গ্লাসে রাখা হচ্ছে চাল। তাতে ঢালা হচ্ছে পানি। কোনোরকম তাপ ছাড়াই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চাল ফুটে হয়ে গেল ভাত। ভাতের রং রেডিয়ামের মতো দেখতে। কারণ চালগুলো ছিল সীমানা পিলারের সংস্পর্শে। পুরো বিষয়টিই প্রতারণার অংশ। শত বছরের পুরনো সীমানা পিলার বিক্রি করতে এভাবেই ফাঁদ পাতে চক্রটি। অভিনব এ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি- বেসরকারি কর্মকর্তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, কিছু উচ্চাভিলাষী লোকজন এ ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। চক্রটি তাদের টার্গেট করে অভিনব পন্থায় হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। সম্প্রতি এ চক্রের ৪ সদস্যকে আটক করে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গোয়েন্দা পুলিশ বলছে, শত শত বছরের পুরানো সীমানা পিলার। ব্যবহার হয় পারমাণবিক চুল্লিতে রিয়েক্টর হিসেবে। মঙ্গলগ্রহের বিভিন্ন প্রকল্পেও রয়েছে চাহিদা। একেকটির দাম কয়েকশ কোটি টাকা। এমন কথা বলে প্রতারণা করছে একটি চক্র। কাঠের তৈরি বস্তুকে সীমানা পিলার হিসেবে উপস্থাপন করছে চক্রটি।
পারমাণবিক রিয়েক্টর এবং মঙ্গলগ্রহের বিভিন্ন প্রকল্পে এর ব্যাপক চাহিদার কথা বলে টার্গেট ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয় কাঠের তৈরি বস্তু। এরকম দুটি কথিত সীমানা পিলার উদ্ধার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। পিলারগুলো দেখতে ত্রিভুজাকৃতির। গায়ে খোদাই করা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম। ১৮১৮ সাল অর্থাৎ ২০৪ বছর আগের কথিত এই পিলারের মূল্য হাঁকা হয় শত কোটি টাকা। অথচ কাঠের তৈরি এই পিলার তৈরিতে খরচ হয়েছে মাত্র এক থেকে দুই হাজার টাকা। রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে চক্রটির চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে তারা ম্যাগটেনিক কয়েন, তক্ষক ও পিলারের নামে প্রতারণা করে আসছিল। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ওয়ারি বিভাগ) উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন বলেন, অবসরে যাওয়া সরকারি কর্মকর্তা, ধনাঢ্য ব্যক্তি, যারা মূলত লোভী ধরনের তাদেরকে টার্গেট করে এ প্রতারকচক্র এ পথে আগায়। এমন একটি চক্রের ৪ সদস্যকে ধরতে আমরা সক্ষম হয়েছি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জানতে পেরেছি, তারা ভিকটিমের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা নিয়েছে, আরো ১২ লাখ টাকা নেওয়ার জন্য হুমকি-ধমকি দিচ্ছিল এবং তারা তাকে আটকও করে রেখেছিল। ভিকটিমকে উদ্ধারও করেছি। কথিত সেই সীমান্ত পিলারও (কাঠ) উদ্ধার করেছি। রফিক নামে এক প্রতারক আছে তার বাড়ি সিলেটে আর সে হচ্ছে এটির মূল পরিকল্পনাকারী।
তিনি বলেন, সীমানা পিলার বা ম্যাগনেটিক কয়েনের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই ধরনের প্রতারণার হাত থেকে বাঁচতে লোভ সংবরণ করার পরামর্শ পুলিশের। কারো লোভে পা না দেওয়ার অনুরোধ জানান পুলিশের এ কর্মকর্তা।
টার্গেট যারা : আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, অভিজাত এলাকাজুড়ে এই চক্রটি অবস্থান করে। নামকরা বিভিন্ন বড় বড় রেস্টুরেন্টেও এরা জমায়েত হয়। সেখানে আসা যাওয়া ব্যক্তিদের দেখেই তারা এ ফাঁদ পাতে। টার্গেটকৃত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে বলতে তারা জমিয়ে ফেলে সম্পর্ক। এক পর্যায়ে তখন তারা সীমানা পিলার নিয়ে কথা বলতে থাকে। এমনভাবে তারা বিষয়টি উপস্থাপন করে লোভে পড়ে যায় টার্গেটকৃত ব্যক্তি। এরপর সীমানা পিলার নিয়ে সামনে হাজির হয়ে চুম্বক সিস্টেম বিষয় তুলেও ধরে। এতে করে টার্গেটকৃত ব্যক্তিরও বিশ্বাস অর্জন হয়ে ওঠে। এরপর মূল্য নির্ধারণ করে। বিশেষ করে গরিব অসহায় গ্রামীণ ব্যক্তির নিকট আছে বলে মূল্য কোটি ধরা হয়। এরপর টার্গেটকৃত ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর আর কোনো যোগাযোগ রাখে না। এভাবে একেক ব্যক্তিকে টার্গেট করে চালিয়ে যায় প্রতারণা। সংঘবদ্ধ এ চক্রটি শুধুমাত্র রাজধানীকেন্দ্রিক তা নয় সারা দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। যখনই কোনো সুযোগ বা টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে পেয়ে যায় তখন তারা এ প্রতারণা করে থাকে।
এদিকে সীমানা পিলারের ন্যায় ৮০ টাকার কয়েন নিয়ে কোটি টাকার প্রতারকচক্রও রয়েছে বলে জানান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সম্প্রতি এ রকম একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
গুলিস্থান থেকে তামা কিনে তা গলিয়ে তৈরি করা হয় কয়েন। তাতে খোদাই করা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম। ইচ্ছেমতো বসানো হয় সন তারিখ। নাম দেওয়া হয়েছে ম্যাগটেনিক কয়েন। শত বছরের পুরানো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে প্রতিটি কয়েন বিক্রির ফাঁদ কোটি টাকা প্রতারণা করা হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মো. মশিউর রহমান বলেন, সাধারণ তামা দিয়ে এসব কয়েন তৈরি হয় যাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম লিখে দেওয়া হয়। এই কয়েনগুলোকে একদল প্রতারকরা গুলিস্তান থেকে কিনে নেয়। তারপর চক্রটি বাংলাদেশি সরলমনা কিন্তু লোভী টাইপের লোকদের বিভিন্ন হোটেলে নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে দেখায় এবং একেকটির দাম হাঁকে ৪-৫ কোটি টাকা। তিনি বলেন, আসলে এই কয়েনটার মূল্য ৪০ থেকে ৫০ টাকা। কিন্তু সেটার জন্য প্রতারকরা কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. হারুন অর রশীদ বলেন, এ রকম প্রতারকচক্র বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। এমন অস্বাভাবিক কোনো কিছু যদি কেউ অফার করে যেমন দ্রুত বড়লোক হওয়া যাবে এ রকম অফার থেকে আমরা যেন সাবধান হই। এই ধরনের ফাঁদ থেকে বাঁচতে লোভ সংবরণ করার পরামর্শ পুলিশের।
এদিকে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, এ ধরনের কিছু প্রতারকচক্র রয়েছে। এর আগেও আমরা কিছু চক্রকে গ্রেপ্তারও করেছি। তিনি বলেন, প্রতারকদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সচেতন হওয়ার বিকল্প নাই। যদি এ ধরনের কেউ কোনো বিষয় জানায় তবে র্যাব বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।





