পরিচালনার করা হবে। পরে তা হস্তান্তর করা হবে বাজার কমিটির কাছে।

তবে ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে এ বিষয়টি আর আলোর মুখ দেখেনি। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, এ ধরনের কোনো যন্ত্র বাজারগুলোতে বসানো হয়নি। বসানো হলে অব্যশই আমরা জানতে পারতাম।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাবুল কুমার সাহার মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন না ধরায় কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (কার্যক্রম উপ-বিভাগ) আফরোজা রহমানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি একটি অনুষ্ঠানে ব্যস্ত আছেন বলে এড়িয়ে যান।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads