ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় অননুমোদিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ উপজেলাসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় অন্তত ৭ শতাধিক ওইসব যানবাহন রয়েছে। যা দৈনিক চার্জে গড়ে ব্যবহার হচ্ছে ১৫শ থেকে ১৭শ ইউনিট বিদ্যুৎ। সেইসাথে বিদ্যুতের অপচয়সহ পাশাপাশি লোডশেডিংও এলাকায় বেড়েই চলেছে। বিনা নোটিশে বিদ্যুতের লুকোচুরিতে জনগণ এক প্রকার অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।
তবে লোডশেডিংয়ের জন্য স্থানীয়রা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকে দায়ী করছে। কারণ ওইস যানবাহন চলাতে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে হয়। তাছাড়া এসব যানবাহন শুধু বিদ্যুৎ নয়, মূল শহরে যানজটও সৃষ্টি করছে। স্থানীয়রা এসব যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
আখাউড়ায় কি পরিমাণ ওসব ব্যাটারিচালিত অটো রিকশা ও ইজি বাইক রয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও উপজেলা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন, বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ও পৌরসভা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পৌর শহরসহ এ উপজেলায় প্রায় ৫ শতাধিকের উপর ও এ উপজেলার বাইরে সদর উপজেলার ও তার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দুই শতাধিক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করছে।
ওইসব যানবানহগুলো আখাউড়া-চম্পকনগর সড়ক, আখাউড়া-সুলতানপুর, আখাউড়া-কসবা সড়ক, আখাউড়া-চেকপোস্ট, কর্ণেল বাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ওইসব এলাকাগুলো বেশী ভাগ অংশই আখাউড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জোনাল অফিসের অধিনে রয়েছে। প্রতিদিনই প্রায় ২-৩ টি নুতন অটো-রিকশা-ভ্যান রাস্তায় নামছে। এর কোনোটিই পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে রেজিস্ট্রেশন করা নেই। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ রেজিস্ট্রেশন করতে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছে। শুরু করেছেন লাইসেন্স করার কাজও। এতে ভালো সারা পাচ্ছেন।
এদিকে ওইসব ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় পৌর শহরের মসজিদপাড়া, কলেজপাড়া, খড়মপুর, লালবাজার, নারায়নপুর, মোগড়া এলাকাসহ অনেক স্থানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গ্যারেজ গড়ে উঠেছে । অনেক অটো রিকশার মালিক মাসিক চুক্তিতে ওইসব গ্যারেজে রাখছে যানবাহন। এতে ব্যাটারি চার্জসহ থাকার জন্য গ্যারেজ মালিককে প্রতি ভ্যানগাড়ি ৫০ টাকা আর ইজিবাইক ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা দিতে হয়।
বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা যায়, এ জোনাল অফিসের আওতায় ৫৪ হাজার বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছে। এ উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ মেগাওয়াট। বর্তমানে চাহিদার ১২ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ মিলছে। তাই বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হয়।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানায়, এ উপজেলায় যে পরিমাণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাই চলাচল করছে এক একটি অটোরিকশা ও ইজিবাই ব্যাটারির ছয় ঘণ্টা চার্জ দিতে হয়। ৬ ঘন্টা চার্জ দিলে গড়ে তিন ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়।
দৈনিক যে পরিমাণ ওইসব যানবাহন চলাচল করছে তাকে গড়ে ১৫শ থেকে ১৭শ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকে লেগে যাচ্ছে।
এদিকে পৌর শহরসহ উপজেলায় সব কটি এলাকাতেই এসব ব্যাটারী চালিত ইজিবাই ও রিকশার আধিক্য বেশি। মূল শহরে এবং তার বাইরে এখন প্রধান বাহনে পরিণত হয়েছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক ও রিকশা। আর এগুলোর বেশিরভাগ চালকই অদক্ষ । চালকদের অদক্ষতার কারণে প্রতিনিয়ত শহরে যাজটসহ সড়কে প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যানগুলোর প্রথম সমস্যা হলো, এগুলো রিচার্জ করতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হয়, আর দেশে যেখানে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে সেখানে এই যানগুলোতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার বিদ্যুতের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।
অটো-রিকশার মালিক মো. মোক্তার হোসেন বলেন, তিনি প্রবাসে থাকতেন। গত প্রায় দুই বছর পূর্বে দেশে আসা হলে আর সেখানে যাওয়া হয়নি। কোন উপায় না পেয়ে তিনি ২টি ব্যাটারি চালিত ইজি বাইক ক্রয় করেন। একটি নিজে চালান আরেকটি ভাড়ায় চলে। তবে ওই দুটি যনবাহন বাড়িতে রাখার ব্যবস্থা না থাকায় তার মাসিক চুক্তিতে গ্যারেজে রাখতে হয়। এজন্য তার প্রতি রিকশা মাসে চার্জসহ ১শ টাকা দিতে হয়।
ব্যাটারি চালিত ইজি বাইক চালক মো. সেলিম মিয়া বলেন, অনেক কষ্টে একটি অটো রিকশা কেনা হয়। কেনার পর থেকে তিনি নিজেই এটি চালিয়ে আসছেন। আগে যেখানে বাড়ির ব্যবহারিক বিদ্যুৎ বিল আসতো ৩শ টাকার মতো। কিন্তু অটো রিকশা চার্জ দেওয়ায় প্রতি মাসে বিল আসছে ১৬শ থেকে ১৮ শ টাকা।
অটো চালক মো. কাদির মিয়া বলেন, তার একটি ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক রয়েছে। গত ২ বছর ধরে তিনি নিজেই চালিয়ে আসছেন। যেখানে আগে প্রতিমাসে ৭০-৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতো। ইজিবাইক থাকার কারণে বর্তমানে ২৭০ থেকে ২৯০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে।
গ্যারেজ মালিক মো. জাহাঙ্গীর বলেন, তার এখানে মাসিক চুক্তিতে ব্যাটারি চালিত অটো রিকশা, সিএসজি ও ভ্যান গাড়ি রাখা হয়। প্রতি মাসে একটি অটো রিকশায় ১শ টাকা ও ভ্যান গাড়ি ৫০ টাকা চার্জসহ তাকে ভাড়া দিতে হয়। চার্জ ব্যবসায় প্রতি মাসে খরচ বাদে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় হয় বলে জানায়। ববুল মিয়া বলেন, গত ২ বছর ধরে তিনি গ্যারেজ করে অটো রিকশা রাখছেন। যাদের বাড়িতে জায়গা নেই বা নিরাপত্তার অভাব রয়েছে তারা এখানে রাখছেন বলে জানায়।
পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক সুমন চক্রবর্তী বলেন, পৌর এলাকায় কী পরিমাণ এসব যানবাহন রয়েছে তার একটি সঠিক পরিসংখ্যান প্রয়োজন। চেষ্টা চলছে সব কিছু একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে । পৌর কর্তৃপক্ষ শহরে চলাচলকারী ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক ও রিকশায় শৃঙ্খলা আনতে অনেক দিন ধরেই কাজ করছেন। অবশেষে লাইসেন্স করার বিষটি সিদ্ধান্ত হওয়ায় যানবাহন মালিকরা পৌর সভা থেকে লাইসেন্স করা শুরু করেছেন। গত ১ সপ্তাহে ২৫০ জনের উপর লোকজন লাইসেন্স করেছে বলে জানায়। তিনি বলেন বিদ্যুৎরোধসহ শহরের যানজট মুক্ত রাখতে নানা মুখি পরিকল্পনা রয়েছে।
আখউড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম আবুল বাশার বলেন, আমরা শতভাগ চেষ্টা করছি চাহিদা অনুযায়ী গ্রাহকদেরকে বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে। অনেক সময় মেইন লাইনে ক্রুটি কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ বন্ধ থাকলেও দ্রুত সমস্যা সামাধান করা হয়। যারা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায়সহ মামলা করা হচ্ছে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে এই অফিসের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বাণিজ্যিভাবে মিটার নেওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকেই বিদ্যুৎ নির্ভর অনেক ব্যবসা করছেন।





