ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন মাইশা মমতাজ মীম। স্বপ্ন ছিল উদ্যোক্তা হবেন। সে জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং বা ডাক্তারি না পড়ে ভর্তি হয়েছিলেন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। মাইশার সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল প্রাণ।
মাইশার বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক এলাকায়। মেয়েকে হারিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন মা। শুক্রবার সকালে রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভারে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী।
দুই মেয়ের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের সুবিধার জন্য উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরে ভাড়া বাসায় থাকত মাইশার পরিবার। শুক্রবার সন্ধ্যায় জানাজা শেষে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মৌচাকে গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। গাজীপুরের মৌচাক এলাকায় মাইশার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজন, প্রতিবেশী, তার শিক্ষক ও সহপাঠীদের ভিড়।
মাইশার পরিবার জানায়, প্রতিবাদী স্বভাবের মেয়ে ছিলেন মাইশা। কোনো অন্যায় সহ্য করতে পারতেন না। ছিল মানবিক গুণাবলি। গরিব ও অসহায়দের জন্য সব সময় কাজ করার ইচ্ছা ছিল তার। কখনো কখনো ১০ টাকার রিকশা ভাড়া ১০০ টাকাও দিতেন মাইশা। তাই বড় হয়ে উদ্যোক্তা হওয়ার ইচ্ছা ছিল, যেন মানুষের কল্যাণে পাশে থেকে সহযোগিতা করতে পারেন।
মাইশার বাবা নূর মোহাম্মদ মামুন বলেন, মাইশা খুবই সাহসী মেয়ে ছিল। সমাজের জন্য কিছু করার বড় স্বপ্ন ছিল তার। স্কুটি চালানো ছিল তার সবচেয়ে বড় শখ। দুই বছর ধরে স্কুটি কেনার জন্য বায়না ধরেছিল কিন্তু আমি কিনে দিইনি। কারণ আমি ঢাকা শহরের রাস্তাঘাটের অবস্থা জানতাম। মেয়ের জেদের সঙ্গে পেরে না উঠে একপ্রকার বাধ্য হয়েই স্কুটি কিনে দিয়েছিলাম। করোনার সময় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় উত্তরা সেক্টরের ভেতরেই স্কুটি চালাতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হওয়ার পর স্কুটি চালিয়েই যাতায়াত করত। কিন্তু সেই স্কুটিই আমার মাইশার জীবন কেড়ে নিল। মাইশার সহপাঠী মরিয়ম মোস্তফা মিশু বলেন, মাইশা বড় হয়ে হতে চেয়েছিল উদ্যোক্তা। বন্ধুদের সব সময় বলত, উদ্যোক্তা হয়ে নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও পাশে দাঁড়ানো যাবে।
শুধু নিজেই নয়, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকা যাবে। এ জন্য মেডিক্যাল কলেজ বা ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ে সে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়।
মাইশার বাবা নুর মোহাম্মদ মামুন প্রতিষ্ঠা করেন মৌচাক আইডিয়াল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। সেই স্কুল থেকেই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পান মাইশা।
স্কুলশিক্ষক মাইনুদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিল মাইশা। তার মেধার মূল্যায়ন আমরা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় দেখেছি। আমরা শিক্ষক হিসেবে মাইশার জন্য গর্ব করতাম। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না মাইশা আমাদের মাঝে নেই।
বড় বোনকে হারিয়ে রোদসী মমতাজ মৌ বলেন, শুক্রবার সকালে আপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভলান্টিয়ারের কাজ ছিল। এজন্য সকাল সকাল বাসা থেকে স্কুটি নিয়ে বের হয়। আমারও ডাক্তারি পরীক্ষা ছিল। যাওয়ার সময় আমাকে দ্রুত বের হতে বলে যায়। আমি পরীক্ষা শেষ করে বাসায় এসে জানলাম আপু আর নেই।
এদিকে মীম নিহতের ঘটনায় চালক সাইফুর রহমান ও তার সহকারী মশিউরের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
গত শনিবার সন্ধ্যায় খিলক্ষেত থানায় মীমের বাবা নূর মোহাম্মদ মামুন ওই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করেন।
রাতে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুন্সী সাব্বির আহমেদ।
তিনি বলেন, গত শুক্রবার রাতে কাভার্ড ভ্যানের চালক সাইফুর রহমান ও তার সহকারী মশিউরকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে খিলক্ষেত থানা পুলিশ। এ সময় কাভার্ড ভ্যানটি জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় সন্ধ্যায় নিহত মীমের বাবা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় চালক ও তার সহকারীকে আসামি করা হয়েছে।
মামলা এত দেরিতে হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ওসি বলেন, মীমের পরিবার দাফন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তারা থানায় আসতে পারেননি। তাই অভিযোগ করতে তারা দেরি করেন।
অন্যদিকে রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভারে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মাইশা মমতাজ মীমের মৃত্যুকে সড়ক দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন তার সহপাঠীরা।
এ হত্যায় জড়িতদের বিচার এবং মীমের পরিবারকে পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন তারা।
এছাড়া দাবি পূরণে ২৪ ঘণ্টা সময়ও বেঁধে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে সকালে সমবেত হন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ কর্মসূচির পরে তারা মিছিল নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটের দিকে এগোতে থাকেন। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মূল সড়কে যেতে দেয়নি পুলিশ।
হত্যায় জড়িতদের শাস্তি ও মীমের পরিবারকে পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি আরও ছয়টি দাবি তুলে ধরেছেন তারা।
সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের কারণে মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিশ্চিত করতে হবে। ওভারটেক ঠেকাতে সড়কে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে। শিক্ষার্থীদের হাফ পাসে কোনো শর্ত থাকতে পারবে না। শিক্ষার্থী ও নারীদের জন্য আলাদা গণপরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। রাজধানীতে বাস রুট র্যাশনালাইজেশন প্রক্রিয়ার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী সারোয়ার হাবিব বলেন, চট্টগ্রাম থেকে লরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে সবসময় আমরা দেখি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসন বা সরকারের স্বতঃস্ফূর্ত কার্যক্রম থাকে না।
তিনি বলেন, এর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না হলে আমার কঠোর আন্দোলনে যাব। এমনকি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আমাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করবে।





