মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সন্তান হারানোর স্মৃতি

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশ

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সন্তান হারানোর স্মৃতি

  • প্রকাশিত ১১ ডিসেম্বর, ২০২০

১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় এক লাখ সদস্যের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের এই বিজয় জাতির শ্রেষ্ঠতম অর্জন।

একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ডিসেম্বর মাস আমার জন্য শ্রেষ্ঠতম আনন্দ ও বেদনার মাস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ক্র্যাক ডাউনের পর ২৭ মার্চ হেঁটে, রিকশা এবং নৌকায় অনেক কষ্টে নরসিংদী পৌঁছেছিলাম। নিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। যোগাযোগ করেছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত মেজর নূরুজ্জামানের সঙ্গে। ২ এপ্রিল ক্যাপ্টেন মতিউরের পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। বিকালে নরসিংদীর পাঁচদোনা পৌঁছালে পাকবাহিনী নৌ, রেল ও স্থল তিন দিক থেকে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে শুরু হয় মুখোমুখি যুদ্ধ। শত্রুবাহিনী ছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। তাদের অতর্কিত আক্রমণে আমরা হতবিহ্বল হয়ে পড়লেও অসীম সাহসিকতায় যুদ্ধ চালাতে থাকলাম। পাকবাহিনীর ৮-১০ জন সৈন্য হতাহত হলো। উড়িয়ে দেওয়া হলো তাদের ২টি গাড়ি। আমাদের কয়েকজন হতাহত হলো।

আমিসহ আমরা তিন ভাই মুক্তিযোদ্ধা। আমার ছোট ভাই গেরিলা যোদ্ধা শাহ আলম চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। ১৯৭১-এর এপ্রিল মাসে আমি আগরতলা যাই। মূলত সেখানেই সর্বজনাব মিজানুর রহমান চৌধুরী, শেখ জামাল, আবদুস সামাদ আজাদ, গাজী গোলাম মোস্তফা, কর্নেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর হায়দার, মেজর নূরুজ্জামান, আওয়ামী লীগ নেতা বজলুর রহমান প্রমুখ নেতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ হয়। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টার। সে দায়িত্ব থেকেই ২৫ এপ্রিল আমি, খালেদ মোশাররফ ও কুমিল্লার হোমনার এমপি প্রফেসর মোজাফফর আলীকে নিয়ে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করি। তার নির্দেশনা গ্রহণ করে কলকাতা থেকে আগরতলায় ফিরে আসি। সংগঠক হিসেবে সে সময় মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্পসহ ত্রিপুরার অনেক ক্যাম্পেই প্রতিনিয়ত যেতে হতো আমাকে। সূর্যমণিনগর হাসপাতাল যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য, পরিদর্শনে গিয়ে দেখা হলো আমার স্কুলজীবনের বন্ধু গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। এ সময় অর্থাৎ ২৮ মে তৎকালীন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা ও দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলারও সুযোগ হয় আমার।

আমি ১ জুন হোমনার এমপি প্রফেসর মোজাফফর আলী ও ছাত্রলীগ নেতা আলীসহ হবিগঞ্জের মাধবপুর বর্ডার দিয়ে দেশে প্রবেশ করি। রাত ২টা ৩০ মিনিটে বর্ডার ক্রস করতে সাহায্য করলেন ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিন (পরে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন)। সারাদিন চলার পর রাতে ঝড়-বাদলে মাঝি পথ হারিয়ে ফেলায় অনেক কষ্টে ৩ জুন সকালে প্রফেসর মোজাফফর আলী এমপির এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠলাম। পরদিন সকালে বাঞ্ছারামপুরের এমপি মহিউদ্দিনের খোঁজে তার এলাকায় গিয়ে তাকে পেলাম ডোমরাকান্দিতে। এরপর রায়পুরার এমপি আফতাব উদ্দিনের সঙ্গে দেখা হলো নিলিক্ষায়। শিবপুর-মনোহরদীর এমপি ফজলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় হাইরমারা গ্রামে চেয়ারম্যান আবদুল হাইয়ের বাড়িতে। তাদের সবাইকে প্রধানমন্ত্রীর মেসেজ জানাই এবং তারা সবাই আগরতলায় তথা ভারতে যাওয়ার ব্যাপারে একমত হন। এভাবে ২১ জুন পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এমপি, মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও মুক্তিকামী বাঙালিদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে আলোচনা ও সাক্ষাৎকার কার্যক্রম চালাই। ২২ জুন নিজ গ্রাম নরসিংদীর আলোকবালীতে যাই। চলতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজ। আমাদের বাড়িতে ২৯ জুন রাতে পরিবার-পরিজনসহ এলেন নরসিংদীর এমপি মোসলেহউদ্দিন। তাকে পেয়ে আমার কাজে অনেকটাই সুবিধা হলো। এ সময় আলোকবালী নিরাপদ নয় ভেবে পরিবার-পরিজন স্থানান্তর করলাম বাঞ্ছারামপুরে। সেখানেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলো আমার ছোট মেয়ে সুইটি। পরে সে হোমনায় মারা গেল বলা যায় বিনা চিকিৎসাতেই। পরিবার-পরিজন রেখে ৩০ জুলাই আবারো ঢাকার পথে রওনা হলাম। পায়ে হেঁটে, নৌকায়, রেলপথে ও রিকশায় অনেক কষ্টে ঢাকায় পৌঁছলাম ৩ আগস্ট রাতে। ১৬ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, জোরাইন, শ্যামপুর, মাতুয়াইল, ধলপুর, মান্ডা, মুরাদপুর ও আশপাশের এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে ১৭ আগস্ট নরসিংদী রওনা হয়ে ১৯ আগস্ট পৌঁছালাম। নরসিংদী তখন ভীষণ উত্তপ্ত। পাকবাহিনী ও রাজাকারদের দৌরাত্ম্য তখন চরমে। এর মধ্যেই বাড়াইল হয়ে আমার গ্রাম আলোকবালীতে পৌঁছালাম। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশনা দিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর ভোরে আবারো রওনা হলাম আগরতলার উদ্দেশে। পাকবাহিনী ও রাজাকারদের চোখ এড়িয়ে দুই-এক জায়গায় ছদ্মবেশে অনেক বিপদ এড়িয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করলাম। ২৫ সেপ্টেম্বর মেজর নূরুজ্জামান ও ২৬ সেপ্টেম্বর গাজী গোলাম মোস্তফাকে দেশের অভ্যন্তরের যুদ্ধ পরিস্থিতি বর্ণনা করলাম। এরপর ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আগরতলা, কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প ও শরণার্থী শিবিরসমূহ পরিদর্শন এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কাজে ভারতেই ছিলাম। দেশে এলাম ১৪ ডিসেম্বর মেজর হায়দারসহ হেলিকপ্টারে কুমিল্লায়। পরে নরসিংদী হয়ে ঢাকায় এলাম ১৫ ডিসেম্বর বিকালে। যাত্রাবাড়ীতে সেদিনই বিজয় উল্লাস। জনতা মেজর হায়দার ও আমাকে মাথায় নিয়ে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে। পরের দিন অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের পরে আমরা কয়েকজন ঢাকা ক্লাব থেকে টেবিল চেয়ার এনে বর্তমানে যেখানে শিশুপার্ক সেখানে সেট করি আত্মসমর্পণ কার্য সম্পাদন করার জন্য। আমার জন্য এটি একটি গৌরবের বিষয় যে, পাকিস্তানি হায়েনাদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ইতিহাসের সাক্ষী হতে পেরেছিলাম।

লেখক : আর কে চৌধুরী

মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads