চলতি মাসেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে স্থগিত ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোট। আর আগামী মাস থেকে শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপের ভোট। এসব ভোটকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের ঝনঝনানি হতে পারে বলে আশঙ্কা বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্বাচন নিয়ে সংঘাত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনও তৎপরতা শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গত বুধবার রাতে ৮টি বিদেশি পিস্তলের একটি বড় চালান জব্দ করার পর গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে এমন তথ্য পেয়েছে। পুলিশ বলছে, অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আরো জোরদার হচ্ছে।
সূত্র জানায়, করোনাভাইরাসে মৃত্যু ও সংক্রমণ নিম্নমুখী হওয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ সারা দেশের প্রায় সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দ্রুত শেষ করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব হুমায়ুন কবীর খোন্দকার বলেন, স্থগিত ১৬৭টি ইউপির মধ্যে আগামী ২০ সেপ্টেম্বর ১৬১টিতে ভোট হবে। এছাড়া চেয়ারম্যান প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে পাঁচটি এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন স্থগিত করা হয়; এগুলোতে অন্য কোনো ধাপের নির্বাচনের সময় অনুষ্ঠিত হবে।’ সচিব জানান, ২০ সেপ্টেম্বর স্থগিত ৯টি পৌরসভায়ও নির্বাচন হবে।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ের এসব নির্বাচনকে ঘিরে চাঙা হয়ে উঠছে অবৈধ অস্ত্রের বেচাকেনা। নিজ এলাকায় প্রভাব বিস্তার করার জন্য সম্ভাব্যপ্রার্থী ও তাদের ক্যাডাররা অবৈধ অস্ত্র কিনে মজুত করতে শুরু করছেন। ঢাকা মহানগগর গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সূত্র জানায়, ভারতের তৈরি ৮টি পিস্তল, ১৬টি ম্যাগাজিন, ৮ রাউন্ড গুলিসহ সমপ্রতি আকরুল হোসেন, ইলিয়াস হোসেন, আবদুল আজিম, ফারুক হোসেন ও ফজলুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে আকরুল হোসেন যশোরের শার্সা এলাকার একজন চিহ্নিত অস্ত্র চোরাকারবারি। বিভিন্ন এলাকায় সে ভারতে তৈরি দুই শতাধিক পিস্তল বিক্রি করেছে। এসব অবৈধ অস্ত্রের ক্রেতাদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। গোয়েন্দারা ওই তালিকা ধরে অস্ত্র উদ্ধার ও ক্রেতাদের গ্রেপ্তারে মাঠে নেমেছেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান জানান, গ্রেপ্তারচক্রের সদস্যরা ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্ত্র বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা বিপুল সংখ্যক অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। ভারতীয় এক একটি অস্ত্র তারা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে সংগ্রহের পর ৬০ থেকে ৭০ হাজারে বিক্রি করে। সীমান্ত এলাকাতেই তারা সাধারণত বেচাকেনা করলেও ঢাকাসহ দেশের যে কোনো প্রান্তে তারা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পৌঁছে দেয়। তবে এ জন্য তাদের অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার জানান, সমপ্রতি ঢাকার এক অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীর ওপর নজর রাখছিলেন গোয়েন্দারা। ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে ঢাকার মাটিকাটা এলাকায় এক ঠিকাদারকে গুলি করার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় কয়েকজন পেশাদার খুনিকে। পরে খুনে ব্যবহার হওয়া অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে সন্ধান করতে গিয়ে যশোর-খুলনা-বাগেরহাট ও ঢাকায় অস্ত্র কেনাবেচার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সন্ধান পাওয়া যায়। ওই চক্র ভারত থেকে চোরাপথে অস্ত্র এনে তা দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে। এ তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে তাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে তারা ঢাকায় কয়েকজন সন্ত্রাসীর কাছে অস্ত্র বিক্রি করবে বলে জানতে পারে। ওই চক্রের গতিবিধি পর্যালোচনা করে সমপ্রতি রাজধানীর দারুস সালাম এলাকা থেকে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান জোন।
অস্ত্র চোরাকারবারিরা গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, লকডাউনের আগে তারা ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিপুল সংখ্যক অস্ত্র বিক্রি করে। অস্ত্র কেনার তালিকায় যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের ইউপি নির্বাচনের বেশ কয়েকজন সম্ভব্য প্রার্থী রয়েছেন। ঢাকাতেও তারা বেশকিছু অস্ত্র বিক্রি করেছে। ক্রেতারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বলে তারা জেনেছেন। অস্ত্র চোরাকারবারিরা আরো জানায়, গত মার্চের শেষে ইউপি নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করার পর তাদের বেচাকেনা অনেকটা থমকে যায়। তবে কয়েকদিন আগে থেকে ফের নির্বাচনের আলোচনা শুরুর পর অস্ত্র বেচাকেনাও বেড়ে যায়।
গোয়েন্দারা জানান, ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের ক্যাডাররা কত অস্ত্র কিনেছে তার হিসাব না পেলেও সংখ্যায় তা খুব একটা কম নয়, এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে ইউপি নির্বাচনের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবহিত করেছেন। একই সঙ্গে অবৈধ অস্ত্র চোরাকারবারিদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
গোয়েন্দারা মনে করেন, চোরাকারবারিদের জিজ্ঞাসাবাদে যেসব ক্রেতার তথ্য পাওয়া গেছে তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে আরো অনেক থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে চোরাই সিন্ডিকেট সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলবে। যদিও অনেক অস্ত্রই প্রথম পক্ষের ক্রেতার হাত থেকে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গোয়েন্দারা আগে ফার্স্ট পার্টিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের বিশ্বাস, এদেরকে ধরা গেলে ওইসব অবৈধ অস্ত্রের সেকেন্ড ও থার্ড পার্টিকে গোয়েন্দা জালে আনা যাবে।
গোয়েন্দারা জানান, অস্ত্র বিক্রির গডফাদার হিসেবে যশোরের এক রাজনৈতিক নেতার নাম তারা পেয়েছেন। গ্রেপ্তার অস্ত্র ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ওই নেতা রাজনৈতিক ক্যাডারদের কাছেই মূলত অবৈধ অস্ত্র বেচাকেনা করেন। যে কোনো নির্বাচনের আগে তার এ বাণিজ্য চাঙ্গা হয়ে ওঠে। গোয়েন্দারা ওই গডফাদারের সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যশোরের বেশকিছু এলাকায় সীমান্ত রয়েছে। এছাড়া ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরার কয়েকটি সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন পণ্য চোরাকারবার হয়। এই সুযোগে অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের নিজস্ব লোকের মাধ্যমে অস্ত্র সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেন। এছাড়া যশোরের বেনাপোলের শার্সা সীমান্ত দিয়ে গরুর পাশাপাশি অস্ত্র আসার বিষয়টিও নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা।





