জাতীয়

জাতীয় শোক দিবস আজ

অশ্রুঝরা দিন

  • এম এ বাবর
  • প্রকাশিত ১৫ অগাস্ট, ২০২১

আবহমানকাল থেকে চলে আসা বাংলার শাসনভার ন্যস্ত হয়ে যায় পরাধীনতায়। বহু সংগ্রামের পরে বাংলা শোষণমুক্ত হলেও দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্গত একটি প্রদেশ হয়ে কিছুটা নিজস্বতা পেলেও পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়ে নিজেদের স্বাধীনতা তো দূরের কথা, মৌলিক অধিকারটুকুও হারিয়ে ফেলে।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। যার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে। দিতে হয়েছে তরতাজা কতগুলো প্রাণ। পূর্ববঙ্গ (বাংলাদেশ) বাংলা ভাষা ফিরে পেলেও হারিয়ে ফেলে সকল প্রকার স্বাধীনতা। এমনকি নিভৃতে শোষিত হতে থাকে বাংলার জনগণ। দিনভর পরিশ্রম করেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের পেটে ভাত জোটে না আর পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যাংক ভর্তি হয়, গড়ে ওঠে শিল্পকারখানা। ঠিক তখনই বাংলার আকাশে ধ্রুব সত্য হয়ে জ্বলে ওঠে আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে তিনি পাকিস্তানের তথা পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতাতে পরিগণিত হন। জনপ্রিয় এই নেতা সব সময় চেয়েছেন বাংলার মেহনতি মানুষের মুক্তি, বাংলাকে শোষণ মুক্ত করতে। তাই তো তিনি প্রস্তাব রাখলেন বাঙালি মুক্তির সনদ ছয় দফা দাবির মাধ্যমে।

ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবির পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকরা চেয়েছিলেন শেখ মুজিবকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে। কিন্তু যতবারই তারা মিথ্যা হয়রানি করতে চেয়েছে ততবারই বাঙালি আপামর জনতা রুখে দাঁড়িয়েছে। ছিনিয়ে এনেছে জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে। তাই তো আগরতলার মিথ্যা মামলা দিয়েও পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবুর রহমানের কিছুই করতে পারল না বরং মুজিব হয়ে উঠলেন বাঙালির বন্ধু, স্বজন ও প্রিয়জন। তাই তো বাঙালি জাতি তাকে স্বাগত জানাল বঙ্গবন্ধু উপাধিতে।

দেশের প্রতি মমত্ব, একনিষ্ঠ ভালোবাসা, ত্যাগ-তিতিক্ষায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন সাধারণ নেতা থেকে হয়ে উঠলেন বাঙালির শাশ্বত নেতা, যিনি আর নন শুধু আওয়ামী লীগ নেতা। নদীবিধৌত এই বঙ্গদেশে যেমন বর্ষার জোয়ারে পলল জমে ভূমি উর্বর হয়েছে, ঠিক গণজোয়ারে মুজিব হয়ে উঠলেন গণমানুষের মুক্তিকামী একটি নাম। সত্তরের নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হলেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রধান হিসেবে। গণমানুষের রায় অস্বীকার ও বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় পূর্ববাংলার মানুষ ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এলেন। বঙ্গবন্ধু তার উদার দৃষ্টিতে একটি জ্বলন্ত অগ্নি চোখে দেখলেন বাঙালির মুক্তি। তাই তিনি দেরি না করে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিয়ে দিলেন-‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

কিছু বিদ্রোহী, পাকিস্তান সর্মথক যারা পরবর্তীতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস প্রভৃতি নামে পরিচিত, তারা ছাড়া সকলস্তরের বাঙালির অংশগ্রহণে পূর্ববাংলা পাকিস্তানমুক্ত হলো। জন্ম হলো একটি স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ। এত দিনের বাংলার আপামর জনতার বন্ধু হয়ে উঠলেন বাঙালি জাতির পিতা। দেশের মানুষ বাংলার মুক্ত আকাশে লাল-সবুজের পতাকায় পিতাকে পেয়ে স্বাধীনতার সুখ পেলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতাযুদ্ধে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছিল তাদের সাধারণ ক্ষমা করে বিশ্বে দৃষ্টন্ত স্থাপন করলেন, মানবতার এক বিশাল মহানুভবতা দেখালেন তিনি। কিন্তু যাদের তিনি প্রাণ ভিক্ষা দিলেন তারাই চক্রান্ত করে তার প্রাণ কেড়ে নিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলার জমিনে এক অন্ধকার রজনি। এই রজনিতে সেনাবাহিনীর কিছু বিদ্রোহী ও উচ্চাভিলাষী অফিসার শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই হত্যা করেনি, ঘুমন্ত বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে। ঘাতকের বুলেট থেকে রক্ষা পায়নি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শিশুপুত্র শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্নেল জামিল, সেনাসদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক। একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে হত্যা করে শেখ ফজলুল হক মণি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণিকে। বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় হামলা করে আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ, নাতি সুকান্ত বাবু, সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব এবং এক আত্মীয় বেন্টু খানকে হত্যা করে।

১৯৭৫-এর ১৬ আগস্ট শোকে যখন সমগ্র জাতি বিহ্বল, তখন সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনের মাধ্যমে সারা দেশের মানুষকে জিম্মি করা হয়, মিডিয়ার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু হত্যার কথা প্রচার করে মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করা হয়, রাজধানীতে থমথমে ভাব বিরাজ করে। তৎকালীন ডিজিএফআই মহাপরিচালক আবদুর রউফের নির্দেশে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শুধু বঙ্গবন্ধুর মরদেহ নিয়ে গিয়েছিলেন তৎকালীন ডিজিএফআই কর্মকর্তা কাজী হায়দার আলী। হেলিকপ্টার চালিয়ে নিয়ে গিয়ে ছিলেন ফ্লাইট লে. শমসের।

হেলিকপ্টার থেকে মরদেহ নামানোর পরে বঙ্গবন্ধুর জ্ঞাতি চাচা ৭০ বছরের বৃদ্ধ মোশাররফ হোসেনকে মরদেহ হস্তান্তর করেন হায়দার আলী। হাজার হাজার বঙ্গবন্ধু ভক্ত অনুরাগী টুঙ্গিপাড়ায় ছুটে আসতে নিলেও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে প্রশাসন জনগণকে বাধা দেয়। বঙ্গবন্ধু পরিবারের লোকজনও নিরাপত্তার খাতিরে আত্মগোপন করেন। হেলিকপ্টার থেকে মরদেহ নামিয়ে ছিলেন টুঙ্গিপাড়ার তৎকালীন সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার কাসেম, পোস্ট মাস্টার আনোয়র হোসেন, স্থানীয় মেম্বার আব্দুল হাই এবং গ্রামবাসীদের মধ্যে আকবর কাজী, মো. ইলিয়াস হোসেন, জহর মুন্সি, সোনা মিয়া কবিরাজ, শেখ নুরুল হক, গেদু মিয়া, সোহরাব মাস্টারসহ আরো কয়েকজন। লাশ নামানোর পরে কফিনসহ দ্রুত দাফন করার তাগিদ দিলে মৌলভী আব্দুল হালিম লাশ না দেখে দাফন করতে আপত্তি জানান। একজন মুসলমানকে ইসলামী বিধি বিধান মেনে দাফনের দাবি জানান। মৌলভির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সেনা অফিসাররা (সব নিয়ম মেনে) ১৫ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফনের অনুমতি দেন।

কবর আগে থেকেই প্রস্তুত করা হয়ে ছিল। লাশের কফিন খুলতে না পারায় কাঠমিস্ত্রি হালিম শেখকে নিয়ে আসা হয়, সহযোগী হিসেবে ছিলেন হালিম শেখের ১০ বছর বয়সি পুত্র আয়ুব আলী শেখ। কফিন থেকে জাতির পিতার লাশ বের করে গোসলের জন্য স্থানীয় আশরাফ মোল্লার দোকান থেকে কিনে আনা হয় ৫৭০ সাবান। জাতির পিতার শেষ গোসল করিয়ে ছিলেন মান্নাফ শেখ, সোনা মিয়া ও ইমান উদ্দিন গাজী।

বঙ্গবন্ধুর মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত সাহেরা খাতুন হাসপাতালে রেডক্রিসেন্টের রিলিফের কাপড় পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই। আবদুল হাই শেখ ওই হাসপাতালে কর্মরত নার্স দীপালীর কাছে থেকে ত্রাণের শাড়ি নিয়ে আসেন। সেই শাড়ির জমিন ছিল সাদা আর পাড় ছিল লাল-কালো, পাড় ছিঁড়ে ফেলে সাদা কাপড়ে স্বাধীন বাংলার স্থপতি বন্ধুবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শেষ কাপড় পরিধান করানো হয়। যদিও জীবদ্দশায় বঙ্গবন্ধু পোশাকে ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা। সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা আর কোট, অবসরে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরতেন তিনি।

জানায়ায় লক্ষ লক্ষ লোক হয়তো সমবেত হবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন; কিন্তু মানুষকে না জানিয়ে, দ্রুত দাফন করার ব্যবস্থা করা হয়। আশপাশের গ্রাম থেকে যারা জানাজায় অংশ নিতে আসার চেষ্টা করেন তাদেরও বাধা দেওয়া হয়। শুধু দাফন কাজে যারা সহযোগিতা করতে পেরেছিলেন সেই ২৫-৩০ জন জানাজায় অংশ নিতে পারেন। তিন লাইনে দাঁড়ানো জানাজায় ইমামতি করেছিলেন মৌলভি আবদুল হালিম। দাফন শেষে আত্মার শান্তি কামনা করে মোনাজাতও করেছিলেন তিনি।

পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা শেখ সাহেরা খাতুনের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফন শেষে সেনাসদস্যরা ডায়েরিতে শেখ আব্দুল মান্নাফের স্বাক্ষর গ্রহণ করে চলে গেলেও কবর পুলিশ পাহারায় রেখে যায়, যাতে সাধারণ লোক কবরের কাছে না ভিড়তে পারেন। তবুও টুঙ্গিপাড়াবাসী বঙ্গবন্ধুর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মিলাদ ও কোরআনখানির আয়োজন করেছিল। সারা দেশেই বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে গোপনে বঙ্গবন্ধুর আত্মার শান্তি কামনা করা হয়েছিল।

আজ রোববার জাতীয় শোক দিবস। স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৬তম শাহাদতবার্ষিকী।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধার সাথে পালন করে দিনটি। তবে এবার বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)-এর কারণে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতপূর্বক স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি পালন করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে-আজ সকাল সাড়ে আটটায় ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। বেলা ১১টায় টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল শ্রদ্ধা নিবেদন করবে। এছাড়া দেশের সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। আগামীকাল (১৬ আগস্ট) বেলা সাড়ে ৩টায় জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখবেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads