একজন ব্যতিক্রমী প্রধান অতিথির গল্প

ফাইল ছবি

মুক্তমত

একজন ব্যতিক্রমী প্রধান অতিথির গল্প

  • আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া
  • প্রকাশিত ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

হাবিবুর রহমান মিলন, সাংবাদিকতার একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রায় তিন দশক ধরে যিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক হিসেবে ‘ঘরে-বাইরে’ শীর্ষক কলাম লিখে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলেন। অন্যদিকে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবীদের রুটি-রুজির আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা। সাংবাদিক সমাজের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)-এর সভাপতি হিসেবে তিনি দেশের এক ক্রান্তিকালে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আজ প্রিয় মিলন ভাইয়ের ৮৬তম জন্মজয়ন্তীতে তার সাংবাদিকতার ওপরে আমি কিছু বলতে যাব না। আমি একটি ভিন্ন রকমের কথা বলার মাধ্যমে প্রয়াত মিলন ভাইকে শ্রদ্ধা জানাব।

তখন দেশ সামরিক স্বৈরাচারের নিগড়ে বন্দি। প্রকৃত অর্থেই জাতির দুঃসময়। বিশেষ করে আওয়ামী বুদ্ধিজীবীর তীব্র অভাব। হাতে-গোনা দু-চারজন বুদ্ধিজীবী ছাড়া আর কেউই সরব ছিলেন না মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের তথা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের লালিত্য চিন্তাচেতনা ও স্বপ্নের স্বপক্ষে কথা বলার। সেই দুঃসময়ে বিচারপতি কে এম সোবহান, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, হাবিবুর রহমান মিলন প্রমুখই ছিলেন আমাদের একমাত্র ভরসার স্থল।

আমি তখন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস) থেকে নির্বাচিত হয়ে চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিসে কর্মরত। একই সাথে একাধারে তিনবার চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে)-এর সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এ সময় আমাদের স্বাধীনতার স্বপক্ষের বিভিন্ন সংগঠন যখন কর্মসূচি গ্রহণ করত তখন ঢাকা থেকে প্রধান অতিথি নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে হতো আমাকেই; বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠন জাতির পিতার শাহাদতবার্ষিকী, সম্মেলন কিংবা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবীনবরণ উৎসব প্রভৃতি উপলক্ষে যখন আর কাউকে জোগাড় করতে পারতাম না তখন মিলন ভাইয়ের শরণাপন্ন হতাম, কখনো বিমুখ হতাম না।

মিলন ভাইকে প্রধান অতিথি করার পেছনে অনেক সুবিধা ছিল-তাকে বিমানের রিটার্ন টিকিট দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না, এমনকি ট্রেনভাড়াও নয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ খুবই প্রভাবশালী ছিল। তারাও মিলন ভাই ট্রেন ভ্রমণ করবেন শুনতে পারলে নিজেরাই ব্যবস্থা করে দিত। অপরদিকে দু-এক রাত থাকার জন্য মিলন ভাইকে কোনো অভিজাত ক্লাব কিংবা হোটেলের ব্যবস্থা করতেও হতো না। একবার আমার বাসায়, কোনোবার সিইউজের তৎকালীন নেতা অঞ্জন সেনের বাসায় রাত কাটিয়ে দিতেন। দিনের বেলায় প্রোগ্রামের বাইরে সময় কাটাতেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে জমানো আড্ডায়।

একবার মিলন ভাইকে প্রধান অতিথি করা হলো রাউজানের ধলগড়ে যেখানে ছিল মাস্টারদা সূর্য সেনের আবাসস্থল। মিলন ভাই ৯টা-১০টা নাগাদ এসে পৌঁছবেন চট্টগ্রাম শহরের বাদামতলী রেলস্টেশনে। আমরা সেখান থেকে তাকে মাল্যভূষিত করে সোজা প্রেস ক্লাবে। পরের নির্ধারিত কর্মসূচি দুপুর ২টায়, আমরা রওনা করব ধলগড়ের দিকে।

রেলস্টেশনে আমরা সবাই ফুলের মালা নিয়ে উপস্থিত-আমি, স্বপন মহাজন, এম নাসিরুল হক, শহীদুল আলম, মোয়াজ্জেম হোসেন, অঞ্জন কুমার সেন, ব্রজলাল, স্বপন মল্লিক, দেবু প্রসাদ, নুরুল আলম, মিলন দেব, জিতু রায় চৌধুরী প্রমুখ। রেল যথাসময়ে স্টেশনে এসে পৌঁছল, সব যাত্রী একে একে নেমে যার যার গন্তব্যে চলে গেল, মিলন ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই। তখন মোবাইলের এমন চল ছিল না। ভাবলাম কোনো কারণে মিলন ভাই আসতে পারেননি। আমি সবাইকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, আগামীকাল যখন ধলগড়ে প্রোগ্রাম, অবশ্যই মিলন ভাই বিকল্প ট্রেনে সকালে এসে পৌঁছবেন। আমরা সবাই জামাল উদ্দিন ইউসুফ (সকলের প্রিয়)-কে ফুলের মালা পরিয়ে রাতের অন্ধকার ভেদ করে দুর্জয় সৈনিক দলের মতো জামালখানের দিকে রওনা হলাম।

প্রেস ক্লাবের মুখেই কর্মচারী মাহমুদুল হক জানালেন, স্যার, ঢাকা থেকে আপনাদের গেস্ট এসে কমনরুমে বসে আছেন। আমরা বিমূঢ় বিস্ময়ে রুমে ঢুকে দেখি মিলন ভাই তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শোফায় হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছেন। আপনি কখন কীভাবে এলেন? মিলন ভাই জানালেন, ট্রেনটি বাদামতলী মেইন স্টেশনে ঢোকার  আগে আউটার সিগন্যালে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। ওই স্থানটি প্রেস ক্লাবের খুবই কাছে। তাই রেল কর্মচারীদের পরামর্শমতো তিনি আউটার সিগন্যালে নেমে সোজা প্রেস ক্লাবে হেঁটে এসে পড়েছেন।

আমরা আনন্দে, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, কৃতজ্ঞতায় মিলন ভাইকে জড়িয়ে ধরে সে কী উচ্ছ্বাস! এই হলো আমাদের এক ব্যতিক্রমী প্রধান অতিথি হাবিবুর রহমান মিলন। বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের অগ্রগামী সৈনিক, সাংবাদিকতার মহিরুহ ও আমাদের সাংবাদিক সমাজের সৎ, নিষ্ঠাবান ও আদর্শিক নেতা। মিলন ভাইয়ের ঋণ আমরা শোধ করতে পারব না, চেষ্টাও করিনি। তবুও আমাদের ক্ষমা করে দেবেন প্রিয় মিলন ভাই। আপনার আত্মা চিরশান্তিতে থাকুক। আপনার জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা রইল সব সংবাদপত্রসেবীর পক্ষ থেকে।

লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশের খবর ও বাংলাদেশ নিউজ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads