টিম সাউদির চতুর্থ ওভারের পঞ্চম বলে উইকেটের পেছন দিয়ে বাউন্ডারী হাঁকালেন মারমুখি ব্যাটার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। সঙ্গে সঙ্গে নতুন ইতিহাস রেখা হয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে। মাঠে শুরু হলো খেলোয়াড়দের বাধভাঙ্গা উল্লাস, যার প্রভাবও পড়ে গ্যালারীতে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন এখন অস্ট্রেলিয়া।
টেস্ট ও ওয়ানডেতে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে শক্তিশালী দল হলেও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কোনো শিরোপা ছিল না তাদের দখলে। ২০০৭ সাল থেকে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকে অপেক্ষার পালা শুরু হয় অজিদের। এক এক করে ছয়টি বিশ্বকাপ চলে গেলেও শিরোপার দেখা পায়নি অস্ট্রেলিয়া। অবশেষে এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে চৌদ্দ বছরের অপেক্ষা ঘুচলো তাদের অ্যারন ফিঞ্চের নেতৃত্বে। রোববার দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে সপ্তম বিশ্বকাপের শ্বাসরুদ্ধ ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটের বড় ব্যবধানে পরাজিত করলো নিউজিল্যান্ডকে। সেইসঙ্গে ‘প্রথম’ শিরোপার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল কেন উইলিয়ামসন বাহিনীর। ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের ৪ উইকেটে ১৭২ রানের জবাবে অস্ট্রেলিয়া ১৮.৫ ওভারে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে করে ১৭৩ রান।
১৭৩ রানের জয়ের টার্গেট নিয়ে ব্যাট করতে নেমে বেশ চাপে পড়েন অস্ট্রেলিয়ার দুই ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার ও অ্যারন ফিঞ্চ। বিশেষ করে ফিঞ্চ ঠিকমতো খেলতে পারছিলেন না। তাকে আউট করেই কিইরা প্রথম উইকেট লাভের উল্লাসে মাতে। দলীয় ১৫ রানের সময় বোল্টের বলে তিনি ক্যাচ তুলে দেন মিচেলের হাতে। আর ক্যাচটিও বেশ দারুণ ভঙ্গিতে লুফে নেন তিনি। ফিঞ্চ ৭ বলে ১টি চারে করেন ৫ রান। ওয়ার্নারের সঙ্গে জুটি বাঁধেন মিচেল মার্শ। এ জুটি বেশ আস্থার সঙ্গে দলের রান বাড়াতে থাকে। এ জুটি ৯২ রান করার পর ওয়ার্নার আউট হন। দলীয় ১০৭ রানের সময় কিউই গতিদানব বোল্টের বলে সরাসরি বোল্ড হন বিশ^ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার ওয়ার্নার। এটা ছিল বোল্টের দ্বিতীয় উইকেট শিকার। আউট হওয়ার আগে ওয়ার্নার ৩৮ বলে ৪টি চার ও ৩টি ছয়ে ৫৩ রান করেন। ওয়ার্নারের মতো মার্শও ছয় হাঁকিয়ে হাফসেঞ্চুরি করেন। তিনি সোধির বলে ঐ ছয় মারেন। তৃতীয় জুটিতে দারুণ ব্যাটিং করে মার্শ ও গ্লেন ম্যাক্সওয়েল জুটি দলের জয় নিশ্চিত করেন। ম্যাচসেরা মার্শ ৫০ বলে ৬টি চার ও ৪টি ছয়ে ৭৭ রানে অপরাজিত থাকেন। আর জয়সূচক রান হরা ম্যাক্সওয়েল ১৮ বলে ৪টি চার ও ১টি ছয়ে অপরাজিত থাকেন ২৮ রান নিয়ে।
‘অল-ওশেনিয়ান’ ফাইনালে টস জয়ের মাধ্যমে কিছুটা হলেও এগিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ^কাপে প্রায় সব ম্যাচেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে টস। শিশিরের কারণে পরে ব্যাট করা দল পেয়েছে বাড়তি সুবিধা। ব্যাটিং করাটা কিছুটা সহজ হয়ে যায়। অন্যদিকে বোলিং করা হয়ে পড়ে দুরূহ। তার উপর অন্য দুটি মাঠের তুলনায় দুবাই স্টেডিয়ামের মাঠে তো টস আরও বেশি ম্যাচের ফল নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। সেমিফাইনাল পর্যন্ত এই মাঠে হওয়া ১২ ম্যাচের ১১টিতেই জিতেছে পরে ব্যাট করা দলগুলো। শিরোপা উঁচিয়ে ধরার লড়াইয়ে এদিন বাধ্য হয়েই একটি পরিবর্তন আনতে হয়েছে নিউজিল্যান্ডকে। হাত ভেঙে ফেলায় বিশ^কাপ শেষ হয়ে যাওয়া উইকেটরক্ষক ব্যাটার ডেভন কনওয়ের বদল অনুমিতই ছিল। তার জায়গায় একাদশে ঢুকেছেন আরেক উইকেটরক্ষক ব্যাটার টিম সেইফার্ট।
প্রথমে ব্যাট করতে নেমে কঠিন চাপে পড়ে যায় নিউজিল্যান্ড। দলীয় ২৮ রানের সময় হ্যাজেলউডের বলে উইকেটকিপার ওয়েডের কাছে ক্যাচ তুলে দিয়ে সাজঘরে ফিরে যান সেমিফাইনালের নায়ক ড্যারেল মিচেল। তিনি ১টি ছয়ে ৮ বলে করেন ১১ রান। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে খেলছেন মার্টিন গাপটিল ও কেইন উইলিয়ামসন করেন ৪৮ রান। দলীয় ৭৬ রানের মাথায় গাপটিল অজি স্পিনার জাম্পার বলে স্টোনিসের কাছে ক্যাচ তুলে দেন। গাপটিল করেন ৩৫ বলে ৩টি বাউন্ডারীতে ২৮ রান। পাওয়ার প্লে’তে ভালো রান তুলতে পারেনি নিউজিল্যান্ড। তবে তৃতীয় জুটিতে উইলিয়ামসন ও ফিলিপস যোগ করেন ৬৮ রান। দলীয় ১৪৪ রানের সময ফিলিপস হ্যাজেলউডের বলে ম্যাক্সওয়েলের হাতে ধরা পড়েন। তিনি ১৭ বলে ১টি করে চার ও ছয়ে করেন ১৮ রান। এরপর দলীয় ১৪৮ রানের মাথায় সবচেয়ে দামী উইকেটটি হারায় কিউইরা। অধিনায়ক উইলিয়ামসন ৪৮ বলে ১০টি চার ও ৩টি ছয়ে ৮৫ রান করে হ্যাজেলউডের তৃতীয় শিকারে পরিনত হন। উইলিয়ামসনের ক্যাচটি লুফে নেন স্টিভেন স্মিথ। শেষ পর্যন্ত নিশাম ৭ বলে ১টির ছয় সহ ১৩ এবং সেইফার্ট ৬ বলে ১টি বাউন্ডারীতে ৮ রানে অপরাজিত থাকেন।
অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে হ্যাজেলউড ৪ ওভারে মাত্র ১৬ রান দিয়ে ৩টি উইকেট লাভ করেন। অপর উইকেটটি পান জাম্পা ২৬ রানের বিনিময়ে।
সুপার টুয়েলভ পর্বে অংশ নেয় বাংলাদেশ সহ ১২টি দেশ। বাংলাদেশ, সাবেক চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত ও শ্রীলঙ্কা, শক্তিশালী দল দক্ষিণ আফ্রিকা, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড আর আফগানিস্তান সেমিফাইনালের আগেই বিদায় নেয়। এরপর জমজমাট দুটি সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেয় আরো দুই সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান দল। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এগিয়ে অস্ট্রেলিয়াই। গতকালের ম্যাচের আগে ১৪ বার মুখোমুখি হয়ে ৯ বারই জেতে অজিরা। আর পাঁচ জয় কিউইদের। গতকালের আগে বিশ^কাপের মঞ্চে একবারই দেখা হয় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের। সেটিতে জয় পেয়েছিলো কিউইরা। ২০১৬ সালে সুপার টেনে গ্রুপ-২ এর ঐ ম্যাচে ৮ রানে জিতেছিলো নিউজিল্যান্ড। টি-টোয়ন্টিতে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ দেখা হয়েছিলো দু’দলের। নিউজিল্যান্ডে ঐ সফরে ৫ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ ৩-২ ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল অজিরা।





