পণ্যবাজার

কারওয়ান বাজারে বিদায়ের সুর

  • প্রকাশিত ২৯ মার্চ, ২০২৪

রহমত আলী খন্দকার:

প্রায় ১৮ বছর পর ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় থাকা কারওরান বাজার স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গতকাল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অফিস স্থানান্তরের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঈদের পর ডিএনসিসির এই ভবন ভেঙে ফেলা হবে। এরপর অন্যান্য দোকান স্থানান্তর করা হবে। পুরোপুরি স্থানান্তর সম্পন্ন হলে কারওরান বাজারে বিজনেস হাব তৈরি করা হবে।

কারওয়ান বাজারের দোকানগুলো গাবতলীতে উত্তর সিটি করপোরেশনের মার্কেটে স্থানান্তর করা হবে। তবে এ স্থানান্তরকে অনিশ্চিত গন্তব্য বলছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের মতে এখান থেকে তুলে দিলে পরিবার নিয়ে বড় সংকটে পড়তে হবে। নতুন জায়গায় এখানকার মতো ব্যবসা জমবে না বলে মনে করেন তারা।

ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ সূত্র জানায়, অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সময় ২০০৬ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ‘ঢাকা শহরের তিনটি পাইকারি কাঁচাবাজার নির্মাণ প্রকল্প’ অনুমোদন দেয়। কৃষিপণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি কারওয়ান বাজারের যানজট কমাতে প্রকল্পটি নেওয়া হয়।

ঈদুল ফিতরের পর যেকোনো দিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে সমস্ত দোকানপাট স্থানান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৫ এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোতাকাব্বীর আহমেদ। গতকাল কারওয়ান বাজারে ডিএনসিসির আঞ্চলিক কার্যালয়ের সামনে তিনি এসব কথা বলেন।

মোতাকাব্বীর আহমেদ বলেন, এরই মধ্যে ডিএনসিসির অফিস স্থানান্তর কাজ শুরু হয়েছে। ঈদের পর ডিএনসিসির নিজস্ব ভবন ভেঙে ফেলা হবে। এরপর অন্যান্য দোকান স্থানান্তর করা হবে। এখানকার দোকানগুলো গাবতলীতে উত্তর সিটি করপোরেশনের মার্কেটে স্থানান্তর করা হচ্ছে।

পর্যায়ক্রমে সবাইকে পুনর্বাসন করা হবে জানিয়ে মুতাকাব্বির আহমদ বলেন, কারওয়ান বাজারে ১৭৬টি স্থায়ী দোকান এবং ১৮০টি অস্থায়ী দোকান রয়েছে। সামনে আর কোনো বাজার থাকবে না এবং কোনো খুচরা ব্যবসায়ী থাকবে না।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম গাবতলীর মার্কেট পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, 'ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পাইকারি ও খুচরা কাঁচাবাজার এক জায়গায় হওয়া উচিত নয়। এতে করে একদিকে যেমন জনদুর্ভোগ তৈরি হবে অন্যদিকে যানজটও সৃষ্টি হবে। আমরা চাই পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় হোক। পাইকারি কাঁচাবাজারগুলো শহরের বাইরে হলেই বেশি ভালো হবে। মন্ত্রণালয়, ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলরসহ সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে এই লক্ষ্যে কাজ করছে। সবাইকে নিয়ে বসে করণীয় ঠিক করা হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'কাওরানবাজার থেকে ঢাকার ভিন্ন পয়েন্টে সুবিধাজনক স্থানে কীভাবে স্থানান্তর করা যায় সেটা নিয়ে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। সকলের প্রচেষ্টায় এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।'

'আমাদের লক্ষ্য থাকবে যে সকল ব্যবসায়ীরা সেখান থেকে চলে আসবেন তারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং মানুষেরও ভোগান্তি না হয়। তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কাউকে হঠাৎ করে চলে যেতে বললে সে চলে যাবে না। আর গেলে কোথায় যাবে। কিন্তু তাদের জন্য জায়গা দেওয়া ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয় তাহলে তারা অবশ্যই যাবে,' বলেন তিনি।

ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, স্মার্ট শহর গড়তে কারওয়ান বাজারকে স্থানান্তর করতে হবে। এটার কোনো বিকল্প নেই। অভিদ্রুত ১৭৬টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে। আপনাদের ব্যবসার পরিবেশ নষ্ট হবে না। যেদিন আসবে, সেদিন থেকে ব্যবসা করতে পারবেন। আপনারা আসবেন কি আসবেন না এই দায়িত্ব আপনাদের। গাবতলীতে আপনারা না আসলে দুই কুল হারাবেন।

এ ব্যাপারে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, বিদেশিদের সুন্দর ভিউ দেওয়ার জন্য কাঁচাবাজার সরে যাবে এটি হতে পারে না। বস্তি থাকলে তারা সেটি দেখুক। কসমেটিক ধারণা দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না; বরং কারওয়ান বাজারের ভবনগুলো যেহেতু ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলো অপসারণ করে সেখানে একটি আধুনিক কাঁচাবাজার হতে পারে। কারণ যখন কাঁচাবাজারটি গাবতলীতে স্থানান্তর হবে, তখন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যেতে পারে।

কারওয়ান বাজারে কাঁচামালের আড়তের ব্যবসা করেন খোরশেদ আলম। পাকা ভবনের নিচতলার ১ নম্বর আড়তের এ ব্যবসায়ী বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর কারো হাত নেই। তবে দীর্ঘ এ সময়ে কাঁচামালের আড়তগুলো লাখ লাখ মানুষের জীবিকার একমাত্র ভরসাস্থল হয়ে উঠেছে। এ আড়ত ঘিরে আশপাশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল-রেস্তোরাঁ, ব্যাংক-বীমা। এখন আড়ত ভবন ভেঙে ফেললে সব খাতের ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

তিনি আরো বলেন, গাবতলীর যেখানে আড়ত নেয়া হবে বলা হচ্ছে, সেখানে শাটারযুক্ত আড়ত করা হয়েছে। তবে কখনোই কাঁচামালের ব্যবসা শাটারযুক্ত আড়তে করা যায় না। কাঁচামালের আড়ত থাকতে হয় খোলামেলা। ট্রাক ঢোকার জন্য চারপাশে রাখতে হয় পর্যাপ্ত জায়গা।

কাওরান বাজার ভবনটির আড়ত মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান সুজন বলেন, সারাদেশের প্রান্তিক কৃষক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে কয়েকশ কোটি টাকা নগদ ও দাদন (ব্যবসার জন্য অগ্রিম টাকা দেওয়া) রয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে বকেয়া ও ব্যাংকে ঋণ রয়েছে শত শত কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করা হলে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে সবাই। একই সঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়বে শ্রমিক, ভ্যানচালকসহ লাখ লাখ মানুষ।

সাইফুর রহমান বলেন, বর্তমানে পণ্যমূল্যে যে অস্থিরতা চলছে, এ আড়ত সরালে তা আরো বাড়তে পারে। কারওয়ান বাজারে কত লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে, কত কোটি টাকার কেনা-বেচা হয়- এসব বিস্তারিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেননি মেয়র। তাদের চিন্তা শুধু কীভাবে ব্যবসায়ীদের সর্বস্বান্ত করা যায়। আমার বিশ্বাস, এ বাজারের নিরীহ শ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাস্তব জীবনের চিত্র দেখলে প্রধানমন্ত্রী এখান থেকে বাজার সরাবেন না।

কারওয়ান বাজার স্থানান্তর নিয়ে ক্রেতাদের মাঝেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ইস্কাটনের দিলু রোডের বাসিন্দা সাবেরা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার বাসার আশপাশে মাছ-মাংস-সবজির দোকান থাকলেও সেখানে দাম বেশি। এ জন্য হেঁটে কারওয়ান বাজার যাই। সেখান থেকে অনেক সস্তায় জিনিসপত্র কেনা যায়। এতে বেশ আর্থিক সাশ্রয় হয়। কারওয়ান বাজারের আড়ত গাবতলীতে গেলে আমার মাসে অন্তত দুই হাজার টাকা খরচ বেড়ে যাবে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads