ত্রাণসামগ্রী বিতরণে অনিয়ম করার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমন তথ্য দিয়েছেন দেশের ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ইউএনও। এ ধরনের চাপে অতিরিক্ত ত্রাণসামগ্রীর জন্য সুপারিশ করতে বাধ্য হতে হয় বলেছেন ২০ শতাংশ ইউএনও। এমন চিত্র উঠে এসেছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায়।
টিআইবির গবেষণায় উপজেলা পরিষদে সাচিবিক সহায়তা প্রদান সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী ইউএনও অবৈধ আর্থিক সুবিধা অনুমোদন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। এ ধরনের অবৈধ আর্থিক সুবিধা অনুমোদন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ প্রধানত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আসে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ‘স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উপজেলা নারী নির্বাহী কর্মকর্তার চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক টিআইবির গবেষণাপত্রে এসব তথ্য জানানো হয়। অনলাইন প্ল্যাটফরমে সংবাদ সম্মেলনে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করা হয়। এসময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি (পরিচালক) মোহাম্মাদ রফিকুল হাসান, সিনিয়র ফেলো-রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি শাহজাদা এম আকরাম, প্রাক্তন সিনিয়র প্রোপ্রাম ম্যানেজার (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) আবু সাঈদ মো. জুয়েল মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ ইউএনও জানিয়েছেন, ব্যয়ের যথার্থতা যাচাই না করার জন্য তাদের বিভিন্ন মহল থেকে চাপ প্রয়োগ করা হয়। ভুয়া ব্যয়ের বিল অনুমোদন দিতে বাধ্য করা হয় বলে উল্লেখ করেছেন ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ ইউএনও। উপজেলা পরিষদের ক্রয়সংক্রান্ত কাজে অনিয়ম করার জন্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় বলেছেন ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ইউএনও। ২৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ ইউএনও বলেছেন, কাজ সম্পাদন করার ক্ষেত্রে তারা সহকর্মীদের থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান না।’ টিআইবির মতে, দেশে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) প্রতি এখনো নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। এছাড়া, উন্নয়নকাজ তদারকিসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের সময় ৫ দশমকি ৭ শতাংশ নারী ইউএনও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও গবেষণায় উঠে আসে। নারী ইউএনওর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, জেন্ডার চাহিদা বিবেচনায় রেখে মাঠপর্যায়ে উন্নয়নকাজ পরিদর্শন ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বিশেষ কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই।
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘ইউএনও একটি উপজেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ইউএনও বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের পদমর্যাদা ক্রমানুসারে সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার একটি। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নারী ইউএনও কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, তা বিশ্লেষণ করাই ছিল এ গবেষণার উদ্দেশ্য। এ গবেষণায় উপজেলা পরিষদে সাচিবিক সহায়তা প্রদান, উপজেলা চেয়ারম্যানকে সহায়তা প্রদান, উপজেলা পরিষদসহ অন্যান্য বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং উপজেলা প্রশাসনের সরকারি নির্দেশনাবলি পালনসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জসমূহ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।’
গবেষণা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, উপজেলা চেয়ারম্যানকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে নারী ইউএনও যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন, তার মধ্যে চেয়ারম্যানের কাছ থেকে যথাযথ সহযোগিতা না পাওয়া (৪০ দশমিক ৫ শতাংশ) অন্যতম। ৩১ দশমকি ৪ শতাংশ ইউএনও জানিয়েছেন, উপজেলায় দুর্নীতিবিরোধী কাজের ক্ষেত্রে তারা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। এছাড়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইউএনও (৩১ দশমিক ৪ শতাংশ) জানিয়েছেন, তাদেরকে বিভিন্ন মহল থেকে অনৈতিক কাজের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। উপজেলার কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ইউএনওরা (৩১ শতাংশ) রাজনৈতিক প্রভাবের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।
টিআইবির গবেষণা অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ইউএনও বাধার সম্মুখীন হন। এছাড়া উন্নয়ন কার্যাবলি তদারকিসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের সময় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ ইউএনও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এসব দায়িত্ব ইউএনও পালন করেন চেয়ারম্যানের কার্যক্রমকে সহজতর করার জন্য। এছাড়াও রয়েছে সমন্বয় সাধন, সরকারি নির্দেশ পালন, দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ।
দুর্নীতির শিকার হলে অভিযোগ করার জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন ৫৭.৮% ইউএনও। ৩৫.৬% ইউএনও জানিয়েছেন, উপজেলা প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য তারা প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। কারো দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তি প্রদান করা হয় বলে জানিয়েছেন ২৮.৯% ইউএনও।
উপজেলায় দুর্নীতিবিরোধী বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করেন ২৮.৯% ইউএনও। এছাড়া উপজেলায় দুর্নীতির প্রবণতা কমিয়ে নিয়ে আসার জন্য নৈতিকতা কমিটি গঠন এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির বিরদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন যথাক্রমে ২২.২% ও ৪.৫% নারী ইউএনও।
এছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে ইউএনওরা রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে পুরষতান্ত্রিক/পিতৃতান্ত্রিক মনোভাবের মুখোমুখি হন। ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ও বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের পরিকল্পনা ও সম্পাদনকালীন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের থেকে অনিয়ম করার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকারও হতে হয়। এছাড়া ইউএনরা দুর্নীতিবিরোধী কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন এবং অনেক সময় তাদেরকে অনৈতিক কাজ করতে চাপ প্রয়োগ করা হয়।
নারী ইউএনওদের হয়রানি বন্ধের পাশাপাশি দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে ৮টি সুপারিশ করেছে টিআইবি। যার মধ্যে রয়েছে-নারী ইউএনওদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দূর করার জন্য উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা পরিষদের অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে নারীর প্রতি সংবেদনশীল আচরণের ওপর প্রশিক্ষণের আয়োজন করা; উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাচিবিক সহায়তা প্রদান সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ইউএনও এবং চেয়ারম্যানগণকে নিয়ে ওরিয়েন্টেশনের আয়োজন করা-যার মূল লক্ষ্য হবে একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয় বরং সহযোগী এটা অনুধাবন করানো; দুর্নীতি প্রতিরোধে নারী ইউএনও-র পদক্ষেপের জন্য জেলা পর্যায়ে তাকে সম্মানিত করা এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা; উন্নয়নমূলক কাজ সম্পাদন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে কোনো নারী ইউএনও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর আক্রমণ ও ষড়যন্ত্রের শিকার হলে তাকে আইনগত সহায়তা দেওয়া ও নিরাপত্তা প্রদান করা; সংবাদমাধ্যমগুলো স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথাসাধ্য সঠিক সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে ইউএনও-র কার্যক্রম সম্পাদনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা প্রদান করা; মন্ত্রণালয়ের নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদদের স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজে চাপ প্রয়োগ বন্ধ করার জন্য পরিপত্র জারি করা; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারী ইউএনও-র সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর নারী ইউএনওদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং নারী ইউএনওকে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর হওয়া।





