করোনাভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান লকডাউনের মেয়াদ আরো এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে সরকার। এ লকডাউন চলবে আগামী ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে ভার্চুয়াল সভায় চলমান লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এই লকডাউনে চলমান সব শর্তই প্রযোজ্য থাকবে।
লকডাউন বাড়ানোর বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে, যাতে করোনার বর্তমান চেইনটা ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়। এতে সংক্রমণ কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এজন্যই ২২ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউনের সময় বাড়িয়ে সার সংক্ষেপ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, সাইন্টিফিক্যালি ১৪/১৫ দিন লকডাউন না হলে সংক্রমণের চেইনটা পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব হয় না। এজন্য লকডাউন অব্যাহত থাকবে।
আগের লকডাউনে দেওয়া যেসব শর্ত তা মেনে বিধি-নিষেধ আরো সাতদিন বাড়ানো হলো বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তবে ঈদের আগে এ লকডাউন শেষে ব্যবসায়ীদের জন্যও সুখবর আসতে পারে। সেটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, সংক্রমণ ম্যানেজ করা আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা মনে করছি, আরো সাতদিন লকডাউন থাকলে সংক্রমণটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। ব্যবসায়ীরা যাতে ঈদের ব্যবসা করতে পারে সেটা মাথায় রেখেই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি কী হয় সেটা বিবেচনা করেই পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এর আগে রোববার রাতে করোনা সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ৩১তম সভায় লকডাউন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। পরে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে দুই সপ্তাহের কম লকডাউনে কার্যকর ফলাফল আশা করা যায় না। দেশের অর্থনীতি সচল রাখার স্বার্থে শিল্প-কলকারখানা খোলা রাখার বিষয়টি কমিটি উপলব্ধি করে। তবে, বেসরকারি দপ্তর, ব্যাংক খোলা রাখা, ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল, ইফতার বাজারে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ভিড় লকডাউনের সাফল্যকে অনিশ্চিত করেছে। লকডাউনের সময় স্বাস্থ্যসেবা, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। খোলা রাখা যাবে এমন জরুরি সেবার তালিকা প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে কমিটি। এছাড়া কাঁচাবাজার আবারো উন্মুক্ত স্থানে বসানোর প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় কমিটি।
এদিকে কঠোর লকডাউনের মেয়াদ আরো এক সপ্তাহ বাড়ানোর কারণে দুশ্চিন্তা বাড়ছে নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে। যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থা আরো খারাপ। গত এক সপ্তাহ লকডাউনে এমনিতেই কর্মহীন কেটেছে নিম্নআয়ের মানুষদের। কাজের সন্ধানে বাইরে বের হলেও মেলেনি কাজ। ফুটপাটের লক্ষাধিক ব্যবসায়ীরাও তাদের ব্যবসা নিয়ে বসতে পারেনি। রিকশা-ভ্যান, অটোরিকশা চালকরাও পাচ্ছে না যাত্রী। ঘরে খাবার না থাকায় লকডাউন উপেক্ষা করে নিম্নআয়ের অনেকেই রাস্তায় বেরিয়েছে কাজের খোঁজে। এদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই ভাগ্য সহায় হয়নি তাদের।
পল্লবী এলাকার হাফিজ উদ্দিন জানায়, মিরপুর-১১ তে তার চায়ের দোকান ছিল। এক সপ্তাহের লকডাউন দেওয়ার পর পুলিশ আর বসতে দেই না। তাছাড়া কাস্টমারও নাই। তাই ভ্যানগাড়ি নিয়ে সবজি বিক্রি করি। মিরপুর-১ নাম্বার থেকে সবজি কিনে সকাল থেকে বিক্রি করি। কিন্তু কাস্টমার বেশি না পাওয়ায় একদিনের সবজি দুইদিনে বিক্রি করতে হয়। তিনি জানান, এখন রিকশা চালকদের অনেকেই সবজি বিক্রি করতে শুরু করেছে। যাত্রী না পাওয়ায় অনেকেই এই পেশায় নেমেছে। সবজি বিক্রেতা বেড়ে যাওয়ায় এই ব্যবসা আগের মতো নাই। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সবজি বিক্রি করে ৪-৫শ টাকা লাভ হয়। এ দিয়ে সংসার চলে না। আবার লকডাউন বেড়ে গেলে সমস্যা আমাদের মতো মানুষদের আরো বাড়বে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের মতো মানুষের কথা কেউ ভাবে না।
মিরপুরের ইব্রাহিমপুরে একটি ছোট হোটেল চালান রাজু আহমেদ। তিনি বলেন, লকডাউনের কারণে হোটেলের কাস্টমার নাই। যা বিক্রি হয় তাতে কর্মচারীদের দৈনিক খরচের টাকাও হয় না। প্রতিদিনই লোকসান হচ্ছে। এভাবে লকডাউন চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় থাকবে না। হোটেল বন্ধ করে অন্য কোনো কাজও পারিনা। তাই লোকসানের মধ্যেও হোটেল নিয়ে বসে আছি যদি আগামীতে ভালো কিছু হয়।
উল্লেখ্য, গত ১২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ১৩টি নির্দেশনা দিয়ে ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করা হয়। আর গতকাল আবারো লকডাউনের মেয়াদ এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে।





