প্রতিটি মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবনে এক একটি শখ থাকে। সেই শখ অনুযায়ী চেষ্টা করে কাজ করার। এরমধ্যে কেউ ছুটে চলেছেন প্রচীন ঐতিহ্যের দুর্লভ জিনিস সংগ্রহে, কেউ করছেন ভ্রমন,কেউ হয়ে উঠেন বই প্রেমিক, আবার কেউ রয়েছে খেলাধুলাসহ নানা প্রকার কাজে। এভাবেই এক একজন তাদের ইচ্ছা শক্তিকে সাধ্যনুযায়ী নিরলস ভাবে প্রাণপনে কাজ করার চেষ্টা করেন। এরইমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া পৌর শহরের বড় বাজার চন্দনসার এলাকার বাসিন্দা দক্ষিণ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মৃত নিজামউদ্দিন আহমেদের ছেলে আলী মাহমেদ দীর্ঘ বছর ধরে ইতিহাস ঐতিহ্যের বিভিন্ন ব্যতিক্রমী দুর্লভ জিনিস সংগ্রহ করে চলেছেন। তবে তাকে ছোট বড় সবাই মোহাম্মদ আলী হিসাবেই চেনেন। ইতিহাস ঐতিহ্যের বিভিন্ন ব্যতিক্রমী দুর্লভ জিনিস সংগ্রহ করায় ইতিমধ্যে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।
তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজ বাসায় সম্পূর্ণ গ্রামীণ নৈসর্গিক পরিবেশে ইতিহাস ঐতিহ্যের বিভিন্ন দুর্লভ জিনিস সংগ্রহের মাধ্যমে ব্যতিক্রমী এ সংগ্রহশালা গড়ে তুলেন।
তবে প্রচলিত অর্থে সংগ্রহশালাতে সাধারণত বিভিন্ন শতাব্দী কাল ও যুগের রাজা বাদশার প্রমাণ্য ঐতিহ্যের মূল্যবান জিনিস থাকে। কিন্তু আলী মাহমেদের সংগ্রহ শালাতে রয়েছে অনেকটাই ব্যতিক্রম।
তার সংগ্রহশালাতে রয়েছে কৃষি উপকরণ যেমন লাঙ্গল,মই ফলা,দা,কাস্তে, হাতুড়ি,ছাম,ডালা,খুন্তি,ডেঁকি ,হুক্কা,বল্লম, বদনা,পাদুকা,থালা বাটি, কোরবানির ছুরি,যুদ্ধের অস্ত্র, বুলেট,খোসা,শহীদ মুক্তিযোদ্ধের পোশাক, তলোয়ার, কলের গান, ঢাকডোল, তবল, একতারা, আকড়াই, মৃদঙ্গ,শানাই বাঁশি টোপড়, ডুলি, মঙ্গলসূত্র, পালকি, জায়নামাজ. তাজবিহ ,পুথিঁ, পাঁচালি,হ্যান্ডবিল,খারিজ খাজনা আদায়ের রশিদ, মেডেল,প্রাচীন বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ, মাটির তৈরীর তৈজসপত্র,বাঁশের খড়ের পণ্য,ঘোড়ার চাবুক,টেলিভিশন রেডিও, ঘড়ি, প্রাচীন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ইত্যাদি।
সরেজমিনে তার বাসায় গিয়ে দেখা যায় বাসার দুটি কক্ষে গ্রাম বাংলাসহ প্রাচীন ঐতিহ্যের নানা প্রকার মূল্যবান জিনিসে থাকে থাকে সাজানো রয়েছে। ঘরের বাহিরটা যেমন সুন্দর ঠিক ভেতরটা রয়েছে অপূর্ব সুন্দর। নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি তুলে ধরতে গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য, বিশ্বযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের স্মরনীয় মূল্যবান জিনিসপত্র, শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপন উপকরণসহ বিভিন্ন দৃষ্টি নন্দন ওই সব ব্যতিক্রমী জিনিসপত্র তিনি সংগ্রহ করেন। প্রতিনিয়ত ইতিহাস ঐতিহ্যের নানা প্রকার মূল্যবান জিনিসপত্র এ সংগ্রহশালায় যেন দিন দিন বাড়ছে ।
আলী মাহমেদ বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ছাত্র জীবন থেকেই দুর্লভ জিনিস সংগ্রহ করা বা দেখা তার কাছে খুবই ভালো লাগতো। দুর্লভ জিনিস যখন যেখানে পেয়েছি চেষ্টা করেছি সংগ্রহ করে রাখতে। তাছাড়া যখন যেখানে শুনেছেন ঐতিহ্যের জিনিস রয়েছে ওই জিনিসটি তিনি চেষ্টা করেছেন তা সংগ্রহ করার জন্যে। তাছাড়া বিভিন্ন এলাকার অনেক লোকজন নিজ উদ্যোগে মূল্যবান জিনিস এনে তাঁর কাছে দিয়ে গেছেন। তাদের বিশ্বাস ছিল অতি যতেœ তাঁর কাছে জিনিসগুলো থাকবে। সংগ্রহ শালায় এমন কতগুলো দুর্লভ জিনিস রয়েছে যা বর্তমান প্রজন্ম এখানে এসে প্রথম দেখছে ও তার পরিচয় জানছেন।
আলী মাহমেদ আরও বলেন,এক সময় আমরা থাকব না। কিন্তু নতুন প্রজন্মরা এসব জিনিস চিনবেনা। নতুন প্রজন্মের লোকেরা যাতে পূর্বের ওইসব জিনিস জানতে বুঝতে ও চিনতে পারে সে জন্য মূলত ওইসব সংগ্রহ করা হয়েছে বলে বলে জানায়। পাশাপাশি সহজে চিনার জন্য প্রতিটি জিনিসের মধ্যে তার নাম ও সংগ্রহের দিন তারিখ উল্লেখ করে দেওয়া আছে।
তিনি বলেন আমার একার পক্ষে ওইসব জিনিস সংগ্রহ করা কখনও সম্ভব নয়। স্থানীয় অনেক চেনা জানা মানুষ এসব জিনিস সংগ্রহে সব সময় আমাকে সাহয্য করে আসছেন। শৌখিন লোকজনরা প্রায় সময় ওইসব প্রাচীন জিনিসগুলো দেখতে তার বাড়িতে আসেন। যখন কোন লোকজন এখানে ওইসব জিনিস দেখতে আসেন তখন খুবই ভালো লাগে বলে জানায়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মাহব্বু বাংলাদেশের খবরকে জানায়, ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষনের ব্যাপারে তিনি খুবই আন্তরিক। দুর্লভ কোন জিনিসের কথা শুনলে সংগ্রহের জন্য তিনি তৎপর হয়ে উঠেন। মো. আবু ছায়েদ মিয়া বলেন, বর্তমান এ যুগে দুর্লভ জিনিস সংগ্রহ নিয়ে কেউ চিন্তা করে না। আলী মহমেদের মাধ্যমে আমরা ওইসব জিনিস দেখতে পারছি।
মো. মোবারক হোসেন বলেন, লোকমুখে শুনে তিনি তার ছেলেকে নিয়ে এখানে এসেছেন। গ্রাম বাংলার প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য, বিশ্বযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের স্মরনীয় মূল্যবান জিনিসপত্র দেখতে পেয়ে তাদের খুবই ভালো লাগছে বলে জানায়। তিনি আর ও বলেন দুর্লভ জিনিস সংগ্রহে এমন শৌখিন মানুষ পাওয়া খুবই দুষ্কর।
আখাউড়া প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী হান্নান খাদেম বাংলাদেশের খবরকে বলেন, পুরনো বহু জিনিসের সাথে আমাদের কোন পরিচয় নেই। যা এখানে রয়েছে। পুরনো জিনিসপত্র দেখতে খুবই ভালো লাগে। সময় সুযোগ পেলে এখানে আসা হয়। তিনি খুব যতœসহকারে ঐতিহ্যের জিনিসগুলো থাকে থাকে সাজিয়ে রেখেছেন।
উপজেলা সচেতন নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব মুসলেহ উদ্দিন ভূইয়া বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আলী মাহমেদ একজন প্রতিভা সম্পন্ন শৌখিন ব্যক্তি। গ্রাম বাংলা ও ইতিহাস ঐতিহ্যের বহু জিনিস আমাদের কাছে অনেকটাই যেন অপরিতি হয়ে উঠছিল। কিন্তু আজ আমরা তার মাধ্যমে বহু পুরনো জিনিস দেখতে ও চিনতে পারছি। তিনি আরও বলেন, কোথাও যখন কোন দুর্লভ জিনিসের খোঁজ পান দেরি না করে ওই জিনিস সংগ্রহে ছুটে তিনি পড়েন।





