ফেসবুক লাইভে এসে আবু মহসিন খানের আত্মহত্যার ঘটনা অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই ঘটনাটিকে নানাদিক থেকে উদ্বেজনক আখ্যা দিয়ে সমাজবিশ্লেষক ও বার্ধক্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজ ও রাষ্ট্র প্রবীণদের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। এ বিষয়ে সামাজিক আন্দোলনে তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এদিকে ৮ বছর আগে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হলেও প্রবীণদের কোনো সুযোগ-সুবিধাই নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বেঁচে থাকলে মানুষের জীবনে বার্ধক্য আসবেই। যে মা-বাবা তাদের সন্তানকে পৃথিবীতে এনেছেন, নিজেরা খেয়ে না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, বড় করেছেন, আজ তারা বৃদ্ধ। বয়সের ভারে কর্মক্ষমতাহীন, অসহায়, অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তাদের পাশে দাঁড়ানো একদিকে যেমন সন্তানের অবশ্য কর্তব্য, অন্যদিকে যে মানুষগুলো সারা জীবন শ্রম আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কর দিয়ে রাষ্ট্রের সেবা করেছেন, বৃদ্ধ বয়সে তাদেরকে সুরক্ষা দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তারা বলছেন, করোনা মহামারিতে প্রবীণ নাগরিকরা জীবন বাঁচানোর কঠিন যুদ্ধে অবতীর্ণ। সন্তানদের জীবন-জীবিকাই যেখানে টালমাটাল এবং সীমাহীন অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন, তখন ইচ্ছা থাকলেও দিশেহারা সন্তানেরা প্রবীণ পিতা-মাতার দায়িত্ব ততটা বহন করতে পারছে না। বিশ্বায়নের যুগে পরিবারগুলো যখন ক্ষুদ্র হয়ে পড়ছে তখন প্রবীণ সদস্যদের সংস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা। একদিকে একাকিত্ব, অন্যদিকে চাওয়া-পাওয়া মেলানোর সামঞ্জস্যহীনতা। নানাবিধ জটিলতায় প্রবীণরা বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। এতদিন তা চোখের আড়ালে এসব ঘটলেও তা প্রকাশ্যে এসেছে নায়ক রিয়াজের শ্বশুর আবু মহসিন খানের আত্মহত্যার মধ্যদিয়ে।
গত বুধবার রাত ১০টার কিছু আগে রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজের বাসায় ফেসবুক লাইভে এসে মাথায় গুলি করে ব্যবসায়ী আবু মহসিন খান আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় পুলিশ মনে করছে, তার দীর্ঘদিনের একাকী জীবন, ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই, ব্যবসায় লোকসান-সবকিছু মিলিয়ে চরম অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন আবু মহসিন খান। এটাই তার আত্মহননের পথ বেছে নেবার কারণ হতে পারে।
বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, প্রবীণ নিবাসের ব্যবস্থাপক ড. মহসিন কবীর বলেন, মানসিক চাপে পড়ে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। কেউ যখন নিজের সঙ্গে লড়াই করে আর পারে না, সেই সময় মানুষ এই সিদ্ধান্ত নেয়। মেডিকেলের ভাষায় এটা একটা রোগ। বিশ্বায়নের কারণে সামাজিক যে পরিবর্তনের প্রভাব, কাল সেটা আমরা দেখতে পেরেছি। যৌথ পরিবার সব ভেঙে গেছে, এখন সব নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি বা একক পরিবার। মানুষ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রবীণ বয়সে মানুষের অর্থের সংস্থান হয় না। পরিবার কোনো সাহায্য করে না, গত পরশু আমরা সেটা দেখতে পেরেছি। এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম বাংলাদেশে, আগে কখনো ঘটেনি।
এই বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ভিডিওর ১৪ মিনিটে গিয়ে বোঝা গেছে তিনি আসলে সুইসাইড করবেন। যারা দেখছিলেন তারা কিন্তু আগে বোঝেননি। শেষের দিকে তিনি আত্মহত্যার কথা বললেন। দোয়া পড়া শুরু করলেন। এখানেও আমি সোসাইটিকে (সমাজ) দোষারোপ করবো। তার আশপাশে কেউ ছিল না? তার ভবনে কেউ ছিল না? কেউ লাইভটা দেখছিল না? তার মানে আমাদের সমাজব্যবস্থা এতটাই ভেঙে পড়ছে যে আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি না। পাশের ফ্ল্যাটের কেউ যদি দৌড়ে আসতো, কেউ যদি এসে কথা বলতো, কিংবা জড়িয়ে ধরতো, তাহলে এমন ঘটনা ঘটতো না। এই জায়গাটা অ্যাড্রেস করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে জানা গেছে, বাংলাদেশে মানুষের গড় আয়ু ৭১ বছর ৬ মাস। সে হিসেবে এখন প্রবীণের সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ। ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়ছে। তবে অর্থাভাবে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করতে পারছেন না বৃদ্ধরা। ক্রমবর্ধমান প্রবীণদের জন্য সরকার কিছু পদক্ষেপ নিলেও তার সুফল মিলছে না।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর প্রায় ৮০ হাজার মানুষ প্রবীণদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. বিল্লাল হোসেন বলেছেন, মানুষ ৭০ বছর বাঁচলেও দূরারোগ্য ব্যাধি ও সংক্রামক রোগের কারণে তার কর্মক্ষমতা বেশি থাকে না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে এমন একটি মেকানিজম আনতে হবে, যেন এই জনগোষ্ঠী সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকেন। তাদের যেনো কারো ওপর নির্ভরশীল হতে না হয়।
জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐকান্তিক ইচ্ছায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করে। নীতিমালায় ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সের নাগরিককে ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর মন্ত্রিসভা নীতিমালার অনুমোদন দেয়। ২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। ওই বছরের ২৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ দেশের এক কোটি ৩০ লাখ প্রবীণ ব্যক্তিকে ‘সিনিয়র সিটিজেন’ ঘোষণা করেন।
প্রবীণ নীতিমালা অনুসারে সিনিয়র নাগরিকদের সমাজে বৈষম্যমুক্ত ও নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আইনে আছে- ‘জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সম্পদ, মর্যাদা, লিঙ্গ নির্বিশেষে মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। কিন্তু দীর্ঘ ৮ বছরেও প্রবীণদের কোনো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। এমনকি, প্রতিশ্রুতি অনুসারে পরিচয়পত্রও দিতে পারেনি।
প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মহাসচিব অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য শুধু সরকারি সাহায্যই সীমিত নয়, বেসরকারিভাবেও এ নিয়ে খুব বেশি কাজ হয় না। তাদের জন্য সামাজিক আন্দোলনে তরুণদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। বিষয়টি আনেকেই বুঝতে চান না। তিনি বলেন, বর্তমান অবস্থার উন্নতি না হলে ভবিষ্যৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য যে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে, তা বেশ নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
এদিকে অর্থনৈতিক অবকাঠামোতে প্রবীণদের জন্য ব্যবস্থা রাখার কথা জানিয়ে বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. মহসিন কবীর বলেন, সামাজিক ব্যবস্থায় প্রবীণদের সম্মানের সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি পরিবার না দেখে তাহলে সমাজ দায়িত্ব নিতে পারে, রাষ্ট্র দায়িত্ব নিতে পারে। আমাদের আরো বেশি প্রবীণবান্ধব হতে হবে। আমরা তো ইউরোপ-আমেরিকা হয়ে যাইনি। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে একজন বয়স্ক মানুষ কেন একা থাকবে। তাহলে কিসের সমাজ, কিসের প্রতিবেশী যারা খোঁজখবর রাখে না?
বার্ধক্যে অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কারণে ডিপ্রেশন বা বিষন্নতার বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় না। প্রবীণরা বেশিরভাগ সময়ই এসব উপসর্গের কথা আত্মীয়স্বজনকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন না। এসব কারণে প্রবীণদের এ ধরনের রোগের চিকিৎসাও ঠিকমতো হয় না। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বয়স্কদের শতকরা প্রায় ১৫ জন নানা ধরনের বিষণ্নতায় ভোগেন।
বিভিন্ন জরিপ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে বিষণ্নতায় ভোগে মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। বয়োবৃদ্ধদের মধ্যে এই হার প্রায় তিনগুণ।
এ বিষয়ে ড. মহসীন বলেন, প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য একেবারেই অবহেলিত আমাদের এখানে। কোনো প্রবীণই মানসিকভাবে সুস্থ নন। বার্ধক্য পৌঁছানোর পর মানুষ সারা জীবনের হিসাব-নিকাশ করতে বসে। যেটা গত পরশু আমরা দেখতে পেলাম। সুইসাইড করার আগে ওই ব্যবসায়ী এসব বলেছেন। কী পেলেন, কী হারালেন এ বিষয়গুলো প্রবীণ বয়সেই আসে। তারা একটা মানসিক চাপে থাকেন। আগে একটা সময় ছিল, যখন ছেলে-মেয়ে দায়িত্ব নিতেন, এখন তারা দায়িত্ব নিচ্ছেন না। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলতার ইমপ্যাক্ট পড়ে প্রবীণ বয়সে।
আবু মহসিন খানের ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ঘটনা থেকে আমাদের শিখতে হবে। এটা কেবল শুরু, ভবিষ্যতে তা আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। এটা আমাদের সমাজের জন্য অ্যালার্মিং। এ ঘটনা থেকে আরো ১০ জন এ ধরনের কাজে উৎসাহিত হতে পারে। বাংলাদেশে এই ট্রেন্ড চালু ছিল না। প্রবীণ মানেই একাকিত্বে ভোগা, বিষণ্নতায় ভোগা। এটার নেতিবচক ইমপ্যাক্ট যাতে না পড়ে সেদিকে নজর দিতে হবে।
এ ঘটনা থেকে তরুণ প্রজন্মও অনেক কিছুতে জড়াতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের তরুণদের সাবধান হতে হবে। তরুণ বয়স থেকেই নিজের জন্য পরিকল্পনা করা উচিৎ, শুধুমাত্র ছেলে-মেয়ের ওপর নির্ভরশীল হওয়া ঠিক নয় এমনকি জীবনসঙ্গীর ওপরও না। সবাইকে নিয়ে থাকতে হবে-এমন পরিকল্পনার পাশাপাশি বার্ধক্যে কীভাবে থাকবো, কী করবো, অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে সেটার একটা প্রি-প্ল্যান রাখতে হবে। এটা নিয়ে তরুণদের ভাবতে হবে।





