একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস, এপিএস) নিয়োগের বিষয়েও কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। বিতর্কিত, দুর্নীতিতে কোনোভাবে অভিযুক্ত ও রাজাকার পরিবারের সদস্যদের কোনো সংসদ সদস্যকে ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে না রাখতে দল থেকে সতর্ক করা হবে। সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে নানা বিতর্কের জন্ম হয়েছে যাদের নিয়ে, তাদেরও এবার এ পদে না রাখতে দল থেকে নির্দেশ পাঠানো হবে।
মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের পিএস ও এপিএস নিয়োগে সরকার নতুন নিয়ম কার্যকর করার পর দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সহকারী নিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করছে আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও সরকারকে যথাসম্ভব বিতর্কমুক্ত রাখতে দলের টিকেটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বিষয়ে নীতিগত এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তথ্য মতে, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) বা সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) বিভিন্ন সময়ে নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বিতর্কের জন্ম দেন। এতে সরকারের পাশাপাশি কখনো কখনো দলকেও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। মন্ত্রিসভার সদস্যদের পিএস ও এপিএসের সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার খবরও বিভিন্ন সময়ে সংবাদ শিরোনাম হয়।
বিতর্ক এড়াতে এর আগে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে নিজের সন্তানকেও পিএস ও এপিএস হিসেবে নিয়োগ দিতে দেখা যায়। একইভাবে নবম ও দশম সংসদের কয়েক সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জের ধরে আওয়ামী লীগকে সমালোচনার শিকার হতে হয়। নতুন সরকারের যাত্রার প্রায় শুরুতে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পিএস ও এপিএস নিয়োগে আগের নিয়ম বাতিল করে সরকার। একই সঙ্গে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত সহকারী নিয়োগেও দল থেকে সতর্ক ও কঠোর বার্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য পিএস ও এপিএস নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সংসদ সদস্যরা পিএস ও এপিএস নিয়োগ দেন নিজের পছন্দে ও নিজ উদ্যোগে। ফলে সংসদ সদস্যদের পিএস ও এপিএস নিয়োগে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটানো যায়।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে দলের যে কারো অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর থাকার বার্তা দেওয়া হয়। একাধিক বৈঠকে আলোচনা হয় সংসদ সদস্যদের পিএস ও এপিএস নিয়োগের বিষয়টিও। বিতর্কিতদের বদলে সৎ, যোগ্য ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী কাউকে সংসদ সদস্যরা ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে রাখবেন, দলের পক্ষে এমন নির্দেশ দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জের ধরে সংসদ সদস্যদের তা অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয় দল। শিগগিরই সব সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিতদের দলের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হবে। আওয়ামী লীগের চতুর্থ সরকারের প্রথম কার্যদিবসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্নীতিকে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে এনে সুশাসন নিশ্চিত করাই তার সরকারের লক্ষ্য। সরকারের পথচলার শুরুতে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। দুদকের অনুসন্ধানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্যও উঠে আসছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত অনেকের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির সন্ধান চালাচ্ছে দুদক। সরকার ও দলকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে কঠোর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এসবের অংশ হিসেবে সংসদ সদস্যদের পিএস ও এপিএস নিয়োগে লাগাম টেনে ধরা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নানাভাবে পরিচালিত জরিপের ফল অনুযায়ী আওয়ামী লীগ একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিতর্কিতদের দলের মনোনয়ন দেয়নি। নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর মন্ত্রিসভা গঠনেও চমক ছিল। পুরনো বেশিরভাগ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী এবার বাদ পড়েন। ঠাঁই হয় জনপ্রিয় ও নতুনদের। এরপর সংসদে দলের জন্য নির্ধারিত সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের বেলায়ও আওয়ামী লীগ পুরনোদের (দুজন বাদে) বাদ দিয়ে নতুনদের প্রাধান্য দেয়। আসন্ন উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে দলটির মনোনয়নের তালিকায় তেমন নেই বিতর্কিত নেতাদের নাম। অভিযুক্ত ও বিতর্কিতদের পেছনে ফেলে দল জনপ্রিয়দের নিয়ে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে। সূত্র জানায়, এমপিরা পিএস ও এপিএস নিয়োগে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির লোকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা সরকার গঠনের আগেই আওয়ামী লীগের শীর্ষ বৈঠকে আলোচনা হয়। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিষয়টির ইঙ্গিত করে গণমাধ্যমের কাছে কয়েকবার বক্তব্যও দেন। তিনি সংসদ সদস্যদের সতর্কও করেন। তিনি বলেন, মন্ত্রী ও এমপির পিএস, এপিএস কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজন খারাপ হলে তারাও (মন্ত্রী-এমপি) নিজেদের ভালো দাবি করতে পারেন না।





