মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার:
প্রাসঙ্গিকতায় জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কবি কাজী নজরুল ইসলামই সমসাময়িক- তা অগ্রসর চিন্তাশীলতা, প্রগতিশীলতায়। আধুনিকতায়ও। মাত্র ২২ বছরে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি লিখেছিলেন রাতে। দোয়াত-কলম কিংবা পেন্সিলে। এক বসায় একশ বেয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ পঙ্ক্তির একটি কবিতা লেখা আজকের এই ডিজিটাল বা স্মার্ট যুগেও অবিশ্বাস্য-অস্বাভাবিক। যে কবিতায় তিনি সব ধ্বংসকারী, আবার তিনিই স্রষ্টা। বিপ্লবী আবার প্রেমিকও। প্রচণ্ড আধ্যাত্মিক আবার ব্যাপকভাবে ইহজাগতিকও। কত ভাবনাতীত বিষয়টি!
একইসঙ্গে কথিত অভিজাত, বিত্তবান এবং শিক্ষিত শ্রেণির কাছে নজরুল উপেক্ষিত কবি। তাদের উপলব্ধি- নজরুলচর্চা করে ঝটপট প্রগতিবাদী হওয়া কঠিন। তাই তারা এ পথে হাঁটেন না। যতটুকু হাঁটেন তা নিছকই লোক দেখানো। নজরুল যত শ্যামা সঙ্গীত, ভজন রচনা করেছেন, তা করতে পারেননি কোনো পুরোহিত। আবার সেই তিনিই যত ইসলামি গান রচনা করেছেন, তা পারেননি কোনো ইসলামি চিন্তাবিদও। এগুণও যেন তার কাল হয়েছে। জাত খুঁইয়েছেন।
মুসলমানরা তাকে নেয়নি। বলেছে, নজরুল হিন্দুয়ানার কবি। বিপরীতে বলা হয়েছে, তিনি আসলে সাম্প্রদায়িক। আর ধর্ম মানেই মান্ধাতা বলে বিশ্বাসীদের কাছে নজরুল হয়ে গেছেন অনেক দূরগাঁয়ের কেউ। অথচ বাংলার আর কোনো কবি গানে, কবিতায়, প্রবন্ধ, ভাষণে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার নজরুলের মতো স্পষ্ট- সাহসী উচ্চারণ নেই। সাধারণ মানুষের পক্ষে, অন্যায়, অসুন্দর, অকল্যাণ, অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুলের মতো বিরামহীন লিখনী কারো নেই। এই নজরুলের জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকীতে তার নির্দিষ্ট কিছু কবিতা, গান সামনে এনে চেতনে বা অবচেতনে তাকে খণ্ডিত করে ফেলা হয়। আড়াল করে দেওয়া হয় নজরুলের দ্রোহ, প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক অংশকে। এ এক আজবীয়তা। নজরুল কি জীবদ্দশাতেই তা মালুম করেছিলেন? নইলে তার লেখায় কীভাবে এসেছিল-
“স্বপন ভেঙে নিশুৎ রাতে জাগবে হঠাৎ চমকে,
কাহার যেন চেনা-ছোঁওয়ায় উঠবে ও-বুকে ছমকে,
জাগবে হঠাৎ চমকে!
ভাববে বুঝি আমিই এসে
ব’সনু বুকের কোলটি ঘেঁষে,
ধরতে গিয়ে দেখবে যখন
শূন্য শয্যা! মিথ্যা স্বপন!
বেদনাতে চোখ বুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে! ”
তার বিস্ময়কর নানান লেখনীর মাঝে- ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’, ‘বল বীর- বল উন্নত মম শির’... সেই কবিই লিখলেন, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেব খোঁপায় তারার ফুল’ অথবা ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’-এর পাশাপাশি এসেছে ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’। ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ গান দিয়ে উদযাপন হয় ঈদ আবার তার শ্যামা সঙ্গীত দিয়ে হয় পূজা। ধর্ম নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে তিনি লিখেছিলেন, মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান। আবার নারী-পুরুষের সম-অধিকার নিয়ে লিখলেন, মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল... অথবা ‘বিশ্বে যা-কিছু সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।
নজরুল উপমহাদেশের প্রথম ঘোষিত মুরতাদ। যারা এ কাজটি করেছেন তাদের একটি গ্রুপই পরে তাকে বুজর্গ বলে মাথায় তুলেছে। তার বিস্ময়কর অমর সৃষ্টির কিছু লেখনীতে; কিছু আবার গেয়েছেনও। এমনকি বন্ধু কমরেড মোজাফফর আহমদের সঙ্গে পত্রিকায় কাজ করতে গিয়ে জড়িয়েছিলেন বলশেভিক আন্দোলনেও। লেখনীর জন্য গিয়েছিলেন কারাগারে তবু তার কলম থামেনি। বারবার প্রেমেও পড়েছেন। বিরহ ছিল চিরকাল। সন্তানের মৃত্যু তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। একবার ভোটেও অংশ নিয়েছিলেন। সেনাজীবন শেষে মাত্র ২২ বছর লেখালেখি করে মাতিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বকে। কুমিল্লা শহরে শচীন দেব বর্মনকে নিয়ে সুরের ঝংকার তুলতেন। এই শহর ছিল তার প্রেম, বিরহের শহর। এমনকি পুলিশের হাতে আটকও হয়েছিলেন কুমিল্লায়। কেবল বাংলায় নয়, বিশ্ব সাহিত্যে এমন বিস্ময়কর বিপরীত প্রতিভা আর নেই।
নজরুল স্মৃতি ধন্য ফরিদপুর। মোট সাত বার এসেছিলেন ফরিদপুরে। প্রথম আসেন ১৯২৫ সালের ১ মে। বঙ্গীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সে সময় উপস্থিত ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সভাপতিত্ব করে ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। আইনসভার সদস্য পদের জন্য স্বরাজ পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করেন। ওই নির্বাচনে সমর্থন চেয়ে কবি নজরুল আর কবি জসিম উদদীন তমিজউদ্দিন খাঁনের সঙ্গে তার ঝিলটুলির বাড়িতে দেখা করেছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগের সদস্য তমিজউদ্দিন সমর্থন করেননি নজরুলকে। পরাজিত হয়ে সেখান থেকে ফেরার পথে এই দুই কবি দুধ বাজারের মাছি ভন ভন হোটেলে ভাত খেয়েছিলেন। হোটেলটি বছর কয়েক পর্যন্তও টিকেছিল। নজরুলের মতো সম্প্রদায়ের কারো জন্ম, বেড়ে ওঠা ও পরিবেশ থেকে বড় জোর গ্রামকবি হওয়া সম্ভব। অথচ তিনি শুধু প্রতিভাবান সাহিত্যিকই নন, ইংরেজি ফারসি সাহিত্যের সঙ্গেও নিজেকে নিবিড়ভাবে পরিচয় করিয়েছিলেন তার মস্তিস্কের প্রবল শক্তির জোরে।
নজরুলের আবেগপ্রবণ গদ্য ও অন্য সবকিছু বাদ দিলেও তিনি বেঁচে থাকবেন তার শ্যামা সঙ্গীত ও ঠুমরির মধ্য দিয়ে। সঙ্গীতে অল্প সময় তালিম নিয়েও নজরুল অনেক বড়মাপের সঙ্গীতজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন তার বিস্ময়কর মেধার কারণে। তিনি অনেকগুলো রাগ ও তাল সৃষ্টি করেছেন যা শত বছর সঙ্গীতের সঙ্গে লেগে থেকেও সাধারণ্যের পক্ষে সম্ভব না। নজরুল তার গানে প্রচুর তান ব্যবহার করতেন, যা সঙ্গীতের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারলে সম্ভব নয়।
বাঙালিরা স্বভাবগতভাবে একজনকে ছোটো না করে অন্যজনকে বড় করতে পারে না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলামের অন্ধ ভক্তদের আচরণে তা আরো স্পষ্ট। তারা বুঝত নারাজ, রুই মাছের স্বাদ বেশি না বোয়াল মাছের- এই তুলনা অবান্তর। ফল হলেও জাম্বুরার সঙ্গে নারিকেলের তুলনা চলে না। পাখি হলেও কোকিলের লগে ঈগলের তুলনা বেমানান। কারণ, তারা নিজ নিজ স্বাদে ও গুণে ইউনিক। সেভাবে সাহিত্যিক হলেও রবীন্দ্রনাথের লগে নজরুলের বা নজরুলের লগে রবীন্দ্রনাথের তুলনা চলে না। কারণ তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দুজনের বয়সের ফারাক প্রায় ৩৮ বছর, এর পরও দুজনের সম্পর্কটা মুখামুখি ছিল না। এ নিয়ে কিছু মিথ এবং জোকস আছে। যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন কেবল লিখতে শুরু করেছেন। কলকাতার পত্রিকায় তার কবিতা, গল্প ছাপা হচ্ছে। কে এই লোক? কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ-এসবি’র প্রধান বৃটিশ কর্তার প্রশ্ন! তিনি নির্দেশ দিলেন ওই নতুন কবি সম্পর্কে খোঁজ নিতে।
বৃটিশ হুজুর আদেশ করেছেন! সবাই দৌড়কে ওই লোক? লাগাও তালাশ! বৃটিশ হাবিলদার গেল তদন্ত করতে।
কয়েক দিন পর বৃটিশ কর্তার কাছে ফাইল এলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে। ফাইলে তার সম্পর্কে লেখা: ‘ভদ্রলোক দেখিতে সুন্দর, গড়ন ভালো। লম্বা জোব্বা পরিধান করেন, মাথায় ঝাকড়া চুল, মুখে লম্বা দাড়ি রহিয়াছে। দরবেশের মতো চেহারা... তিনি সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারের সন্তান বলিয়া জানা গিয়াছে!’
১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় ঢাকাসহ যারা বড় শহরগুলোয় থাকতেন তাদের অনেকেই ড্রইং রুমে রবীন্দ্রনাথের ছবি টানিয়ে রাখতেন! কারণ? পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন বাসা সার্চে আসত, তারা অনেক জায়গায় নজরুলের দাড়িহীন ছবির পাশে দাড়িওয়ালা রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যেত। নজরুলের ছবি নামিয়ে ফেলতে বলত!





