জাতীয়

আটকে আছে গরিবের তালিকা

ব্যয় হচ্ছে ৭২৭ কোটি টাকা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ৯ অক্টোবর, ২০২১

সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ টাকা ও ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে আট বছর আগে গরিবের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়। নানা জটিলতার কারণে দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হলেও শেষ হয়নি কাজ। সংশ্লিরা বলছেন, এই তালিকা তৈরিতে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ফলে সাড়ে চার বছরের প্রকল্প সাড়ে ৯ বছরে নিয়ে ঠেকানো হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সরকারের ১৪৫টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বদলে বেশ কিছু সচ্ছল ভাতা পাচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, এই অনিয়মের প্রধান কারণ হলো, দেশে ধনী ও দরিদ্রের কোনো তালিকা না থাকা। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ টাকা ও ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডাটাবেজ-এনএইচডি প্রকল্পের আওতায় ২০১৩ সালে দেশের প্রতিটি থাানা থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। উদ্দেশ্য, দেশে প্রথমবারের মতো একটি ধনী-দরিদ্রের তালিকা তৈরি করা।

জানা যায়, ২০১৩ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। চার বছর মেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সে সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩২৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। প্রথম দফায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ে। আর ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকায়। ব্যয় বাড়ানো ছাড়াই তৃতীয় দফায় এ বছরের জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু, কাজ শেষ না হওয়ায় ব্যয় বাড়ানো ছাড়াই প্রকল্পের মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়িয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার পরও তালিকা প্রস্তুত হয়নি।

এনএইচডি প্রকল্পটির প্রথম ধাপে ২০১৭ সালের এপ্রিলে মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এবং তৃতীয় ধাপে আরো ৯ মাস পর সেপ্টেম্বরে মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরিসংখ্যানের নিয়ম হলো, কোনো জরিপের আওতায় মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য নিয়ে আসার পর ছয় মাসের মধ্যে প্রাথমিক ফল ঘোষণা করতে হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে এনএইচডি প্রকল্পের ফল ঘোষণা করতে পারেনি পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ।

সর্বশেষ গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটি বৈঠক করে জানিয়েছে, গরিব মানুষের তালিকা তৈরিতে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। সেই অনুসারে প্রকল্পের মেয়াদও বেড়েছে। অর্থাৎ কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে সাড়ে চার বছরের জরিপ প্রকল্প সাড়ে ৯ বছরে নিয়ে ঠেকানো হয়েছে।

বিবিএসর মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, কাজটা শুধুমাত্র পরিসংখ্যান ব্যুরোর নয়, এর সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ অনেকগুলো সংস্থা জড়িত। আর যে প্রতিষ্ঠান জরিপের কাজ করছে তাদের সঙ্গে বিবিএসের চুক্তি নেই। প্রতিষ্ঠানটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। তারা সময়মতো কাজ করতে পারেনি। তার দাবি, প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। বর্ধিত মেয়াদের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।

গত ২০১৬ সালের ২১ এপ্রিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের এসএমওডিআরপিএ প্রকল্পের আওতায় চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান সাইনারজি-সাইনিস (জেভি) এমআইএস তৈরির কাজ করছে। চুক্তির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানোর পর চলতি বছরের ৩০ জুন মাসে সময় শেষ হয়ে গেলেও নির্ধারিত কাজ শেষ হয়নি।

তবে এনএইচডি প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবরের মধ্যে তিন ধাপে সারা দেশের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ডাটাবেজও তৈরি আছে। ডাটাবেজের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এমআইএস এখনো প্রস্তুত না হওয়ায় কাজ শেষ করা যাচ্ছে না।

এদিকে, গতবছর মার্চ থেকে দেশজুড়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়লে খাদ্য সংকটে পড়া দরিদ্র মানুষের জন্য ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করে সরকার। লক্ষ্য ছিল, পর্যায়ক্রমে ৫ কোটি দরিদ্রকে এই ডাটাবেজের আওতায় আনা হবে। এরপর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ওই ডাটাবেজ প্রকাশ করা হবে। তালিকা অনুযায়ী প্রতি সপ্তাহে সবাইকে একযোগে দেওয়া হবে সরকারের ত্রাণ সহায়তা। দেশে যতদিন করোনা পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকবে, ততদিন এই সহায়তা প্রদান করবে সরকার। কিন্তু ধনী-গরিবের তালিকা করার জন্য সরকার এর আগে বহুবার উদ্যোগ ও অর্থ ব্যয় করার পরও চূড়ান্ত কোনো তালিকা তৈরি করতে পারেনি।

জানা যায়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের মাধ্যমে প্রত্যেক ওয়ার্ডে তৈরি করা হয় দরিদ্রদের তালিকা। এরপর প্রত্যেক ওয়ার্ড থেকে দরিদ্রদের নাম নিয়ে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে (ইউডিসি) ডাটাবেজ করা হবে। সেই তালিকা সংশ্নিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে পাঠানো হবে। প্রত্যেক ইউএনও নিজ জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কাছে পাঠাবেন দরিদ্রদের ওই তালিকা। এরপর জেলা প্রশাসক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন। ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

এদিকে, মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের পর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ পর্যায়ক্রমে সারা দেশের দরিদ্র মানুষের তালিকা কেন্দ্রীয়ভাবে ডাটাবেজ করবে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ এটি সংরক্ষণ করবে। যাতে কেউ তালিকা পরিবর্তন করতে না পারে, একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ না পায়, এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করা হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। কোনো অভিযোগ থাকলে সেটাও অনলাইনে গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া এই তালিকায় কোনো অনিয়ম হলে সরাসরি অভিযোগ করা যাবে ৩৩৩ নম্বরে কল করে। এ জন্য এখন থেকে ৩৩৩ নম্বরের সংযোগ দুর্যোগব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ থেকে জানা যায়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা দরিদ্রভুক্ত সব মানুষকে ডাটাবেজে আনা সরকারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই করোনা পরিস্থিতিতে ঠেকায় পড়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি তালিকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দ্রুত কাজ করার জন্য এক্সেল পদ্ধতিতে তালিকাটি করা হয়। কারণ, ডাটাবেজ আলাদা করা হলে অনেক সময় লেগে যাবে।

স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের দাবি, সরকারিভাবে মাঠ পর্যায়ে ত্রাণ বিতরণের সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। পুরনো ধাঁচে ত্রাণ বিতরণ প্রক্রিয়ার কারণে এমনটি হচ্ছে। তা ছাড়া যাদের এখন ত্রাণ খুব প্রয়োজন, তাদের নাম সঠিক জায়গায় যাচ্ছে না। বিবিএস যদি ওই তালিকাটি করতে পারত, তাহলে ত্রাণ নিয়ে এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হতো না।

পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সভাপতি কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অনিয়ম হচ্ছে। আগে থেকেই এ ধরনের অনিয়মে যদি কঠোর শাস্তিনিশ্চিত করা যেত, তাহলে কোনো অনিয়ম করার সাহস পেত না। নতুন করে আর যাতে ত্রাণ নিয়ে অনিয়ম না হয় সে জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের-টিআইবি মতে, মহামারির সময় এটি অনেক ভালো উদ্যোগ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যাচাই-বাছাই করে স্বচ্ছ তালিকা করা অনেক কঠিন। এজন্য সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। তালিকা যেন বস্তনিষ্ঠ হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। কারণ, এই দুর্যোগ সবার জন্য। আর দরিদ্রদের জন্য তালিকা করা হলে নিয়মিত সেটি হালনাগাদ করতে হবে। তা যেন রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনায় না হয়, সেদিকেও খেয়াল করতে হবে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads