মাত্র কয়েকদিন আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সর্বস্তরে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে সদর দপ্তরে বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ জমা পড়েছে। যৌতুকের দাবি করে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ সদর দপ্তরে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ মোঃ সেলিমের নামে নারী নির্যাতনের অভিযোগ দিয়েছেন স্ত্রী এলামা খন্দকার এষা। তিনি হবিগঞ্জের বানিয়াচং সার্কেলে কর্মরত। এষার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, যৌতুক হিসেবে তার কাছে প্রাইভেট কার ও রাজধানীর বারিধারা এলাকায় একটি ফ্ল্যাট দাবি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছেন তার স্বামী। একই সঙ্গে আইফোন ও প্লাটিনামের রিং কিনতে তিন লাখ টাকা ও পুলিশ হাউজিং সোসাইটিতে কেনা নিজের নামে জমির কিস্তির টাকাও শশুরবাড়ি থেকে দিতে দাবি করেছেন শেখ মোঃ সেলিম। স্ত্রীর অভিযোগপত্রে একাধিক বিয়ে-ডিভোর্স এবং বিয়ে বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ সেলিমের বিরুদ্ধে।
এরই মধ্যে এসব অভিযোগে তাকে জনসম্পৃক্ততাহীন স্থানে বদলি করতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পৃথক চিঠিতে অভিযোগ তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে জানাতে অনুরোধ করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি রেজাউল করিম। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক চিঠি, আইজিপির কাছে দেওয়া অভিযোগের কপি এবং এসংক্রান্ত অন্য তথ্য-উপাত্ত ‘বাংলাদেশের খবর’-এর কাছে সংরক্ষিত আছে।
গত ২৩ নভেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরের স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজিকে এক চিঠিতে জানান, নারী নির্যাতন কার্যকরভাবে প্রতিরোধের লক্ষ্যে সারা দেশে পুলিশ আন্তরিকতা, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করছে। নারী নির্যাতন সংক্রান্ত যে কোনো অপরাধের সংবাদ গভীর অনুসন্ধান করে তদন্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের শৈথিল্য না দেখাতে সারা দেশে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এরপর পুলিশ সদর দপ্তরের স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ থেকে ডিসিপ্লিন অ্যান্ড প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড শাখার অতিরিক্ত ডিআইজিকে দেওয়া এক চিঠিতে অভিযোগের অনুসন্ধান করে শেখ মোঃ সেলিমের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে তা অবহিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে এষা বলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি যশোরের রাজারহাটে। বর্তমান ঠিকানা মিরপুরের কল্যাণপুর ১ নম্বর রোডে। সেলিমের বাড়ি জামালপুরের সরিষাবাড়ী থানার মহাদান গ্রামে। বাবা শেখ মোঃ আব্দুল লতিফ সরিষাবাড়ী থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি। সেলিমের চাকির হয় মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। গত বছরের ১০ নভেম্বর অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেলিমের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। আমাকে বিয়ে করার আগে সেলিম আরেকটি বিয়ে করেছিল। সেই সংসারে হিয়া নামে আট বছর বয়সী মেয়ে ও হূদয় নামে ছয় বছর বয়সী তার দুই সন্তান আছে। বিষয়টি আমি পরে জানতে পারি।
স্বল্প প্রণয়ের মধ্য দিয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে হঠাৎ আমাদের বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় আমার বাবা-মা সেলিম বা তার পরিবারের সদস্যদের কাঙ্ক্ষিত উপহার বা যৌতুক দিতে পারেননি। এ কারণে আমার স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা আমাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতে থাকে। বিয়ের পরপরই একটি প্রাইভেট কার দাবি করেন। এ নিয়ে সেলিম ও তার (এষা) পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া শুরু হয় এবং তার ওপর নির্যাতন করে।
এলামা খন্দকার এষা বলেন, বিয়ের আগে আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশপাশি অনলাইনে বব্যসা করতাম। আমাকে নিয়ে সেলিমের সন্দেহের কারণে চাকরি ও ব্যবসা ছেড়ে দিই। চাকরি-ব্যবসা ছাড়ার আগে সেলিমের কাছে আমার একটি শর্ত ছিল। সেটি হলো—কেবলমাত্র জ্ঞাত আয়ের ওপর নির্ভর করেই সংসার চালাতে হবে। কারণ, কুমিল্লার দেবিদ্বার সার্কেলে থাকা অবস্থায় সেলিম ব্যাপক দুর্নীতি করেছিল। ওই সময় তার ঘরে ৫-৭ লাখ এবং অফিসে ৫-৭ লাখ টাকা সব সময় থাকতো। সেখানে প্রায় আড়াই বছর চাকরি করেন। দুর্নীতির টাকায় আশুলিয়ায় সেলিম বাবার নামে এবং জামালপুর শহরে মায়ের নামে জমি কিনেছেন। বোন লুশির ব্যাংক অ্যাকাউন্টেই তিনি বেশি টাকা রাখেন।
তিনি বলেন, যৌতুকের জন্য স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের অব্যাহত নির্যাতনে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। একাধিকবার আমার স্বামীর সরকারি বাসায় ডাক্তার এনে চিকিৎসা করানো হয়। এক পর্যায়ে আমার চার সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা শিশু অপরিপক্ক অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
এষা বলেন, ২৫ সেপ্টেম্বর আমার নিকট আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল। এতে যোগ দেওয়ার জন্য গত ১৯ সেপ্টেম্বর সেলিম আমাকে গ্রামের বাড়ি যশোরে নিয়ে যান। আমাকে সেখানে রেখে আসেন। আমার গ্রামের বাড়ি থেকে রওনা দেওয়ার সময় বলেন, বিয়ের দিন তিনি আবার আসবেন। বিয়ে শেষে তিনি আমাকে হবিগঞ্জ কর্মস্থলের বাসায় নিয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি আমার নিকট আত্মীয়ের বিয়ের দিন আমাদের বাড়িতে আসেননি। এমনকী আমার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এক পর্যায়ে হবিগঞ্জ ডিবির ওসি মানিকুল ইসলামের মাধ্যমে আমাকে জানায়, যৌতুক হিসেবে প্রাইভেট কার, বারিধারায় ফ্ল্যাট. আইফোন ও প্লাটিনামে রিংয়ের জন্য তিন লাখ টাকা এবং পুলিশ হাউজিং সোসাইটিতে থাকা জমির কিস্তির টাকার ব্যবস্থা না করলে আমাকে আর তার কাছে আসার অনুমতি দেওয়া হবে না।
লিখিত অভিযোগে এষা আরো উল্লেখ করেন, প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন ও সেলিমকে বোঝানোর জন্য আমার বাবা ও মামা হবিগঞ্জে যান। কিন্তু তারা সেলিমকে বুঝাতে ব্যর্থ হন। তখন হবিগঞ্জ ডিবির ওসি মানিকুল আমার বাবা ও মাকে বলেন, ‘স্যারকে (সেলিম) বুঝিলে লাভ নেই। পারলে স্যারের মা-বাবাকে বোঝান। স্যার তার মা-বাবকে খুব ভালোবাসেন।’
এলামা খন্দকার এষা আরো অভিযোগ করেন, গত ১০ অক্টোবরের বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ৩০ অক্টোবর আরেকটি বৈঠকের সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ওই বৈঠকে সেলিমের পরিবারের কেউ উপস্থিত হননি। তিনি বলেন, বিয়ে বহির্ভূত সেলিমের অভ্যাসগত একটি দোষ। এ ধরনের সম্পর্কের জের ধরে আগের সংসারে বিচ্ছেদ ঘটেছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ মোঃ সেলিম বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে সেগুলো বানোয়াট, মিথ্যা এবং ব্যক্তিগত বিষয়। এ নিয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না। অফিসিয়াল তদন্ত হচ্ছে। দেখা যাক কী হয়।





