সাইফুল বিন শরীফ
কোভিড-১৯-এর কারণে ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যদিও অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে সীমিত আকারে পাঠদান চলছে, কিন্তু তা শিক্ষার্থীদের প্রাপ্তির খাতায় শূন্যের কোটায়। করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় যে বিপর্যয় ঘটেছে তা কাটিয়ে উঠতে নিঃসন্দেহে কয়েক বছর লেগে যাবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এক্ষেত্রে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেশনজট না হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনলাইন ভিত্তিক পড়াশোনায় তারা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনের মাধ্যমে পরীক্ষা ও ভাইভাও নিচ্ছে। এদিক দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ঠিকমতো হচ্ছে না কোনো অনলাইন ক্লাস। এক বর্ষে ৮টি কোর্স থাকলে ২/৩টির মতো কোর্সের ক্লাস হয় বাকিগুলোর কোনো খোঁজ নেই। অনলাইন ক্লাসগুলোতে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীও উপস্থিত থাকে না। অধিকাংশের ডিভাইস সমস্যা, আর্থিক সমস্যা, গ্রামের ধীরগতির ইন্টারনেট এ সবকিছুকেই কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরীক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে ৩৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সাথে ভার্চুয়াল মিটিং করেছে ইউজিসি। এতে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয় যে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিতে পারবে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতি নির্ধারকদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে ইউজিসির পক্ষ থেকে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলে তাদের সুবিধামতো ব্যবস্থা নিতে পারবে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে। পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে স্নাতক শেষ বর্ষের এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের। যাদের পরীক্ষা করোনার আগে শুরু হয়েছিল কিন্তু আর শেষ করতে পারেনি তাদের দিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। আমার দৃষ্টিতে এটি নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীবান্ধব সিদ্ধান্ত। এর ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কলংক সেশনজট থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ উন্মোচন হবে। যেসব শিক্ষার্থী তাদের পরীক্ষা সমাপ্ত না হওয়ায় বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারছে না তারা লাভবান হবে।
ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া সহ আরো বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা নেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর জন্য সাধুবাদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু একটি বিষয় এখনো শিক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তায় ফেলে দিচ্ছে, আর তা হলো আবাসিক হল বন্ধ রেখে চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়া। এটা আসলে কতটুকু যৌক্তিক চিন্তার বিষয়। সরকারি নির্দেশনায় দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থী একদম অজপাড়া থেকে আসা, যাদের সাথে প্রতিটি ক্ষণ দরিদ্রতা খেলা করে। দিনে এনে দিনে খাওয়া এমন শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
১৭ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করার পর থেকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রামে বসবাস করছে। এদিকে যারা মেসে থাকত, তাদের জন্য গ্রামে থেকে মেসের ভাড়া পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই অনেক শিক্ষার্থী একেবারে মেস ছেড়ে দিয়ে বইপুস্তক নিয়ে গ্রামে চলে যায়। আর যারা আবাসিক হলে থাকত, তাদের প্রায় শিক্ষার্থী গ্রামে চলে যায়। এখন যদি শুধু পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়, তাহলে তাদের নতুন করে মেস খুঁজতে হবে। হুট করে মেস খোঁজা অসম্ভব শিক্ষার্থীদের জন্য। যেকোনো শহরে ব্যাচেলর বাসা পাওয়া অনেক কঠিন। তাছাড়া এখন চলছে করোনাকাল, সবাই যেখানে আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপন করছে, সেখানে ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেবে কে? বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা যাতে আবাসন সমস্যায় না পড়ে, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিভাগ শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবস্থার ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। আমার কথা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের হলের চেয়ে কি বাইরে নিরাপদ? নিশ্চয়ই না। সবধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে হল হবে সব থেকে নিরাপদ আবাসন শিক্ষার্থীদের জন্য। করোনার দ্বিতীয় সন্নিকটে। ইতোমধ্যে ইউরোপ আমেরিকায় দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়ে গেছে। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অতএব শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না।
তাই বাংলাদেশ সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। শিক্ষার্থীদের এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে আবাসিক হলগুলো খুলে তারপর পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আবাসিক হল খোলার ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে- ১. বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে করোনা ইউনিট চালু করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন কোনো শিক্ষার্থী করোনায় আক্রান্ত হলে তাকে যেন আইসোলেশনে রাখা যায়। ২. বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়ায় কোনো ধরনের বহিরাগত যেন প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে গভীর নজরদারি করতে হবে। ৩. পরীক্ষার হলে প্রবেশ এবং হল থেকে বের হওয়ার সময় হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের ব্যবস্থা করা এবং মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা। ৪. হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা, অযথা দুই চারজন একজায়গায় জড়ো হতে না দেওয়া এবং খাবার ডাইনিং থেকে প্রতি রুমে রুমে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করা। ৫. একসাথে সব বিভাগের পরীক্ষা না নিয়ে অনুষদের সুবিধা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
আমার মনে হয়, এ পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আর কোনো দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না এবং শিক্ষার্থীদেরকেও ভোগান্তি পোহাতে হবে না। সত্যিই যদি নীতিনির্ধারকরা শিক্ষার্থীবান্ধব চিন্তা করে থাকেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করে থাকেন, তাহলে উপরোল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন।
লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া





